দুই দশকের বেশি সময় পর ইরাক থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার

প্রকাশ : 30 Sep 2026
দুই দশকের বেশি সময় পর ইরাক থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দুই দশকেরও বেশি সময় পর ইরাক থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়েছে। ইরাকের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, দেশটিতে এখন আর মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের কোনো সেনা নেই। বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পূর্ণ প্রত্যাহার শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তার এক দিন আগেই শেষ ঘাঁটিগুলো থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। 


ইরাকের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান কমান্ডারের মুখপাত্র সাবাহ আল-নুমান জানিয়েছেন, ৩০ সেপ্টেম্বরের পর ইরাকের কোথাও একজন বিদেশি সেনাও থাকবে না। ইরাকি প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি এই তারিখকে ‘চূড়ান্ত এবং নির্ধারিত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, এই দিনে ইরাক তার ভূখণ্ডের ওপর পূর্ণ সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের ঘোষণা দেবে। বাগদাদের ভিক্টোরি ঘাঁটিসহ শেষ জোট স্থাপনাগুলো ইরাকি বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। 


২০০৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ইরাকে সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ২০১১ সালের শেষ দিকে মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহার করা হলেও ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেটের উত্থানের পর আবারও ইরাকে ফিরে আসে মার্কিন বাহিনী। আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরাকি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য ও বিমান সহায়তা দেয় মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট। ২০১৭ সালে ইরাক আইএসের স্বঘোষিত খেলাফতের সামরিক পরাজয় ঘোষণা করে। রয়টার্সের হিসাবে, ইরাকে দুই দশকের বেশি সময়ের যুদ্ধে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে জো বাইডেন প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাক জোট মিশন গুটিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়। 


এই প্রত্যাহারকে ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ হিসেবে দেখছে। ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জোট ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’-এর কমান্ডার আবু মোজতবা আল-ইয়াসিরি ৩০ সেপ্টেম্বরকে ইরাকের ইতিহাসের ‘একটি কালো অধ্যায়ের সমাপ্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একসময় অঞ্চলটি ছেড়ে যাবে, কিন্তু ইরান ও তার প্রতিবেশীরাই সেখানে থেকে যাবে।


অন্যদিকে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। ইরাকের নিরাপত্তা বিশ্লেষক জসিম আল-বাহাদলি রয়টার্সকে বলেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের বিদায় ইরানের জন্য কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক, কারণ এর ফলে ইরাকের রাজনীতি ও নিরাপত্তায় ভারসাম্য রক্ষাকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক উপস্থিতি আর থাকছে না। ফালুজ্জার সুন্নি উপজাতীয় নেতা আবদুর রহমান আল-জোবাই বলেন, পূর্ণ সার্বভৌমত্ব ইরাকিদের আকাঙ্ক্ষা হলেও হঠাৎ করে জোটের চলে যাওয়ায় নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।


আইএস সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কার কথাও বলছেন কর্মকর্তারা। কুর্দি কমান্ডার সিরওয়ান বারজানি বলেন, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য, রসদ ও ড্রোন সহায়তা না থাকলে আইএস পুনর্গঠনের সুযোগ পেতে পারে। ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার এবং কুর্দি অঞ্চলের কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জোটের প্রত্যাহারের ঘোষণার পর গত দুই সপ্তাহে আইএসের সুপ্ত সেলগুলোর তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই বছরের শুরুতে ইরাকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল, যার মধ্যে শেষ পর্যায়ে কয়েকশ অবশিষ্ট ছিল। 


ইরাকের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা কাসিম আল-আরাজি বলেছেন, আজ থেকে জোট মিশনের সমাপ্তি এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে উত্তরণ ঘটছে, যা ইরাকের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, আনুষ্ঠানিক সামরিক মিশন শেষ হলেও কূটনৈতিক স্থাপনার নিরাপত্তায় সীমিত সংখ্যক মেরিন সদস্য থাকতে পারে এবং ভবিষ্যতে ইরাকের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। 

সম্পর্কিত খবর

;