রাজধানীতে ৮ মাসে ৪০০ বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন, অজ্ঞাত লাশ নিয়ে উদ্বেগ

প্রকাশ : 30 Sep 2026
রাজধানীতে ৮ মাসে ৪০০ বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন, অজ্ঞাত লাশ নিয়ে উদ্বেগ

স্টাফ রিপোর্টার: রাজধানীর খাল, ঝিল, ফুটপাত, হাসপাতালের আশপাশ, পরিত্যক্ত ভবন ও নির্জন স্থান থেকে একের পর এক অজ্ঞাত পরিচয় মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিচয় শনাক্তে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, নিখোঁজের তথ্য ভান্ডারে ঘাটতি এবং নগরজীবনে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এই পরিস্থিতির পেছনে বড় কারণ হতে পারে।


সর্বশেষ গত শুক্রবার রাজধানীর শ্যামপুর থানার জুরাইন রেলওয়ে সেতুর নিচে একটি পরিত্যক্ত পাবলিক টয়লেট থেকে আনুমানিক ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ জানায়, মরদেহটি বেশ কয়েকদিন আগের হওয়ায় পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। শ্যামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানান, পরিচয় শনাক্তে এলাকায় প্রচারণা চালানো হলেও এখন পর্যন্ত কেউ তথ্য দিতে পারেনি। মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।


জুরাইনের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। ডিএমপি সূত্র বলছে, রাজধানীর সড়ক, রেললাইন, ফুটপাত, পার্ক, নদী, খাল ও ঝিলসহ বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় প্রতিদিন অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। শুধু শাহবাগ থানা এলাকাতেই চলতি বছর অন্তত ১১টি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের তথ্য গণমাধ্যমে এসেছে। অজ্ঞাত ও বেওয়ারিশের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। উদ্ধারের সময় পরিচয় না মিললে তা অজ্ঞাত হিসেবে নথিভুক্ত হয়। পরে আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিচয় শনাক্ত না হলে তা বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন বা সৎকার করা হয়। 


এই প্রক্রিয়ায় রাজধানীতে বেওয়ারিশ মরদেহ দাফনের দায়িত্ব পালন করে আসছে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৮ মাসে ৪০০টি বেওয়ারিশ মরদেহের সৎকার করা হয়েছে। এর মধ্যে রায়েরবাজার কবরস্থানে ৩২৬টি এবং জুরাইন কবরস্থানে ৭৪টি মরদেহ দাফন করা হয়। মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ৩০টি, ফেব্রুয়ারিতে ৫৯টি, মার্চে ৫২টি, এপ্রিলে ৪৬টি, মে মাসে ৫৬টি, জুনে ৬৭টি, জুলাইয়ে ৪২টি এবং আগস্টে ৪৮টি মরদেহের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৫০টি মরদেহ দাফন করা হচ্ছে।


আঞ্জুমানের পরিসংখ্যান বলছে, বেওয়ারিশ মরদেহের সংখ্যা গত কয়েক বছরে বেড়েছে। ২০২৩ সালে ৪৯০টি, ২০২৪ সালে ৫৭০টি, ২০২৫ সালে ৬৪৪টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করা হয়। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত মোট ২ হাজার ১০৪টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। তাদের দাফনসেবা কর্মকর্তা কামরুল আহমেদ জানান, পুলিশের ক্লিয়ারেন্স ছাড়া কোনো মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয় না। 


তবে এই সংখ্যা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, এত বেশি সংখ্যক মরদেহ বেওয়ারিশ হওয়ার বিষয়ে তার কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। ডিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. আক্তার হোসেনও জানিয়েছেন, বেওয়ারিশ মরদেহ বেড়েছে এমন তথ্য পুলিশের কাছে নেই এবং বিষয়টি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। 


অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয় শনাক্তে নানা সীমাবদ্ধতার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন অবস্থায় উদ্ধার হলে আঙুলের ছাপ, জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল ফোন বা পোশাক থেকে পরিচয় মিলতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন পর উদ্ধার হলে পচনের কারণে আঙুলের ছাপ নষ্ট হয়ে যায়, তখন ডিএনএ, সিসিটিভি ফুটেজ এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে মর্গে দীর্ঘদিন মরদেহ সংরক্ষণের সুযোগও সীমিত।


সমাজবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, বিষয়টি শুধু আইনশৃঙ্খলার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চলবে না। নগরজীবনে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দুর্বল হওয়া, গৃহহীনতা, একাকিত্ব এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে। একই সঙ্গে কোনো মরদেহের পেছনে অপরাধ রয়েছে কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা দরকার। তিনি পরিচয় শনাক্তে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্যভান্ডার, হাসপাতাল ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন।


সম্পর্কিত খবর

;