বরিশালের পৌর নির্বাচন দলীয় মনোনয়ন পেতে প্রার্থীদের ঢাকায় লবিং

63

কল্যান কুমার চন্দ,বরিশাল ॥ বরিশালের ছয়টি পৌরসভার নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের দীর্ঘদিন থেকে শো-ডাউন, গণসংযোগ, উঠান বৈঠকের মাধ্যমে নির্বাচনী মাঠ গরম করে রাখতে দেখা গেলেও গত তিনদিন থেকে আর তাদের দেখা মিলছে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দলের মনোনয়ন পেতে সম্ভ্রাব্য মেয়র প্রার্থীরা বরিশালের আ’লীগের রাজনৈতিক অভিভাবক ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ-এমপি’র কাছে ঢাকায় লবিং করছেন। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সম্ভ্রাব্য মেয়র প্রার্থীরা বলেন, ভাই (হাসানাত) প্রতিটি পৌরসভায় দলের একক প্রার্থী মনোনয়নের জন্য আমাদের ঢাকায় ডেকেছেন। এনিয়ে একাধিকবার বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়া সত্বেও এখনও কোন পৌরসভায় একক প্রার্থী ঘোষণা কিংবা সিলেকশন করা হয়নি। অপরদিকে নির্বাচন নিয়ে আ’লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসলেও প্রতিটি পৌরসভায় নীরব ভূমিকায় রয়েছেন বিএনপির সম্ভ্রাব্য মেয়র প্রার্থী ও তাদের সমর্থক নেতাকর্মীরা। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক বিএনপির একাধিক মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা বলেন, আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচন নিয়ে তাদের তেমন কোন আগ্রহ নেই। তারা আরও বলেন, উপজেলা নির্বাচনের ন্যায় পৌর নির্বাচনেও কারচুপির মাধ্যমে একতরফাভাবে নির্বাচন উঠিয়ে নেবে আওয়ামী লীগ। যেকারনে সারাদেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের গণগ্রেফতার করা হচ্ছে বলেও তারা উল্লেখ করেন।
সূত্রমতে, এবারের পৌর নির্বাচনে প্রার্থীতা নিয়ে ভাবছেন দলীয় ও সাধারণ ভোটাররা। বিগত সময়ের পৌরসেবা, বর্তমান সময়ের কর্মকান্ড বিচার বিবেচনা করেই ভোট প্রয়োগ করবেন বলে জানিয়েছেন দলীয় ও সাধারণ ভোটাররা। বিশেষ করে যারা বিগত সময়ে পৌর এলাকার সার্বিক উন্নয়নে কাজ করার বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচিত হওয়ার পর তা বাস্তবায়িত করেননি কিংবা দলের নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন করে সদ্য আ’লীগে যোগদানকারীদের যারা প্রাধান্য দিয়েছেন সেইসব প্রার্থীদের প্রতিহতের ঘোষণা দিয়েছেন দলীয় নেতাকর্মীরা। সেক্ষেত্রে দলের হাইকমান্ড থেকে প্রার্থী মনোনয়নে ভুল হলে আগামি সংসদ নির্বাচনে তার চরম খেসারত দেয়ারও ইঙ্গিত দিয়েছেন দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
জেলা নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালে ৬ দশমিক ২৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে স্থাপিত হয় উজিরপুর পৌরসভা। বর্তমানে ইউএনও পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন। প্রথমবারের এ পৌরসভা থেকে মেয়র পদে নির্বাচন করতে দলীয় মনোনয়ন দৌঁড়ে রয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জামাল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মজিদ সিকদার বাচ্চু, সহ-সভাপতি অশোক কুমার হাওলাদার, উপজেলা যুবলীগের সভাপতি গিয়াসউদ্দিন, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আমেরিকা প্রবাসী ইকবাল হোসেন বালী, আওয়ামী লীগ নেতা শংকর মজুমদার, আব্দুল হাসেম সেরনিয়াবাত, উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আব্দুল হক বালী, উপজেলা যুবদলের সভাপতি মো. শাহিন।
২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত মুলাদী পৌরসভা প্রথম শ্রেণিতে উন্নিত হয় ২০১৪ সালে। ৫ দশমিক ৯০ বর্গকিলোমিটার এলাকার ৯টি ওয়ার্ডে জনসংখ্যা ২৫ হাজার ৫২৫ জন। ৩ হাজার ৮৫৪টি হোল্ডিং নাম্বারে ভোটার রয়েছে ১১ হাজার ৩৬৩ জন। এ পৌরসভার ৪৫ দশমিক ৭০ বর্গকিলোমিটার সড়ক কাঁচা। পাকা সড়ক রয়েছে ১৫ দশমিক ৮০ কিলোমিটার। এছাড়া ২৫ দশমিক ২৫ বর্গকিলোমিটার ব্রিক সলিং এর সড়ক। মুলাদী পৌরসভায় মেয়র পদে দলীয় প্রতীকে প্রার্থী হতে প্রতিদ্বন্ধিতা করবেন বর্তমান আ’লীগ সমর্থিত মেয়র তরিকুল ইসলাম মিঠু, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সালেহ উদ্দিন হাওলাদার, বিএনপি নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুন-অর রশিদ খান, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আসাদ মাহামুদ, জাপা নেতা শুক্কুর আহমেদ খান।
১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত মেহেন্দীগঞ্জ পৌরসভায় বসবাস করছে ৩৫ হাজার জনগন। ১৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির এ পৌরসভায় আজ পর্যন্ত স্থাপিত হয়নি পৌর কার্যালয়। এখানে পৌর পিতা নির্বাচিত হতে প্রার্থীর তালিকায় রয়েছেন-বর্তমান পৌর মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কামাল উদ্দিন খান, উপজেলা যুবলীগ নেতা পারভেজ খান, উপজেলা আ’লীগের যুগ্ন আহবায়ক মো. ইদ্রিস আলী, আ’লীগ নেতা নিজামউদ্দিন আহমেদ, সাবেক মেয়র বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম লাবু, পৌর বিএনপির সভাপতি সাহাবুদ্দিন হিমু ও উপজেলা বিএনপির সাধারন সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন দিপেন।
১৯৯০ সালে ৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত হয় বানারীপাড়া পৌরসভা। দ্বিতীয় শ্রেণির এ পৌরসভার জনসংখ্যা ১ লাখ ৮১ হাজার ৮৪ জন। পৌরসভার ওয়ার্ডের সংখ্যা ৯টি। দলীয় মনোনয়ন পেয়ে মেয়র নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে লবিং করছেন বর্তমান পৌর মেয়র গোলাম ছালেহ মঞ্জু মোল্লা, আ’লীগ নেতা এ্যাডভোকেট সুভাষ চন্দ্র শীল, ওয়াকার্স পার্টির নেতা মন্টু কুন্ডু, উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি মো. শাহে আলম, গোলাম মাহাবুব মাস্টার।
১৯৯০ সালে ৬ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার এলাকায় নিয়ে গঠিত হয় বাকেরগঞ্জ পৌরসভা। দ্বিতীয় শ্রেণির এ পৌরসভায় ৫০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৪০ কিলোমিটার সড়ক পাকা এবং ১০ কিলোমিটার সড়ক কাঁচা। এখানে মেয়র পদে নির্বাচন করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন বর্তমান মেয়র লোকমান হোসেন ডাকুয়া, সাবেক পৌর চেয়ারম্যান মাহাবুব আলম, আ’লীগ নেতা মশিউর রহমান জমাদ্দার, সাইফুল ইসলাম ডাকুয়া, শিল্পপতি পিয়াল আহম্মেদ তালুকদার রাজিব, এ্যাডভোকেট নাসির মাঝি, পৌর বিএনপির আহবায়ক মতিউর রহমান মোল্লা ও নাসির জমাদ্দার।
১৯৯৬ সালে ১১ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় গৌরনদী পৌরসভা। জেলার সবচেয়ে পুরনো পৌরসভা হচ্ছে গৌরনদী। এলাকার বাসিন্দারা জানান, পৌরসভাটি নানান সমস্যায় জর্জরিত। বর্তমানে এ পৌরসভায় ৫০ হাজার লোকের বসবাস। প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে যে সকল নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়া দরকার তার সামান্যতমও পাচ্ছেনা পৌরবাসী। গৌরনদী পৌরসভার সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে সরকারের নানামুখী উন্নয়ন কর্মকান্ড প্রচার প্রচারনার মাধ্যমে দীর্ঘদিন থেকে দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মনির হোসেন মিয়া। বিএনপির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে দলকে সংগঠিত করে যাচ্ছেন পৌর বিএনপির সভাপতি এস.এম মনির-উজ জামান মনির। এছাড়া আ’লীগ দলীয় বর্তমান মেয়র হারিছুর রহমান, সাবেক মেয়র বিএনপি নেতা নুর আলম হাওলাদার এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আ’লীগ নেতা আলাউদ্দিন ভূঁইয়া দলীয় মনোনয়ন পেতে জোর লবিং করে যাচ্ছেন।
নির্বাচন প্রসঙ্গে দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি এবায়েদুল হক চান জানান, পৌর নির্বাচনের জন্য বিএনপির প্রস্ততি ছিলো। তবে ৭ নভেম্বরের পর থেকে সরকার পুলিশ দিয়ে নেতাকর্মীদের দমন পিড়ন শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। এ অবস্থায় নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ এখন অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস জানান, দেশের বৃহৎ দল আওয়ামী লীগ। তাই দলে নেতাকর্মীর সংখ্যা বেশী। একারণে মনোনয়ন প্রত্যাশীর সংখ্যাও বেশী। সবদিক বিবেচনা করেই দলীয় মনোনয়ন দেয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।