ইরানের পরমাণু কর্মসূচির তথ্য দিলে ২ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের

প্রকাশ : 07 Nov 2026
ইরানের পরমাণু কর্মসূচির তথ্য দিলে ২ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের পরমাণু প্রকল্প এবং এই প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা, সরঞ্জাম ও ব্যক্তিবর্গ, বিশেষ করে পরমাণু বিজ্ঞানীদের সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রকে তথ্য দিলে তথ্যদাতাকে সর্বোচ্চ ২ কোটি ডলার পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়া হবে। পাশাপাশি সেই তথ্যদাতাকে ‘নিরাপদ স্থানান্তর’ বা পুনর্বাসনের সুযোগও দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অঙ্ক প্রায় ২৫০ কোটি টাকা।


শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম) পক্ষ থেকে পোস্ট করা এক বার্তায় এই তথ্য জানানো হয়। সেন্টকমের ওই বার্তায় বলা হয়, “ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, সরঞ্জাম এবং এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের (যেমন, বিজ্ঞানীদের) বিষয়ে তথ্য প্রদানকারীকে ২ কোটি ডলার পর্যন্ত পুরস্কার ও নিরাপদ স্থানান্তরের সুযোগ দেওয়া হবে।” এই পুরস্কার ও পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া হবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘রিওয়ার্ডস ফর জাস্টিস’ (ন্যায়বিচারের জন্য পুরস্কার) কর্মসূচির আওতায়।


ঘোষণায় কী ধরনের তথ্য চাওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের পরমাণু স্থাপনা, সরঞ্জাম এবং এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য। বিশেষ করে দেশটির পরমাণুবিজ্ঞানী ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পর্কেও তথ্য চেয়েছে ওয়াশিংটন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পররাষ্ট্র দপ্তর পরমাণু বিজ্ঞানী ও কর্মী, কর্মসূচি-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ও সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও ব্যক্তিদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চাইছে।


তবে ঠিক কী ধরনের তথ্য দিলে সর্বোচ্চ ২ কোটি ডলার পুরস্কার মিলবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো শর্ত বা মানদণ্ড প্রকাশ করেনি ওয়াশিংটন। অর্থাৎ এই অঙ্কটি সর্বোচ্চ সীমা। তথ্যের গুরুত্ব, নির্ভরযোগ্যতা ও ব্যবহারযোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে পুরস্কারের পরিমাণ নির্ধারিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির সাধারণ নিয়ম থেকে বোঝা যায়। এ বিষয়ে সেন্টকমের পোস্টে বিস্তারিত শর্ত উল্লেখ করা হয়নি।


‘রিওয়ার্ডস ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি কী, তা বুঝলে এই ঘোষণার প্রেক্ষাপট পরিষ্কার হয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি কর্মসূচি, যা ১৯৮৪ সালে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা আইনের আওতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। কর্মসূচিটি পরিচালনা করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডিপ্লোম্যাটিক সিকিউরিটি ব্যুরো। এই কর্মসূচির আওতায় মার্কিন জীবন ও স্বার্থ রক্ষা করে এমন তথ্যের জন্য অর্থ পুরস্কার দেওয়া হয়। তথ্যদাতাদের নিরাপত্তা রক্ষায় সূত্রের পরিচয় কঠোরভাবে গোপন রাখা হয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে তথ্যদাতা ও তাঁর পরিবারের জন্য স্থানান্তরের সুযোগ দেওয়া হয়।


এই কর্মসূচিতে তথ্য পাঠানোর জন্য সাধারণত গোপন যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের কথা বলা হয়। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিওয়ার্ডস ফর জাস্টিস সিগন্যাল, টেলিগ্রাম এবং টর ব্রাউজারভিত্তিক টিপ লাইনের মাধ্যমে তথ্য গ্রহণ করে। একাধিক ভাষায় তথ্য দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এই ঘোষণার ক্ষেত্রেও একই ধরনের গোপন যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রযোজ্য বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


ঘোষণার পেছনের কারণ হিসেবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি বক্তব্য সামনে এসেছে। পররাষ্ট্র দপ্তরের দাবি, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নিরাপত্তা ও পর্যবেক্ষণসংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা মেনে চলার ক্ষেত্রে ইরানের ব্যর্থতার কারণে দেশটির পরমাণু কর্মসূচি সম্পর্কে সংস্থাটির তথ্যের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ব্যবহৃত সেন্ট্রিফিউজসহ গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের উৎপাদন ও মজুত সম্পর্কে আইএইএর কাছে আগের মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই বলে দাবি করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।


এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও দাবি করেছেন, ইরান যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী। এমন পরিস্থিতিতে তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে তথ্য সংগ্রহে পুরস্কার ঘোষণাকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে মন্তব্য করা হয়েছে।


এই ঘোষণার পর ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ইরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে, যা তেহরান অস্বীকার করে।


বিশ্লেষকদের মতে, এই পুরস্কার ঘোষণার তিনটি সম্ভাব্য উদ্দেশ্য থাকতে পারে। প্রথমত, ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ভেতরের তথ্য সংগ্রহ করা। দ্বিতীয়ত, কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানী ও কর্মীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করা। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক চাপের পাশাপাশি কূটনৈতিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান জোরালো করা। তবে এই ঘোষণা আদৌ কতজনকে তথ্য দিতে উৎসাহিত করবে, তা তথ্যদাতাদের নিরাপত্তা, যাচাই প্রক্রিয়া এবং পুরস্কার পাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করবে।


এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর চাপ কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। অতীতে বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও নেটওয়ার্কের তথ্যের জন্য একই কর্মসূচির আওতায় পুরস্কার ঘোষণা করেছে। এবার সরাসরি পরমাণু স্থাপনা, সরঞ্জাম ও বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য করে এত বড় অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।


সম্পর্কিত খবর

;