সৌদি-পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’, লক্ষ্য নয় ইরান

প্রকাশ : 09 Aug 2026
সৌদি-পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’, লক্ষ্য নয় ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে একটি নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলেছে। শুক্রবার (৭ আগস্ট) সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় তিন দেশের শীর্ষ নেতারা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তির মূল বিষয় হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।


তবে চুক্তিটি ইরান কিংবা অন্য কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে করা হয়নি বলে জানিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। শনিবার (৮ আগস্ট) তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, চুক্তিতে কোনো দেশকে যৌথ হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। কোনো দেশ তাদের ওপর হামলা না করলে সেটি তাদের লক্ষ্যও নয়।


চুক্তিতে সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ স্বাক্ষর করেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা এবং ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই এই প্রতিরক্ষা কাঠামো আত্মপ্রকাশ করল।


ন্যাটোর আর্টিকেল-৫-এর সঙ্গে তুলনা


হাকান ফিদান জানিয়েছেন, পারস্পরিক প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে চুক্তিটির কাঠামো কারিগরিভাবে ন্যাটোর আর্টিকেল-৫-এর মতো। তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনো সদস্য আক্রান্ত হলেই অপর দুই দেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে।


তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে প্রথমে সহযোগিতার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করতে হবে। এরপর পরিস্থিতির ধরন ও হুমকির মাত্রা বিবেচনা করে বাকি দুই দেশ কী ধরনের সহায়তা দেবে তা নির্ধারণ করবে। সহায়তার মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, লজিস্টিক সহায়তা থেকে শুরু করে প্রয়োজনে সামরিক ইউনিট মোতায়েনও থাকতে পারে।


চুক্তির আওতায় তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক প্রধানদের নিয়ে নিয়মিত বৈঠকের ব্যবস্থা থাকবে। এ ছাড়া সৌদি আরবে একটি স্থায়ী সাধারণ সচিবালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে।


প্রায় তিন বছর ধরে চলেছে আলোচনা


তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তিটি চূড়ান্ত করতে প্রায় দুই বছর আট মাস ধরে কাজ করেছে তিন দেশ। তিনি জানান, এটি এখনই তিন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা নেই। ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের অন্য দেশগুলোও এতে যুক্ত হতে পারে।


ফিদান বিশেষভাবে মিসরের নাম উল্লেখ করে বলেছেন, মিসরকে এই কাঠামোর ‘স্বাভাবিক অংশীদার’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিছু কারিগরি বিষয় সমাধান হলে দেশটি পরবর্তী পর্যায়ে চুক্তিতে যুক্ত হতে পারে।


এর আগে তুরস্ক, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও মিসরকে নিয়ে ‘আর-৪’ নামে একটি আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামো গড়ে উঠেছিল। আঞ্চলিক নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে চার দেশ সমন্বয় করছে।


ইরানকে লক্ষ্য না করলেও প্রশ্ন উঠছে


চুক্তির উদ্যোক্তারা ইরানকে লক্ষ্য না করার কথা বললেও এর ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, চুক্তিটি এমন এক সময়ে হয়েছে যখন ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা তীব্র এবং উপসাগরীয় দেশগুলোও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবছে। Reuters-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চুক্তিটি আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামো জোরদারের বৃহত্তর প্রবণতার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।


বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সামরিক সম্পর্ক এবং তুরস্কের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প এই নতুন কাঠামোকে আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছে। পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তিধর দেশ, তুরস্ক ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি। ফলে তিন দেশের সমন্বিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।


তবে চুক্তিতে কোনো নির্দিষ্ট শত্রু বা দেশের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযান চালানোর কথা বলা হয়নি। বরং এর মূল লক্ষ্য হিসেবে যৌথ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং সদস্য দেশগুলোর নিরাপত্তা জোরদারের কথা বলা হয়েছে।


তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও স্পষ্ট করেছেন, এটি কোনো বিদ্যমান জোটকে প্রতিস্থাপন করার উদ্যোগ নয়। বরং আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আরও কার্যকর সহযোগিতার আওতায় আনার একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। ভবিষ্যতে আরও দেশ যুক্ত হলে এই কাঠামো মধ্যপ্রাচ্য ও বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

সম্পর্কিত খবর

;