স্টাফ রিপোর্টার: দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমকে প্রার্থী করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোট।
রোববার (৯ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক শেষে এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। বৈঠকের পর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানও অলি আহমদকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেন।
জোটের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। এতে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ, এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল অলি আহমদ, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী, জাগপার রাশেদ প্রধান এবং খেলাফত মজলিসের মামুনুল হকসহ জোটের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
‘জাতির সঙ্গে কখনও বেঈমানি করব না’
রাষ্ট্রপতি পদে নিজের নাম ঘোষণার পর কর্নেল অলি আহমদ বলেন, ‘জাতির সঙ্গে কখনও বেঈমানি করব না। জাতির জন্য যেটা ভালো, সেটাই করব।’
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের কল্যাণের জন্য তারা ‘সর্বোচ্চ ব্যক্তিকে’ রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দিয়েছেন।
জোটের পক্ষ থেকে অলি আহমদকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো, যখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে বিরোধী জোটের রাজনৈতিক সমীকরণ স্পষ্টতই আলাদা পথে এগোচ্ছে।
বিএনপিও সংগ্রহ করেছে দুটি মনোনয়নপত্র
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের একই দিনে ক্ষমতাসীন বিএনপি নির্বাচন কমিশনের কার্যালয় থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে। ফলে এবারের নির্বাচনে অন্তত দুই পক্ষের প্রার্থিতা সামনে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বিএনপির পক্ষ থেকে কার নামে মনোনয়নপত্র দাখিল করা হবে, তা এখনো প্রকাশ্যে জানানো হয়নি। অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোট তাদের প্রার্থী হিসেবে অলি আহমদের নাম প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছে।
ফলে শেষ পর্যন্ত বিএনপির প্রার্থী কে হন এবং দুই পক্ষের মনোনয়নপত্র বৈধ থাকে কি না—রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরবর্তী ধাপে সেটিই বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০ আগস্ট ভোট
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ১৩ আগস্ট। এরপর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৮ আগস্ট। আর একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশনকক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না। সংবিধান অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। ফলে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা দল বা জোটের অবস্থান এ নির্বাচনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্য কোনো যোগ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিতে পারেন। মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্য প্রস্তাবক এবং অন্য একজন সংসদ সদস্য সমর্থক হিসেবে স্বাক্ষর করেন। একই সঙ্গে প্রার্থীর সম্মতিসূচক স্বাক্ষরও থাকতে হয়। একজন সংসদ সদস্য একাধিক প্রার্থীর মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবক বা সমর্থক হতে পারেন না।
একাধিক প্রার্থী বৈধ থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোটে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। আর মনোনয়নপত্র যাচাইয়ের পর যদি মাত্র একজন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ থাকে, তাহলে ভোটগ্রহণ ছাড়াই তাকে নির্বাচিত ঘোষণা করার বিধান রয়েছে।
১১ দলীয় জোটের রাজনৈতিক শক্তি
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। নির্বাচনের পর এই জোট সংসদে বিরোধী শক্তি হিসেবে অবস্থান নেয়।
সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী এককভাবে ৬৮টি আসন পায়। এনসিপি পায় ৬টি এবং খেলাফত মজলিস পায় ৩টি আসন। সব মিলিয়ে ১১ দলীয় জোটের আসন দাঁড়ায় ৭৭টি।
এই ৭৭ সদস্যের সংসদীয় শক্তিই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অলি আহমদের প্রার্থিতাকে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। যদিও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হতে হলে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট নিশ্চিত করতে হবে এবং ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদীয় শক্তি এ ক্ষেত্রে বড় ফ্যাক্টর।
কেন অলি আহমদ?
অলি আহমদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। পরে জেড ফোর্সের অধীনে যুদ্ধ করেন।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করে কর্নেল পদে অবসর নেন। এরপর রাজনীতিতে সক্রিয় হন। বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর দলটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে দীর্ঘদিন রাজনীতি করেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর মন্ত্রী থাকাকালে বঙ্গবন্ধু সেতুর নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
পরবর্তীতে বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হলে ২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) গঠন করেন। বর্তমানে তিনি দলটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন।
জামায়াতের সঙ্গে অলি আহমদের রাজনৈতিক সমীকরণ
অলি আহমদের রাষ্ট্রপতি প্রার্থিতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে গেল।
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এলডিপি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশ নেয়। চট্টগ্রাম-১৪ আসনে অলি আহমদ নিজে নির্বাচন না করে তাঁর ছেলে ওমর ফারুককে প্রার্থী করেছিলেন। ওই নির্বাচনে ওমর ফারুক অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন।
এর আগে ১১ দলীয় জোটের বিভিন্ন সমাবেশে অলি আহমদ সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। জুলাই মাসের সিলেটের সমাবেশেও তিনি জোটের পক্ষে বক্তব্য দেন এবং জামায়াত আমির শফিকুর রহমান, এনসিপির নাহিদ ইসলাম ও খেলাফত মজলিসের মামুনুল হককে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে বিএনপিকে বার্তা
অলি আহমদকে প্রার্থী ঘোষণার পর নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে বিএনপি অনীহা দেখিয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপি সংস্কারের পথে এগোলে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল মিলে রাষ্ট্রপতি পদে একক প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ ছিল।
কিন্তু বিএনপি সে উদ্যোগ না নেওয়ায় ১১ দলীয় ঐক্য আলাদা প্রার্থী দিয়েছে বলে জানান তিনি।
নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে শুধু সাংবিধানিক পদে নির্বাচন হিসেবে নয়, বরং জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে বিরোধী জোটের রাজনৈতিক মতপার্থক্যের একটি ক্ষেত্র হিসেবেও দেখছে ১১ দলীয় ঐক্য।
এবার কি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট হবে?
এ প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে মনোনয়নপত্রের ওপর।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অধিকাংশ সময়ই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হয়েছে। ২০২৩ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও মো. সাহাবুদ্দিনের নামে দুটি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল। যাচাই-বাছাইয়ের পর তাঁর মনোনয়ন বৈধ থাকায় এবং অন্য কোনো বৈধ প্রার্থী না থাকায় তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়।
তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। একদিকে বিএনপি দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে, অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট প্রকাশ্যে অলি আহমদকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে।
দুই পক্ষই যদি মনোনয়নপত্র দাখিল করে এবং উভয় প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ থাকে, তাহলে দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটের প্রয়োজন হতে পারে।
সামনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এখন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপের দিকে এগোচ্ছে—
প্রথমত, ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন।
দ্বিতীয়ত, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে কারা বৈধ প্রার্থী হিসেবে থাকছেন, সেটি নির্ধারণ হবে।
তৃতীয়ত, ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর যদি একাধিক বৈধ প্রার্থী থেকে যান, তাহলে ২০ আগস্ট সংসদে ভোট হবে।
এ কারণে অলি আহমদকে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ঘোষণা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায় হলেও এখনই তাঁকে ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত’ বলা যাবে না। তাঁকে প্রথমে বৈধ প্রার্থী হিসেবে টিকে থাকতে হবে এবং একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হবে।
সব মিলিয়ে, বিএনপির মনোনয়নপত্র সংগ্রহ এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের অলি আহমদকে প্রার্থী ঘোষণার মধ্য দিয়ে ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতার সূচনা হলো। আগামী ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র দাখিলের পরই পরিষ্কার হবে—রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে গড়ায়, নাকি কোনো একক প্রার্থীর মধ্য দিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শেষ হয়।
স্টাফ রিপোর্টার: দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নির্বাচন কমিশনের রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে। রোববার (৯ আগস্ট ...
স্টাফ রিপোর্টার: আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। শনিবার (৮ আগস্ট) সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষ ...
স্টাফ রিপোর্টার: স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও শক্তিশালী গণমাধ্যমের কোনো বিকল্প নেই। গণমাধ্যম শক্তিশালী হ ...
স্টাফ রিপোর্টার: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-এর নেতৃবৃন্দ বলেছেন, সহস্র শহীদের আত্মত্যাগ ও কোটি জনতার লড়াইকে স্বার্থক করতে দেশকে সাম্প্রদায়িকতা, ...
সব মন্তব্য
No Comments