ট্রাম্পের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হুমকি

যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা

প্রকাশ : 06 Oct 2026
যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র আচমকা এবং অপ্রত্যাশিত সামরিক হামলা চালাতে পারে, বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো আক্রমণাত্মক প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে এমন আশঙ্কা অমূলক নয়, সম্ভাব্য এমন পরিস্থিতি মাথায় রেখেই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা। দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে এমন আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে।


গত ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক ঘণ্টার সাক্ষাৎকারে কার্নি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাকে তিনি চরম ঝুঁকি বা এক্সট্রিম টেইল রিস্ক হিসেবে বিবেচনা করছেন। যদিও তার মতে এমনটি ঘটার বাস্তব সম্ভাবনা খুব কম, তবু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সবচেয়ে অস্বাভাবিক ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হয়। তিনি বলেন, দ্যাটস জাস্ট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট, ইট উড বি ইরেসপন্সিবল নট টু। অর্থাৎ এটি শুধু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, এর জন্য প্রস্তুত না থাকা দায়িত্বজ্ঞানহীনতা হবে।


আল জাজিরা ও বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সম্পর্কের দ্রুত অবনতিই অটোয়াকে এমন সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে। ট্রাম্প একাধিকবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, আই থিংক কানাডা উড বি মাচ বেটার অফ বিইং আ ৫১স্ট স্টেট। অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে সঙ্গে নানা সময়ে বলপ্রয়োগের হুমকিও দিয়েছেন তিনি। এমনকি লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তন করে লেক আমেরিকা রাখার মতো উস্কানিমূলক পদক্ষেপও নিয়েছেন।


ট্রাম্পের রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি তার আমলে শুরু হওয়া শুল্কযুদ্ধ, ওয়াশিংটনের সঙ্গে অটোয়ার দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক ও প্রতিরক্ষা নির্ভরতা সব মিলিয়েই কানাডার নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ বাড়ছে। ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রথমে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন, পরে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামে ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপান। আগস্টে বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর উভয় দেশ প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপ করে।


এ অবস্থায় কার্নি এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রযুক্তি, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও কৌশলগত সরবরাহ ব্যবস্থায় বিকল্প অংশীদার খুঁজছেন। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়, কানাডা মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করছে এবং স্পেসএক্সের স্টারলিংকের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়েছে কানাডা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট এক্সপিডিশনারি ফোর্সে যোগ দেওয়ার আবেদন করেছে।


সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে যুদ্ধ হবে অত্যন্ত জটিল এবং প্রায় কল্পনাতীত। কাগজে কলমে মার্কিন সামরিক শক্তির সামনে কানাডার কোনো তুলনাই চলে না। আল জাজিরাকে গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টাই সলোমন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণ অন থিংকেবল। তবে যুদ্ধ শুরু হলে প্রথম পর্যায়টি খুব দ্রুত শেষ হতে পারে। কানাডার সামরিক বাহিনীর তৈরি করা একটি মডেল অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের ক্ষেত্রে এক সপ্তাহের মধ্যেই কানাডার গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানগুলো দখল হয়ে যেতে পারে।


মডেল অনুসারে, সম্ভাব্য যুদ্ধের শুরুর দিকেই কানাডার সামরিক বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দ্রুত পিছিয়ে পড়বে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তাদের গেরিলা ধাঁচের যুদ্ধকৌশলে যেতে হতে পারে। ব্রিটেন বা ফ্রান্সের মতো মিত্র দেশগুলোর কাছে সহায়তা ও প্রতিরক্ষার জন্য আবেদনও জানানো হতে পারে।


সার্বিক প্রেক্ষাপটে সামরিক ঘাটতি পূরণে সম্প্রতি কানাডার সামরিক বাহিনীর আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে নাগরিকদের মধ্য থেকে অপেক্ষাকৃত স্বল্প প্রশিক্ষিত প্রায় ৩ লাখ সেনা যুক্ত করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।


তবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কানাডায় যুদ্ধ সহজ হবে না বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এরিক টেলর উডস বলেন, কানাডিয়ানরা কখনোই তাদের সার্বভৌমত্ব হারানো সহজে মেনে নেবে না। এ ধরনের যুদ্ধে মার্কিন নাগরিক ও সামরিক বাহিনীর সমর্থন পাওয়াও কঠিন হবে। এটি হবে আমেরিকার বৈশ্বিক স্বার্থের জন্য এক চরম বিপর্যয়।


এরপরও যুক্তরাষ্ট্র কানাডায় আক্রমণ করলে তারা দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দ্রুত অচল করে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে বলে অভিমত অনেক বিশ্লেষকের। অনেকটা ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের ঝটিকা সামরিক অভিযানের মতো হতে পারে সেটা। তবে কারো কারো মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি কখনো কানাডার বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে সেটি সরাসরি সামরিক হামলা দিয়ে শুরু নাও হতে পারে। এর শুরু হতে পারে সাইবার যুদ্ধ বা অন্যান্য উপায়ে।


সম্ভাব্য সেই পরিস্থিতি যেমনই হোক, যুক্তরাষ্ট্রের কানাডা আক্রমণের সম্ভাবনা যতোই কম হোক, কানাডা যে সম্ভাব্য এক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, সেটিই প্রমাণ করে, আজকের দুনিয়ায় বৈশ্বিক রাজনীতি কতটা বদলে গেছে। বদলে যাওয়া ভূরাজনীতির জন্য এ এক অশনি সংকেত।

সম্পর্কিত খবর

;