আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার নিউ মার্কেটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিক বলে নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নিহত বাংলাদেশিদের চারজনই কুষ্টিয়ার একই পরিবারের সদস্য। এছাড়া ভারতের ঝাড়খণ্ডের ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ এবং শিলিগুড়ির ৬৮ বছর বয়সী এক ব্যক্তির পরিচয়ও পাওয়া গেছে। বাকি নিহতদের পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া চলছিল।
বুধবার (১৯ আগস্ট) ভোরে নিউ মার্কেট-সংলগ্ন ১৫/এইচ মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি পুরোনো পাঁচতলা ভবনে আগুন লাগে। ভবনটিতে একাধিক হোটেল ও রেস্তোরাঁ পরিচালিত হচ্ছিল। স্থানীয় সময় রাত প্রায় পৌনে ২টা থেকে ৩টার মধ্যে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি ইঞ্জিন কাজ করে। প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ভবনের ভেতরে ঘন ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ায় উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়ে।
পশ্চিমবঙ্গের দমকলমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, ভবনটি অত্যন্ত ঘিঞ্জি এবং চলাচলের জায়গা সংকীর্ণ হওয়ায় উদ্ধারকাজে সমস্যা হয়েছে। ভবনের বিভিন্ন তলায় আলাদা হোটেল বা গেস্টহাউস ছিল। ঘটনাস্থলের কাছেই দমকল বিভাগের বড় একটি স্টেশন থাকা সত্ত্বেও ভবনটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে।
আগুনের সময় হোটেলের অনেক অতিথি ঘুমিয়ে ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও দমকল সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আগুন লাগার পর ঘন কালো ধোঁয়া দ্রুত বিভিন্ন কক্ষে ছড়িয়ে পড়ে। হোটেলের সংকীর্ণ প্রবেশপথ, জরুরি বের হওয়ার ব্যবস্থা নিয়ে অভিযোগ এবং ফায়ার অ্যালার্ম কাজ না করার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রত্যক্ষদর্শীভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল ফটক বন্ধ থাকায় অনেকেই বের হতে পারেননি।
দমকল ও পুলিশ সূত্রে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নিহতদের অধিকাংশের মৃত্যু আগুনে পুড়ে নয়, বরং অতিরিক্ত ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে হয়েছে। তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ ময়নাতদন্ত ও তদন্তের পর নিশ্চিত হবে। প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে আগুনের প্রকৃত কারণ এখনো চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হয়নি।
ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৮০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। আগুনে ছয় বাংলাদেশি আহত হন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশন নিহত ও আহত বাংলাদেশিদের বিষয়ে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে রয়েছেন কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন, তাঁদের তিন বছর বয়সী ছেলে শর্ণশীষ দত্ত এবং আফসানার বাবা মো. আকরাম আলী। পঞ্চম বাংলাদেশি নিহত ব্যক্তি হলেন ঢাকার সাভারের আমিনবাজারের আহমেদ বাবু। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাঁচজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
দেবাশীষ দত্ত কুষ্টিয়ায় সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি আজকের পত্রিকা ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল নাইন-এর কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। পাশাপাশি কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত আজকের আলো পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর সঙ্গে স্ত্রী, ছোট ছেলে ও শ্বশুরের মৃত্যুর ঘটনায় কুষ্টিয়ায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেবাশীষ দত্ত তাঁর স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য ৩ আগস্ট ভারতে যান। তারা প্রথমে কলকাতায় অবস্থান করেন। পরে চিকিৎসার জন্য বেঙ্গালুরু যান। চিকিৎসা শেষে সোমবার রাতে কলকাতায় ফিরে একটি হোটেলে ওঠেন। বুধবারই তাঁদের বাংলাদেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু দেশে ফেরার আগেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুরো পরিবারটির চারজনের মৃত্যু হয়।
দেবাশীষের আট বছর বয়সী মেয়ে ফাহিমা পরিবারের সঙ্গে ভারতে যায়নি। ফলে ভয়াবহ এই ঘটনায় তিনি বাবা, মা ও ছোট ভাইকে হারিয়েছেন। কুষ্টিয়ায় দেবাশীষের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, বুধবার সকালে তাঁরা মৃত্যুর খবর পান। স্বজনদের মধ্যে গভীর শোক নেমে এসেছে।
নিহতদের মধ্যে ভারতের ঝাড়খণ্ডের সন্দীপ পাসওয়ান নামে ১৯ বছর বয়সী এক তরুণও রয়েছেন। মাত্র ছয় মাস আগে কাজের সন্ধানে কলকাতায় এসে তিনি হোটেলটিতে কর্মী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর পরিবারের দাবি, হোটেলের মূল ফটকের কাছে থাকা একটি রেফ্রিজারেটরের কমপ্রেসর বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে এটি পরিবারের দাবি; তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ এখনো আগুনের চূড়ান্ত কারণ নিশ্চিত করেনি।
এ ঘটনায় শিলিগুড়ির ৬৮ বছর বয়সী যোগ নারায়ণ আগরওয়ালেরও মৃত্যু হয়েছে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে। ফলে এখন পর্যন্ত অন্তত সাতজনের পরিচয় বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত হয়েছে—পাঁচজন বাংলাদেশি এবং ভারতের দুই নাগরিক। নিহত বাকি দুজনের পরিচয় শনাক্ত করার প্রক্রিয়া চলছিল।
ঘটনার পর কলকাতার হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার মির্জা গালিব স্ট্রিটসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার সব হোটেল, লজ ও গেস্টহাউসের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এবং অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নেওয়া হবে।
সরকারি পর্যায়ে এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত দল গঠনের কথা জানিয়েছেন। আগুনের সূত্রপাত, ভবনটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, হোটেল পরিচালনার অনুমোদন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বের হওয়ার ব্যবস্থা ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
ঘটনাটি কলকাতার অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার পুরোনো দুর্বলতাকেও সামনে এনেছে। মির্জা গালিব স্ট্রিটের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সরু রাস্তা, অপর্যাপ্ত জরুরি বের হওয়ার পথ এবং এক ভবনে একাধিক হোটেল পরিচালনার বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৫ সালে কলকাতার জোড়াসাঁকোর মেছুয়া এলাকায় হোটেল ঋতুরাজে অগ্নিকাণ্ডে ১৪ জন নিহত হওয়ার পর হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে অডিটের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে সেই অডিটের কাজ শেষ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
মির্জা গালিব স্ট্রিটের অগ্নিকাণ্ডে আবারও স্পষ্ট হয়েছে, শুধু আগুন নেভানোর সক্ষমতা থাকলেই বড় দুর্ঘটনা ঠেকানো যায় না; ভবনের নকশা, জরুরি নির্গমনপথ, অ্যালার্ম ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা এবং নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা পরিদর্শনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এবার রাজ্য সরকারের ঘোষিত অডিটে এসব বিষয় কতটা কঠোরভাবে যাচাই করা হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এদিকে কলকাতায় চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনে যাওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে এ ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে স্বল্পমূল্যের আবাসিক হোটেল ও গেস্টহাউসে থাকা বাংলাদেশি রোগী ও স্বজনদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে একই পরিবারের চার বাংলাদেশির মৃত্যু দুই দেশের মানুষের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার নিউ মার্কেটসংলগ্ন মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, দুজন নারী ও একটি শিশু ...
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বাধা দিলে ওমানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তি ...
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানকে পরাজিত করার পর হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার কথা বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার নিউইয়র্কে এক সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি ব ...
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় নুসা তেংগারা প্রদেশে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন দুজন এবং সামান্য আহত হয়েছেন আরও ১১ জন। শনিবার ...
সব মন্তব্য
No Comments