এলএনজি কার্গো না আসায় ফের তীব্র গ্যাস সংকট, বন্ধ এক্সিলারেটের টার্মিনাল

প্রকাশ : 19 Aug 2026
এলএনজি কার্গো না আসায় ফের তীব্র গ্যাস সংকট, বন্ধ এক্সিলারেটের টার্মিনাল

স্টাফ রিপোর্টার: টানা ২৫ দিনের তীব্র গ্যাস সংকটের পর সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার আশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু নতুন এলএনজি কার্গো সময়মতো না আসায় সেই স্বস্তি আবারও উল্টো সংকটে পরিণত হয়েছে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে বুধবার (১৯ আগস্ট) বেলা ৩টার দিকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ আরও কমে গিয়ে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা ও আবাসিক গ্রাহকদের ওপর সংকটের চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। 


সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এক্সিলারেটের টার্মিনালে নতুন এলএনজি কার্গো না থাকায় আগের মজুত থেকেই সীমিত পরিমাণে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। গত তিন দিন ধরে সেই সরবরাহ ক্রমেই কমছিল। শেষ পর্যন্ত মজুত ফুরিয়ে যাওয়ায় বুধবার বিকেলে টার্মিনালটি থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। 


এর আগে গত শনিবার সামিটের টার্মিনাল পুরোদমে এবং এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিকভাবে চালু হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বেড়েছিল। এর ফলে কয়েক দিনের তীব্র সংকটের পর শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কিছুটা উন্নত হওয়ার আশা তৈরি হয়েছিল। ১৪ আগস্ট সামিটের টার্মিনালও রুক্ষ সমুদ্রের কারণে সাময়িকভাবে সরবরাহ বন্ধ করেছিল; পরে সেটি আবার চালু হয়ে এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে শুরু করে। 


তবে এক্সিলারেটের টার্মিনালে পর্যাপ্ত এলএনজি না থাকায় সেই উন্নতি স্থায়ী হয়নি। বুধবার টার্মিনালটি পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার পর জাতীয় পর্যায়ে মোট গ্যাস সরবরাহ দৈনিক প্রায় ২১৮ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার এই সরবরাহ ছিল প্রায় ২২৮ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ একদিনের ব্যবধানেই জাতীয় গ্রিডে প্রায় ১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কমেছে। 


এলএনজি থেকেও সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। মঙ্গলবার দুই টার্মিনাল মিলিয়ে এলএনজি থেকে প্রায় ৬৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বুধবার এক্সিলারেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তা প্রায় ৫৫ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। এর আগে দুই টার্মিনাল একসঙ্গে বন্ধ থাকার সময় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ১৬৪ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত নেমে গিয়েছিল। 


বাংলাদেশের গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে গড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুটের মতো সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক সময়েও চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ঘাটতি রয়েছে। সাম্প্রতিক সংকটে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় এই ঘাটতি আরও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করা এলএনজি এখন দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। 


মহেশখালীতে বর্তমানে আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) রয়েছে। এর একটি এক্সিলারেট এনার্জির এবং অন্যটি সামিটের। এক্সিলারেটের টার্মিনালের স্বাভাবিক সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি ঘনফুট এবং সামিটের সক্ষমতা প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট। ফলে যেকোনো একটি টার্মিনাল দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। 


এক্সিলারেটের বর্তমান সংকটের পেছনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। গত ২১ জুলাই মহেশখালীর টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। ওই ঘটনায় টার্মিনালের গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক, নিয়ন্ত্রণ ও ইন্সট্রুমেন্টেশন কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে সে সময় কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন। এতে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে বাদ পড়ে এবং দেশজুড়ে গ্যাস সংকট তীব্র হয়। 


পরবর্তীতে মেরামতের পর আগস্টের শুরুতে এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিকভাবে চালু হয়। প্রথম দিকে একটি রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট দিয়ে প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হচ্ছিল। পরে মেরামতের অগ্রগতির সঙ্গে সরবরাহ বাড়ানো হয় এবং টার্মিনালটি পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরার প্রস্তুতি নেয়। 


কিন্তু টার্মিনাল প্রস্তুত থাকলেও প্রয়োজনীয় এলএনজি না থাকায় এবার সরবরাহ বন্ধ হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান সংকটের বড় কারণ অবকাঠামোগত অক্ষমতা নয়, বরং টার্মিনালে এলএনজি কার্গো পৌঁছানোর ঘাটতি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন কার্গো না এলে এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে আবার সরবরাহ শুরু করার সুযোগ নেই। 


এদিকে সংকট মোকাবিলায় সরকার সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি চলতি আগস্টে জরুরি ভিত্তিতে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে আট কার্গো এলএনজি আমদানির নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। এসব কার্গো কেনার জন্য একাধিক আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীর কাছ থেকে এলএনজি সংগ্রহের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। 


সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে কেনা কয়েকটি কার্গো দেশে আসার কথা থাকলেও সেগুলোর সময়সূচি অনুযায়ী সরবরাহ না পাওয়ায় সংকট সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি কেনার মূল উদ্দেশ্যই ছিল সরবরাহ ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা। ফলে অনুমোদিত কার্গোগুলো সময়মতো না এলে সেই জরুরি ক্রয়প্রক্রিয়ার সুফলও গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছাবে না।


আগামী বৃহস্পতিবার একটি এলএনজি কার্গো দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সেটি সামিটের টার্মিনালে যুক্ত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। আর এক্সিলারেটের জন্য আরেকটি কার্গো ২৩ অথবা ২৪ আগস্ট নাগাদ আসতে পারে বলে জানা গেছে। ফলে নতুন কার্গো না আসা পর্যন্ত এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। 


এরই মধ্যে গ্যাস সংকটের বাস্তব প্রভাব পড়ছে শিল্পাঞ্চলগুলোতে। নরসিংদীতে তিন শতাধিক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে পাওয়া গ্যাসের বড় অংশ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সার কারখানায় সরবরাহ করা হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জসহ শিল্পঘন এলাকাতেও কম চাপের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার তথ্য এসেছে। 


গ্যাসের ঘাটতি বিদ্যুৎ উৎপাদনেও সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ দেশের একাধিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি চাহিদা পূরণে জাতীয় গ্রিডের গ্যাস সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। এলএনজি সরবরাহ আরও কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের বরাদ্দ কমানোর চাপ তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে লোডশেডিংয়ের ওপরও। 


আবাসিক গ্রাহকরাও এর বাইরে থাকছেন না। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় রান্নার চুলা দীর্ঘ সময় জ্বলছে না বা স্বাভাবিক চাপ পাওয়া যাচ্ছে না। শিল্পের পাশাপাশি পরিবহন খাত, বিশেষ করে সিএনজি স্টেশনগুলোর ওপরও সরবরাহ ঘাটতির প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। 


সব মিলিয়ে কয়েক দিনের সাময়িক স্বস্তির পর আবারও বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের চাপের মধ্যে পড়েছে। একদিকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কম, অন্যদিকে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে দুটি ভাসমান টার্মিনালের যেকোনো একটির সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং একই সময়ে নতুন এলএনজি কার্গো না আসা—এই দুই পরিস্থিতি একসঙ্গে তৈরি হলে জাতীয় গ্রিডে দ্রুত বড় ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। 


সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এক্সিলারেটের জন্য নির্ধারিত কার্গো না পৌঁছালে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহের অগ্রাধিকার নিয়ে চাপ বাড়বে। দ্রুত নতুন কার্গো এনে দুই টার্মিনালকে পর্যাপ্ত এলএনজি সরবরাহের আওতায় আনাই এখন জাতীয় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।


সম্পর্কিত খবর

;