বিদায়ী বক্তব্যে বারবার কাঁদলেন মির্জা ফখরুল, চাইলেন দোয়া ও ভোট

প্রকাশ : 20 Aug 2026
বিদায়ী বক্তব্যে বারবার কাঁদলেন মির্জা ফখরুল, চাইলেন দোয়া ও ভোট

স্টাফ রিপোর্টার: রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এক দিন আগে বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় বিদায়ী বক্তব্য দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে বারবার কেঁদেছেন দলের সদ্য সাবেক মহাসচিব ও রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দলীয় সংসদ সদস্যদের কাছে দোয়া চাওয়ার পাশাপাশি আগামীকাল বৃহস্পতিবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁর পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে সভাকক্ষে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয় এবং একপর্যায়ে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। 


বুধবার (১৯ আগস্ট) দুপুর ২টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের সরকারি দলীয় সভাকক্ষে বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠক শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভাটি চলে প্রায় দেড় ঘণ্টা। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে এই বৈঠকে দলের সংসদ সদস্যদের ভোটদানের প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত করা হয়। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, দলীয় ঐক্য, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং সংসদ সদস্যদের সঙ্গে তৃণমূলের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হয়। 


সভায় প্রথমে স্বাগত বক্তব্য দেন বিএনপির চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে সংসদ সদস্যদের ধারণা দেন এবং দলীয় প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে ভোট চান। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং মির্জা ফখরুল নিজেও ভোট দেবেন। নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করলে তাঁর সংসদীয় আসনটি শূন্য হবে বলে সভায় জানানো হয়। 


চিফ হুইপের বক্তব্যের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বক্তব্য দিতে দাঁড়ান। সভায় উপস্থিত একাধিক সংসদ সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, বক্তব্যের শুরুতেই তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কয়েক মিনিটের বক্তব্যে চার থেকে পাঁচবার তাঁর কান্না আসে। এ সময় সভাকক্ষে উপস্থিত নেতারা আবেগঘন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন। 


বিদায়ী বক্তব্যে মির্জা ফখরুল বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করেন এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে দলের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় দল ও নেতাদের কাছ থেকে পাওয়া সহযোগিতার জন্যও তিনি কৃতজ্ঞতা জানান। 


বিএনপিতে তাঁর দীর্ঘ দায়িত্ব পালনের কথা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, তিনি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং মহাসচিব হিসেবে দলের দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব পালনের সময়ে কোনো ভুলভ্রান্তি হয়ে থাকলে কিংবা অনিচ্ছাকৃতভাবে কারও মনে আঘাত দিয়ে থাকলে তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করেন। দল তাঁকে যে সম্মান ও দায়িত্ব দিয়েছে, সেই সম্মান তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রক্ষা করবেন বলেও অঙ্গীকার করেন। 



দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করবেন না বলেও বক্তব্যে দৃঢ় অবস্থান জানান মির্জা ফখরুল। সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গভবনে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সেখানে গেলে দলীয় সহকর্মীদের তিনি মিস করবেন। এ সময় তিনি দলীয় সংসদ সদস্যদের কাছে দোয়া চান এবং আগামীকালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁর পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। 


মির্জা ফখরুলের এই বক্তব্যের আবেগঘন পরিবেশের প্রভাব পড়ে সভায় উপস্থিত অন্য নেতাদের ওপরও। সংসদ সদস্যদের বরাতে জানা গেছে, তাঁর বক্তব্যের সময় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে বৃহস্পতিবারের পর বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় মির্জা ফখরুল আর থাকবেন না—এই বাস্তবতাই তাঁর বক্তব্যকে বিদায়ী আবহ দেয়। 


মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের পর বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং দলীয় সংসদ সদস্যদের তাঁকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। তারেক রহমান বলেন, দলের দুঃসময়ে মির্জা ফখরুল সাহসিকতার সঙ্গে দলের হাল ধরেছেন এবং কখনো হাল ছাড়েননি। রাজনৈতিক জীবনে তাঁকে কারাবন্দিও হতে হয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। 


তারেক রহমান বলেন, ‘আজ ঐতিহাসিক একটি দিন। অনেক মূল্য দিয়ে আমরা আজ এ জায়গায় এসেছি।’ এ জন্য তিনি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন। দেশে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে রাষ্ট্রের সর্বত্র জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা হবে উল্লেখ করে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহির গুরুত্ব তুলে ধরেন। 


রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী দলীয় সংসদ সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল থাকার নির্দেশনা দেন। সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দলের মধ্যে শৃঙ্খলা ও ঐক্যের বিকল্প নেই। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে ভোট দেওয়ার বিষয়টিও তিনি স্পষ্ট করেন। 


বৈঠকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক নির্দেশনা দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া অনুষ্ঠিত হবে, ফলে এই নির্বাচন বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে। সংসদ সদস্যদের সঙ্গে নিজ নিজ এলাকার তৃণমূল নেতাকর্মীদের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্যও তিনি নির্দেশ দেন। 


তারেক রহমান আরও বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যাতে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ দল-সমর্থিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রার্থী না হন, সে জন্য এখন থেকেই কাজ শুরু করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য, যোগ্য ও জনপ্রিয় ব্যক্তিদের প্রার্থী করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। দলীয় ঐক্য অটুট রেখে নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করার জন্য সংসদ সদস্য ও নেতাকর্মীদের মাঠপর্যায়ে সক্রিয় হওয়ার বার্তাও দেন তিনি। 


বুধবারের বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তির আবহ। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি জয়ী হলে সক্রিয় দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি বিএনপির সংসদীয় দলের সঙ্গেও তাঁর নিয়মিত সম্পর্কের পরিবর্তন হবে। তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগের দিন অনুষ্ঠিত এই সভাকে তাঁর সংসদীয় দলের সহকর্মীদের সঙ্গে এক ধরনের বিদায়ী সাক্ষাৎ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। 


এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দীর্ঘ সময় পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে যাচ্ছে। বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদ। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট)। 


রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে বিএনপির সংসদীয় দলের এই বৈঠক তাই শুধু দলীয় প্রার্থীর পক্ষে ভোট নিশ্চিত করার আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; এর মধ্য দিয়ে মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের বিদায়, দলীয় ঐক্য ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশনা এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে বিএনপির মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতির বার্তাও সামনে এসেছে। 


সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ, সেলিমা রহমান, এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ দলের সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। 


সম্পর্কিত খবর

;