আসনাতুল আহাদ:
আমরা যেন বসবাস করছি এক অদ্ভুত সমান্তরাল বয়ানে। প্রতিনিয়ত আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠছে অগণিত মানুষের চেনা মুখ আর পরিচয়ের তালিকা। তবু আমরা সব তৃপ্তির আড়ালে টের পাই ভেতরে ভেতরে মানুষ কতটা একাকী নাবিক।
মানুষের মানসিক দূরত্বের খোঁজ করতে করতে আজকের সমাজ আমাদের এক নিঃশব্দ অসুস্থতার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। আধুনিকতা আমাদের উপহার দিয়েছিল একক পরিবার। আমরা ভেবেছিলাম তা আমাদের জন্য নিয়ে আসবে ডানা মেলার পূর্ণ স্বাধীনতা। কিন্তু আজ যৌথ পরিবারের সেই কোলাহলময় উঠোন উধাও হয়ে তৈরি হয়েছে চার দেয়ালের স্বয়ংসম্পূর্ণ এক জীবনব্যবস্থা। স্বাধীনতার বদলে আমরা বরং হয়ে যাচ্ছি সীমাবদ্ধ জীব। এই অবস্থায় আমাদের আশ্রয় নিতে হচ্ছে যান্ত্রিক নীল আলোর ভেতর।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোকে বর্তমান ও আগামী প্রজন্ম ক্রমশ আঁকড়ে ধরছে। এর ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ছদ্মবেশী বিভ্রমের ফাঁদকে আর ক্ষতিকারক কিছু হিসেবে চিহ্নিত করতে পারছে না আমাদের মস্তিষ্ক।
সোশ্যাল মিডিয়া; যেখানে নেই কোনো মমতার স্পর্শ, নেই নিঃশ্বাসের উত্তাপ, এমনকি নেই চোখের ভেতরের নীরবতার পাঠ। কেবল আছে নিখুঁতভাবে সাজানো কিছু বাহ্যিক উপস্থিতি। আমরা একটি ছোট্ট প্রতীক বা সামান্য শব্দ দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি নিজের অনুভূতি। তবু কেন যেন বুকের ভেতর জমানো গোপন কথাগুলো পরিপূর্ণ রূপ পায় না। ফলে মানুষের মনে তৈরি হচ্ছে এক সূক্ষ্ম বিচ্ছিন্নতাবোধ। মানুষ ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়েও নিজেকে ভাবছে অদ্ভুতভাবে নিঃসঙ্গ। এই নিঃসঙ্গতা থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে সামাজিক ভীতি এবং মানুষের মুখোমুখি হওয়ার অনীহা। পর্দার ওপারে আমরা যতটা সহজ, বাস্তব অভিজ্ঞতায় ততটাই আড়ষ্ট। চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার জায়গায় জমে ওঠে সংকোচ। কারণ পর্দার ওপারে সম্পর্ক বা সৌজন্য এড়িয়ে যাওয়ার যে সহজ উপায় থাকে, সরাসরি মুখোমুখি হওয়ার পরিস্থিতিতে সেই উপায় থাকে না। মুখোমুখি আলাপে মানুষের অসন্তুষ্টি, রাগ বা অনুভূতি মোকাবেলা করতে হয় সরাসরি। এই মোকাবেলার অক্ষমতাই মানুষকে দিন দিন আরও বেশি গুটিয়ে ফেলছে।
কারো ইচ্ছা ছাড়াই যেমন দুইয়ে দুইয়ে চার হয়, আত্মীয়তার শাখা-প্রশাখাও তেমনই ইচ্ছা ছাড়াই ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আত্মিক সম্পর্কের স্থায়িত্ব নির্ভর করে ইচ্ছার ওপরই। পরিবারের মানুষের সাথে এক টেবিলে বসে শুধু নীরবতা ভাগ করে নেওয়ার ভেতর যে মানসিক স্বস্তি ছিল, অনবরত যান্ত্রিক দৃশ্যপটের পেছনে ছুটতে গিয়ে তা আমরা হারিয়ে ফেলেছি। একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে যা আরও বেশি চোখে পড়ছে তা হলো, নিজের ভেতরে জমতে থাকা না-বলা কথা, আবেগ বা দুঃখগুলোকে অন্য কারো কাছে প্রকাশ করার মতো বিশ্বাসযোগ্য মানুষের তীব্র অভাব। ক্ষোভ আর বিষাদ যখন মনে জমা হতে থাকে, তখন জন্ম নেয় এক ভারী, অদৃশ্য মানসিক চাপ, যা মানুষকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দেয়।
আমরা কি তবে এক নিঃসঙ্গ প্রজন্মের দিকে হেঁটে যাচ্ছি? যে প্রজন্মে আছে শব্দের প্রাচুর্য, কিন্তু সংলাপ নেই; আছে অনেক সঙ্গী, কিন্তু নেই ভরসার আশ্রয়। ডিজিটাল আলোকমালায় মোড়ানো এই সময়ে দাঁড়িয়ে মনে হয়, আড়ম্বরপূর্ণ ছদ্মবেশ খুলে ফেলে আমাদের দরকার আবার একটু খাঁটি, উষ্ণ স্পর্শের দিকে ফিরে যাওয়া। এমন কোথাও—যেখানে ভালোবাসার জন্য প্রয়োজন হয় না কোনো বাহ্যিক সমর্থনের, আর দুঃখ ভাগ করার জন্য লাগে না কোনো যান্ত্রিক বার্তা।
-লেখক: শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
কাজী মামুনুর রহমান মাহিম:সাংবাদিকতা শুধু সংবাদ প্রকাশের কাজ নয়; অপরাধ, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য তুলে ধরার দায়িত্বও। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো সাংবাদিককে প্র ...
নিকোলাস বিশ্বাস:২৪ অক্টোবর “জাতিসংঘ দিবস”। ২০২৬ সালে গোটা বিশ্ব এ দিবসটি পালন করবে এমন এক সময়ে, যখন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গভীর সংকটের মুখে। যুদ্ধ বেসামরিক মানুষের জীবন বিপন্ন করছে, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্ব ...
সামীনা জান্নাত:বাংলাদেশে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের মধ্যে ধর্ষণ সবচেয়ে নৃশংস ও হৃদয়বিদারক। খবরের কাগজ খুললে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই দেশের কোনো না কোনো প্রান্ত থেকে এই পাশবি ...
খোন্দকার মাহ্ফুজুল হক: একটি পরিবার যখন দারিদ্র্য, বেকারত্ব, খাদ্যসংকট, অসুস্থতা কিংবা আকস্মিক আয়হানির মুখোমুখি হয়, তখন সংকটটি কেবল একজন ব্যক্তির থাকে না—তার প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর। তাই সামা ...
সব মন্তব্য
No Comments