তাহমিদা খানম: আমরা যে শ্রেণিকক্ষের সঙ্গে পরিচিত—সামনে একজন শিক্ষক, পেছনে সারিবদ্ধ ডেস্কে বসে থাকা শিক্ষার্থীরা, নির্দিষ্ট সময়সূচি, পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষা—তা কি কেবল শিক্ষার্থীদের শেখানোর সুবিধার্থে তৈরি হয়েছিল? নাকি বিপুলসংখ্যক মানুষকে কম ব্যয়ে পরিচালনা, শ্রেণিবদ্ধ ও নিয়ন্ত্রণ করার প্রশাসনিক প্রয়োজনও এর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল? আধুনিক প্রযুক্তি ও সমাজব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের পরও এই কাঠামো কেন টিকে আছে, তা বুঝতে এর ইতিহাস ও রাজনৈতিক অর্থনীতি বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
১. শ্রেণিকক্ষের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক বিবর্তন:
সংগঠিত শিক্ষাকেন্দ্রের প্রমাণ প্রাচীন মেসোপটেমিয়া পর্যন্ত পাওয়া যায়। বর্তমান ইরাকের নিপ্পুরে আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের একটি স্থাপনা House F প্রাচীন লিপিশিক্ষার বিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত। সেখানে শিক্ষার্থীরা কিউনিফর্ম লিপি ও গণিত শিখত। তবে এটি আধুনিক গণশিক্ষাব্যবস্থা ছিল না।
বর্তমানের শ্রেণিভিত্তিক ও শিক্ষকনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা ধীরে ধীরে ইউরোপে বিকশিত হয়। ১৭৮৯ সালে মাদ্রাজে Andrew Bell এবং পরবর্তী সময়ে ইংল্যান্ডে Joseph Lancaster-এর Monitorial System গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এতে অপেক্ষাকৃত অগ্রসর শিক্ষার্থীরা অন্যদের শেখাতে সাহায্য করত এবং একজন প্রধান শিক্ষক বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পরিচালনা করতে পারতেন। পরবর্তী সময়ে বয়সভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস, পৃথক শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষককেন্দ্রিক পাঠদান বিস্তার লাভ করে। আধুনিক শ্রেণিকক্ষের তাই কোনো একক আবিষ্কারক নেই।
২. শিক্ষার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক দক্ষতার ভূমিকা:
•UNESCO-এর ২০২১/২২ সালের Global Education Monitoring Report অনুযায়ী, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে রাষ্ট্রগুলো শিক্ষিত কর্মশক্তি তৈরি এবং জাতীয় পরিচয় শক্তিশালী করার জন্য সরকারি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী হয়। একই বয়সের শিক্ষার্থীকে একই শ্রেণিতে রাখা, অভিন্ন পাঠ্যক্রম, সময়সূচি ও পরীক্ষাব্যবস্থা চালু করা প্রশাসনিকভাবে সুবিধাজনক ছিল। সারিবদ্ধ আসন শিক্ষকের পক্ষে শিক্ষার্থীদের পর্যবেক্ষণ ও পরিচালনাও সহজ করেছিল।
•Michel Foucault তাঁর Discipline and Punish (১৯৭৫) গ্রন্থে বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সময়সূচি, পর্যবেক্ষণ, শ্রেণিবিন্যাস ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে ক্ষমতা পরিচালনার বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন। তবে বিদ্যালয়কে পুরোপুরি কারখানার অনুকরণ বলা ঐতিহাসিকভাবে যথাযথ নয়।
•Davis, Conroy ও Clague-এর ২০২০ সালের Schools as Factories: The Limits of a Metaphor গবেষণায় দেখানো হয়েছে, শিল্পব্যবস্থার প্রভাব থাকলেও এই উপমা দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার সম্পূর্ণ ইতিহাস ব্যাখ্যা করা যায় না।
৩. আধুনিক যুগেও প্রচলিত কাঠামো কেন টিকে আছে?
এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রচলিত শ্রেণিব্যবস্থা তুলনামূলক কম ব্যয়ে অধিকসংখ্যক শিক্ষার্থী পরিচালনা করতে সহায়তা করে। বিদ্যালয়ের ভবন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা ও উচ্চশিক্ষায় ভর্তির নিয়মও বিদ্যমান ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
•Tyack ও Cuban তাঁদের Tinkering Toward Utopia (১৯৯৫) গ্রন্থে Grammar of Schooling ধারণার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন, দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক অভ্যাস ও সামাজিক প্রত্যাশা বিদ্যালয়ের মৌলিক কাঠামোকে স্থিতিশীল রাখে।
৪. বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রভাব:
আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা রয়েছে। UNESCO, World Bank ও OECD বিভিন্ন দেশের শিক্ষানীতি, অর্থায়ন, মূল্যায়ন ও সংস্কার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে।
•Edwards ও তাঁর সহগবেষকদের ২০২৪ সালের Review of Educational Research-এ প্রকাশিত পর্যালোচনায় ৭০টি গবেষণা বিশ্লেষণ করে World Bank-এর শিক্ষানীতিতে প্রভাব বিস্তারের ১১টি পথ চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থায়ন, নীতিগত পরামর্শ, গবেষণা ও জ্ঞান উৎপাদন এর অন্তর্ভুক্ত। OECD-এর PISA আন্তর্জাতিক মূল্যায়নও বিভিন্ন দেশের শিক্ষা সংস্কারকে প্রভাবিত করেছে।
•UNESCO-এর প্রতিবেদন দেখিয়েছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পাঠ্যবই, মূল্যায়ন, প্রযুক্তি ও অন্যান্য শিক্ষা-সেবায় বাণিজ্যিকভাবে যুক্ত। তবে এসব তথ্য থেকে কোনো নির্দিষ্ট বৈশ্বিক শক্তি পরিকল্পিতভাবে পৃথিবীর সব শিক্ষার্থীকে পুরোনো শ্রেণিকক্ষে আটকে রেখেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রমাণ নেই।
৫. প্রচলিত শ্রেণিকক্ষ পরিবর্তনের সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাব:
শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক, সহযোগিতামূলক ও নমনীয় শিক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষণী ও সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ: Active Learning-এ শিক্ষার্থীরা শুধু তথ্য গ্রহণ করে না; প্রশ্ন করে, যুক্তি উপস্থাপন করে এবং সমস্যা সমাধান করে। Scott Freeman ও সহগবেষকদের ২০১৪ সালের PNAS-এ প্রকাশিত ২২৫টি গবেষণার Meta-analysis-এ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের STEM বিষয়ে Active Learning-এ পরীক্ষার ফল গড়ে প্রায় ৬ শতাংশ বেশি পাওয়া যায়। প্রচলিত লেকচারভিত্তিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য হওয়ার ঝুঁকিও প্রায় ১.৫ গুণ ছিল।
সহযোগিতা ও যোগাযোগের দক্ষতা: Education Endowment Foundation-এর পর্যালোচনায় কাঠামোবদ্ধ Collaborative Learning-এর সঙ্গে গড়ে অতিরিক্ত পাঁচ মাসের শিক্ষাগত অগ্রগতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তিন থেকে পাঁচজনের দল এবং সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাধীনভাবে শেখার সক্ষমতা: EEF-এর ৩৫৫টি গবেষণাভিত্তিক Metacognition and Self-regulation পর্যালোচনায় গড়ে অতিরিক্ত আট মাসের অগ্রগতির কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ নিজের শেখার পরিকল্পনা, অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও আত্মমূল্যায়নের দক্ষতা বিকাশ গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া দলগত প্রকল্প, বিতর্ক, গবেষণা, উপস্থাপনা ও বাস্তব সমস্যাভিত্তিক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্ব, দায়িত্বশীলতা এবং বাস্তবজীবনে জ্ঞান প্রয়োগের সুযোগ বাড়াতে পারে।
৬. আধুনিক ব্যবস্থার সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব:
পরিবর্তন মানেই স্বয়ংক্রিয় উন্নতি নয়। যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়া নতুন ব্যবস্থা কয়েকটি সমস্যা তৈরি করতে পারে।
মনোযোগের ঘাটতি ও বিশৃঙ্খলা: একই কক্ষে একাধিক দল কাজ করলে শব্দ ও পারস্পরিক বিঘ্ন বাড়তে পারে। ফলে কিছু শিক্ষার্থীর মনোযোগ কমে যেতে পারে।
অসম অংশগ্রহণ: দলগত কাজে আত্মবিশ্বাসী শিক্ষার্থীরা বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারে এবং অন্যরা নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে। EEF-ও সতর্ক করেছে, সঠিক দায়িত্ব বণ্টন ও শিক্ষকীয় তত্ত্বাবধান ছাড়া Collaborative Learning কার্যকর হয় না।
শিক্ষকের কর্মচাপ: প্রত্যেক শিক্ষার্থীর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, পৃথক প্রতিক্রিয়া দেওয়া এবং বিভিন্ন কার্যক্রম মূল্যায়নে অধিক সময় ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
আর্থিক বৈষম্য: নমনীয় আসবাবপত্র, গবেষণাগার, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের ব্যয় দরিদ্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বাধা হতে পারে।
প্রযুক্তিনির্ভরতার ঝুঁকি: UNESCO-এর ২০২৩ সালের Technology in Education প্রতিবেদনে ডিজিটাল বৈষম্য, অতিরিক্ত প্রযুক্তি ব্যবহার, বিভ্রান্তি ও তথ্যের গোপনীয়তার সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে। প্রযুক্তি শিক্ষক ও সরাসরি শিক্ষাদানের বিকল্প নয়; বরং সহায়ক মাধ্যম হওয়া উচিত।
৭. ভবিষ্যতের জন্য কোন শিক্ষাব্যবস্থা অধিক বিবেচনাযোগ্য?
প্রচলিত শ্রেণিকক্ষ পুরোপুরি বিলুপ্ত করা কিংবা সব সময় শিক্ষার্থীদের দলবদ্ধ রাখা সমাধান নয়। বরং Hybrid and Flexible Learning Model গ্রহণ করা যেতে পারে।
এতে শিক্ষক প্রয়োজন অনুযায়ী সরাসরি পাঠদান করবেন; শিক্ষার্থীরা ছোট দলে আলোচনা ও গবেষণা করবে; ব্যক্তিগত অনুশীলন, বাস্তব প্রকল্প এবং প্রযুক্তির ব্যবহারও থাকবে। মূল্যায়ন শুধু পরীক্ষার নম্বরে সীমাবদ্ধ না রেখে বিশ্লেষণ, যুক্তি, সৃজনশীলতা ও বাস্তব প্রয়োগকেও গুরুত্ব দেবে।
UNESCO-এর ২০২১ সালের Reimagining Our Futures Together প্রতিবেদনও সহযোগিতামূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
শেষ কথা:
প্রচলিত শ্রেণিকক্ষ একসময় গণশিক্ষার বিস্তার, স্বল্প ব্যয়ে শিক্ষার্থী পরিচালনা এবং রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু কোনো ঐতিহাসিকভাবে কার্যকর ব্যবস্থা ভবিষ্যতের জন্য অপরিবর্তনীয় আদর্শ হতে পারে না। শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন শুধু স্মার্টবোর্ড বা ডিজিটাল প্রযুক্তি সংযোজন নয়; বরং শিক্ষাদান, মূল্যায়ন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং শ্রেণিকক্ষের কাঠামোকে নতুনভাবে বিবেচনা করা। একটি আদর্শ শ্রেণিকক্ষ সেই কক্ষ নয়, যেখানে সব শিক্ষার্থী একইভাবে বসে থাকে; বরং সেই শিক্ষার পরিবেশ, যেখানে প্রত্যেক শিক্ষার্থী বোঝার, প্রশ্ন করার, যুক্তি দেওয়ার, ভুল থেকে শেখার এবং নিজের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পায়।
-লেখক: শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
সামীনা জান্নাত:বাংলার প্রকৃতি চিরকালই ঋতুবদলের রঙে রঙিন। ষড়ঋতুর এই দেশে এক ঋতু বিদায় না নিতেই আরেক ঋতু এসে নিঃশব্দে জায়গা করে নেয় প্রকৃতির আঙিনায়। শরতের কাশফুলের শুভ্র সৌন্দর্য ফিকে হওয়ার সাথে সাথে প ...
মানিক লাল ঘোষ:বাঙালির রাজনৈতিক মুক্তি, স্বাধিকার ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সুদীর্ঘ ইতিহাসে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান—এই দুই ক্ষণজন্মা পুরুষ যেন একই সূত্রে গাঁথ ...
আসনাতুল আহাদ:আমরা যেন বসবাস করছি এক অদ্ভুত সমান্তরাল বয়ানে। প্রতিনিয়ত আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠছে অগণিত মানুষের চেনা মুখ আর পরিচয়ের তালিকা। তবু আমরা সব তৃপ্তির আড়ালে টের পাই ভেতরে ভেতরে মানুষ কতটা এ ...
কাজী মামুনুর রহমান মাহিম:সাংবাদিকতা শুধু সংবাদ প্রকাশের কাজ নয়; অপরাধ, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য তুলে ধরার দায়িত্বও। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো সাংবাদিককে প্র ...
সব মন্তব্য
No Comments