কলম্বিয়ায় ৭.৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প, নিহত অন্তত ৭৭

প্রকাশ : 10 Aug 2026
কলম্বিয়ায় ৭.৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প, নিহত অন্তত ৭৭

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: লাতিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ৭৭ জন নিহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় সোমবার (১০ আগস্ট) সকালে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এতে বিভিন্ন শহরে ভবন ধসে পড়ে, বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন এবং আতঙ্কে ঘরবাড়ি ও হাসপাতাল থেকে মানুষজনকে বাইরে বের করে আনা হয়। প্রতিবেশী ইকুয়েডর ও পানামাতেও কম্পন অনুভূত হয়েছে।


মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল কলম্বিয়ার চোকো অঞ্চলের সান হোসে দেল পালমার এলাকার কাছে। রাজধানী বোগোতা থেকে এলাকাটি প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পশ্চিমে। ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল প্রায় ১০৭ কিলোমিটার। স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩৪ মিনিটে কম্পন শুরু হয় এবং দেশটির ৩২টি প্রাদেশিক রাজধানীসহ অন্তত নয়টি বিভাগে তা অনুভূত হয়।


রয়টার্স জানিয়েছে, সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে দেশটির রিসারালদা প্রদেশে। সেখানকার গভর্নর জুয়ান দিয়েগো পাতিনো স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রদেশটিতে অন্তত ৪২ জন নিহত হয়েছেন। প্রদেশটির রাজধানী পেরেইরায় বেশ কয়েকটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে একটি ভবনের ফাটলধরা অংশ ধসে পড়তে দেখা গেছে।


ভূমিকম্পে কলম্বিয়ার কফি উৎপাদনকারী অঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি শহর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পেরেইরা, কালি, মানিজালেস ও কুইবদো শহরে ভবন ধসে পড়া ও বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কালি শহরের মেয়র আলেহান্দ্রো এদের জানিয়েছেন, সেখানে অন্তত ২৫টি স্থাপনা ধসে পড়েছে এবং বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মানুষ আটকা পড়েছেন। উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য রাজধানী বোগোতা ও মেডেলিন থেকে দুর্যোগ মোকাবিলা দল পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছে।


মানিজালেস শহরেও ভূমিকম্পের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। শহরটির ঐতিহাসিক গথিক ধাঁচের ক্যাথেড্রালের একটি টাওয়ার ধসে পড়েছে। শহরের মেয়র জর্জ এদুয়ার্দো রোহাস জানিয়েছেন, সেখানে তিনজন নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে আফটারশকের আশঙ্কায় বাসিন্দাদের ভবনের বাইরে অবস্থান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।


প্রশান্ত মহাসাগরীয় বন্দরনগরী বুয়েনাভেনতুরাতেও একটি ভবন ধসে একজন নিহত হয়েছেন এবং কয়েকজন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন। চোকো প্রদেশের রাজধানী কুইবদোতেও আহত ও ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধারকারী দল ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের সন্ধান করছে।


ভূমিকম্পের পর কালি শহরের একটি হাসপাতালে রোগীদের দ্রুত বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়। হাসপাতালের রোগীদের হাসপাতাল বেডেই বাইরে নিয়ে আসার ছবি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। পেরেইরা বিমানবন্দরেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে বিমানবন্দরের ছাদের কিছু অংশ খসে পড়ার পর যাত্রীরা আতঙ্কে নিরাপদ স্থানে সরে যান।


ভূমিকম্পের কারণে দেশটির ছয়টি বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করা হয়েছে। পেরেইরা, মানিজালেস, কুইবদো, আর্মেনিয়া, কার্তাগো ও বুয়েনাভেনতুরার বিমানবন্দরে কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি পরীক্ষা করে দেখছেন কর্মকর্তারা। নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পর এসব বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক করার কথা রয়েছে।


ভূমিকম্পের পর পরই আরও কম্পনের আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে। কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক সংস্থা জানিয়েছে, মূল ভূমিকম্পের পর ২ দশমিক ৮ ও ৪ দশমিক ৮ মাত্রার দুটি আফটারশক রেকর্ড করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।


তবে ভূমিকম্পের পর কোনো সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়নি। মার্কিন সুনামি সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পের কারণে সুনামির কোনো হুমকি নেই। ফলে উপকূলীয় এলাকায় সুনামি নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়নি।


কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এটি গত এক দশকে দেশটিতে রেকর্ড হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। দেশটিতে ছোট মাত্রার ভূমিকম্প নিয়মিত হলেও ৬ মাত্রার বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্প তুলনামূলক বিরল। তবে কলম্বিয়া আন্দিজ পর্বতমালার ভূকম্পনপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ভূমিকম্প ও ভূমিধসের ঝুঁকি রয়েছে।


কলম্বিয়ায় বড় ভূমিকম্পের ইতিহাসও রয়েছে। ১৯৯৯ সালে দেশটির আর্মেনিয়া অঞ্চলে ৬ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন। আর ১৯৮৫ সালের আরমেরো দুর্যোগে ভূমিকম্প-পরবর্তী ভূমিধসে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ প্রাণ হারান।


এবারের ভূমিকম্পের পর কলম্বিয়ার সদ্য দায়িত্ব নেওয়া প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতায় সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে এত বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ তার সরকারের জন্য প্রথম বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে।


প্রতিবেশী ইকুয়েডরেও ভূমিকম্পের কম্পন অনুভূত হয়েছে। পানামাতেও কম্পন অনুভূত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে এসব দেশে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।


এদিকে ধ্বংসস্তূপে আরও মানুষ আটকা থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকারী দলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোতে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে এবং ধসে পড়া ভবনের নিচে কেউ জীবিত অবস্থায় আটকা আছেন কি না, তা খুঁজে দেখা হচ্ছে।


ভূমিকম্পের কয়েক ঘণ্টা পরও পশ্চিম কলম্বিয়ার বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক কাটেনি। আফটারশকের আশঙ্কায় বহু মানুষ ঘরে ফিরতে ভয় পাচ্ছেন। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এবং নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা জানতে উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

সম্পর্কিত খবর

;