মস্কোর নতুন উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : রাশিয়া থেকে ভারত মহাসাগর ও ভারত পর্যন্ত সরাসরি রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে মস্কো। রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী মারাত খুসনুলিন বলেছেন, ভারত মহাসাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকার তৈরি করতে স্থলপথে নতুন রেল যোগাযোগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।
রোববার (৯ আগস্ট) রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ সম্ভাবনার কথা জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত যোগাযোগব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে রাশিয়া থেকে ভারত পর্যন্ত পণ্য পরিবহনে সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং ইউরেশিয়াজুড়ে একটি বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরি হবে।
খুসনুলিন বলেন, রাশিয়া থেকে ভারত মহাসাগরে পৌঁছানোর জন্য সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থলপথ বিবেচনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে মধ্য এশিয়ার দেশগুলো হয়ে ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে ভারতে যাওয়ার সম্ভাব্য রুটও রয়েছে। ভারত পর্যন্ত যেকোনো কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থাকেই মস্কো সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছে।
রাশিয়ার এই পরিকল্পনার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের ঝুঁকির কথা উঠে এসেছে। বিশেষ করে বসফরাস প্রণালি ও হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ কোনো কারণে বাধাগ্রস্ত হলে রাশিয়া থেকে দক্ষিণ এশিয়া ও ভারতমুখী বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। নতুন স্থল ও রেলপথ তৈরি হলে এসব সামুদ্রিক সংকটের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে তা ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
তবে প্রস্তাবিত রেল যোগাযোগকে সম্পূর্ণ নতুন একটি একক রেললাইন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। রাশিয়ার দীর্ঘদিনের নর্থ-সাউথ ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট করিডোর বা আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোরকে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করার পরিকল্পনার সঙ্গেও এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
রাশিয়া, ভারত ও ইরান ২০০০ সালে নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোর প্রতিষ্ঠার জন্য চুক্তি করে। পরে আরও কয়েকটি দেশ এতে যুক্ত হয়। প্রায় ৭ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বহুমাত্রিক করিডোরের লক্ষ্য হলো ভারত ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ইরান, কাস্পিয়ান অঞ্চল ও রাশিয়ার মধ্য দিয়ে ইউরোপে পণ্য পরিবহন সহজ করা। এতে রেল, সড়ক ও সমুদ্রপথের সমন্বিত ব্যবহার রয়েছে।
এই করিডোরের তিনটি প্রধান রুট রয়েছে। পশ্চিম রুটটি রাশিয়ার দাগেস্তান হয়ে সড়ক ও রেলপথে আজারবাইজান ও ইরানের দিকে যায়। ট্রান্স-ক্যাস্পিয়ান রুটে কাস্পিয়ান সাগর ব্যবহার করা হয়। আর পূর্ব রুটটি কাজাখস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের মধ্য দিয়ে ইরানের দিকে যায়। এর মাধ্যমে ভারত ও ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
নর্থ-সাউথ করিডোরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অসম্পূর্ণ অংশগুলোর একটি হচ্ছে ইরানের রাশত-আস্তারা রেলপথ। রাশিয়া ও ইরান ২০২৩ সালে এই প্রায় ১৬০ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে চুক্তি করে। প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইউরো। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে প্রকল্পটির বাস্তবায়নপর্ব শুরু করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে এ প্রকল্পের অর্থায়ন ও জমিসংক্রান্ত বেশ কিছু জটিলতাও এরই মধ্যে সমাধান করা হয়েছে।
রাশিয়ার জন্য রাশত-আস্তারা রেলপথ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সম্পন্ন হলে রাশিয়া-আজারবাইজান-ইরান হয়ে পারস্য উপসাগরের দিকে আরও ধারাবাহিক রেল যোগাযোগ তৈরি হবে। ফলে কাস্পিয়ান সাগরভিত্তিক বর্তমান মাল্টিমোডাল ব্যবস্থার কিছু সীমাবদ্ধতা কমবে এবং পণ্য পরিবহন আরও দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
ভারতও নর্থ-সাউথ করিডোরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা দেশ। ইতোমধ্যে রাশিয়া থেকে ভারতগামী পণ্যবাহী ট্রেন ইরান পর্যন্ত পৌঁছেছে। ২০২২ সালে প্রথম রুশ ভারতমুখী পণ্যবাহী ট্রেন ইরানে প্রবেশ করে। ট্রেনটিতে ৩৯টি কনটেইনার ছিল এবং রাশিয়া থেকে ইরান পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছিল। এরপর পণ্য ইরানের শাহিদ রাজায়ি বন্দরে নিয়ে সমুদ্রপথে ভারতে পাঠানোর কথা ছিল।
এখানেই মস্কোর নতুন পরিকল্পনার গুরুত্ব। বর্তমানে রাশিয়া থেকে ভারতমুখী নর্থ-সাউথ রুটে রেল ও সমুদ্রপথ মিলিয়ে পণ্য পরিবহন করতে হয়। সরাসরি বা প্রায় সরাসরি স্থল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা গেলে ট্রানজিট সময় কমানো, পরিবহন ব্যয় কমানো এবং সরবরাহব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
রাশিয়া এর আগে কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও ইরান হয়ে ভারত পর্যন্ত নর্থ-সাউথ করিডোর সম্প্রসারণের কথা জানিয়েছে। ২০২৩ সালে খুসনুলিন বলেছিলেন, এই করিডোরে কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, আজারবাইজান ও তুর্কমেনিস্তানের রেল ও সড়ক যোগাযোগকে যুক্ত করে ইরান ও ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
পাশাপাশি আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকেও সম্ভাব্য আঞ্চলিক ট্রানজিট রুট হিসেবে বিবেচনা করছে মস্কো। ২০২৫ সালে খুসনুলিন জানিয়েছিলেন, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সঙ্গে রাশিয়ার আন্তর্জাতিক পরিবহন করিডোর তৈরির সুযোগ রয়েছে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও রাশিয়ার সঙ্গে রেল যোগাযোগ স্থাপনের সম্ভাব্য রুট নিয়ে কাজ করার কথা জানানো হয়েছে।
তবে রাশিয়া থেকে ভারত পর্যন্ত একটানা রেল যোগাযোগ বাস্তবায়ন সহজ হবে না। এর জন্য একাধিক দেশের সঙ্গে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ, সীমান্ত ও কাস্টমস ব্যবস্থা সমন্বয়, বিভিন্ন দেশের রেলপথের প্রযুক্তিগত পার্থক্য দূর করা এবং বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মতো দেশের মধ্য দিয়ে রেলপথ নিলে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
রাশিয়ার বর্তমান অগ্রাধিকার মূলত পণ্য পরিবহন। নর্থ-সাউথ করিডোরের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা করছে মস্কো। রাশিয়ার কর্মকর্তারা এর আগে জানিয়েছিলেন, দীর্ঘমেয়াদে এই করিডোরের বার্ষিক পরিবহন সক্ষমতা ১০ কোটি টন পর্যন্ত নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৩ কোটি টন পণ্য পরিবহনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
রাশিয়ার দৃষ্টিতে এই করিডোর শুধু ভারতমুখী বাণিজ্যপথ নয়, ইউরেশিয়ার উত্তর ও দক্ষিণ অংশকে সংযুক্ত করার একটি কৌশলগত অবকাঠামো। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং প্রচলিত ইউরোপমুখী বাণিজ্যপথে নানা বাধার কারণে মস্কো এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরিতে জোর দিচ্ছে।
ভারতের জন্যও এই রুটের সম্ভাব্য গুরুত্ব রয়েছে। রাশিয়া ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও পণ্য সরবরাহকারী অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়াতে হলে দ্রুত ও তুলনামূলক কম খরচের পরিবহন ব্যবস্থা প্রয়োজন। নতুন রেল ও স্থলপথ সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এর আগে নর্থ-সাউথ করিডোরের মাধ্যমে রাশিয়া ও ভারতের মধ্যে পণ্য পরিবহনের সময় সুয়েজ খালনির্ভর সমুদ্রপথের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। আজকের দিনে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়ায় বিকল্প স্থলপথের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
সব মিলিয়ে রাশিয়া থেকে ভারত পর্যন্ত সরাসরি রেল যোগাযোগের ধারণাটি এখনো সম্ভাব্যতা ও রুট নির্ধারণের পর্যায়ে রয়েছে। তবে নর্থ-সাউথ করিডোর, রাশত-আস্তারা রেলপথ এবং মধ্য এশিয়া-ইরানভিত্তিক যোগাযোগ অবকাঠামোর অগ্রগতি বাস্তবায়িত হলে রাশিয়া-ভারত স্থল যোগাযোগের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে যাবে। ফলে মস্কোর নতুন প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে তা শুধু দুই দেশের বাণিজ্য নয়, পুরো ইউরেশিয়ার পরিবহন ও ভূরাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে তা আগের চেয়ে অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছে মিসর। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাতি বলেছেন, এমন সংঘাতের প্রভ ...
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলায় জোশিমঠ-বদ্রীনাথ রুটে নিখোঁজ হওয়া বেসরকারি হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয়েছে। দুর্ঘটনায় চালক ও ৫ যাত্রীসহ মোট ৬ জনই নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে জেলা প্রশাসন। ভা ...
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইসরায়েলে গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ২৬তম নেসেট নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়ে গভীর রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১ আসন, কিন্তু প্রধান ...
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: স্পেনের তোলেদো অঞ্চলে দ্রুতগতির দুটি ট্রেনের সংঘর্ষে ৪৬ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাতে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ ...
সব মন্তব্য
No Comments