বিভ্রান্তকারীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রকাশ : 09 Aug 2026
বিভ্রান্তকারীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

স্টাফ রিপোর্টার: দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি অব্যাহত রাখা এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের ব্যাপারে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বিভ্রান্তকারীরা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে নিজেদের মতো চলে যাবে, কিন্তু দিনশেষে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের জনগণ।


রোববার (৯ আগস্ট) চট্টগ্রামের বাঁশখালী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ মাঠে চট্টগ্রাম জেলার সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের লক্ষ্যে আয়োজিত ‘গৃহ হস্তান্তর, অনুদান ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।


প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিগত কিছুদিন ধরে কিছু মানুষ বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। তাদের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, যেন তারা কোনোভাবে বিশৃঙ্খলা বা বিভ্রান্তি সৃষ্টির সুযোগ না পায়। বিভ্রান্তকারীরা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে নিজেদের মতো চলে যাবে, কিন্তু দিনশেষে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের জনগণ।’


সংসদে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা উপস্থাপনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সরকার জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ সার্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনা উপস্থাপন করবে। বিরোধী দল বা অন্য কারও কোনো পরিকল্পনা থাকলে তা জনগণের সামনে উপস্থাপন করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিভ্রান্তিকর কথা বলে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কিংবা জনগণের শান্তি নষ্ট করা যাবে না।


তিনি বলেন, দেশ স্বাধীন হয়েছে ৫০ বছরের বেশি সময় আগে। এখন আর পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই, এখন কাজ করার এবং দেশ গড়ার সময়।


প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ সরকারকে নির্বাচিত করেছে, তাই সরকারের মূল দায়িত্ব জনগণের পাশে থাকা। সুখে-দুঃখে মানুষের পাশে থাকা, মা-বোনদের পাশে থাকা, সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা, অসুস্থ মানুষের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তরুণ ও যুবসমাজের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাই সরকারের দায়িত্ব।


নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার গঠনের এক মাসের মধ্যেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রকল্পের কাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে এবং চলতি মাসের ১৬ তারিখ থেকে মূল কাজ শুরু হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের প্রায় ৪১ লাখ পরিবারের প্রধান নারীর হাতে এ কার্ড তুলে দেওয়া হবে। বাঁশখালী উপজেলায় প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার পরিবার এই সুবিধার আওতায় আসবে।


মা-বোনদের জন্য ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড চালুর কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। সাধারণ কৃষকের পাশাপাশি লবণচাষিরাও এ সুবিধা পাবেন বলে জানান তিনি। লবণচাষিদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফেরাতে শিগগিরই লবণের নতুন মূল্য নির্ধারণের ঘোষণা দেওয়া হবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।


চট্টগ্রামকে অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, রোববার সকালে তিনি মাতারবাড়ীসহ চট্টগ্রামের মহেশখালী ও মীরসরাই অঞ্চল পরিদর্শন করেছেন। বিশাল সমুদ্রকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে কাজে লাগিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা হচ্ছে। চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ অঞ্চলের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যেখানে বহু শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে এবং হাজার হাজার যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।


স্বাস্থ্যসেবা খাতের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে উপজেলা পর্যায়ে থাকা ৫০ শয্যার হাসপাতালগুলো আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে। এর মাধ্যমে তৃণমূলের মানুষ আরও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা পাবেন।


বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিগত সময়ে দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত হাতে গোনা কিছু ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। জনগণের স্বার্থে অপরিকল্পিত ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন। সরকার ইতোমধ্যে এ কাজ শুরু করেছে। আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কেমন হবে, সেই প্রস্তাবনা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে বলেও জানান তিনি।


তিনি বলেন, এমন পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে, যাতে স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, মিল-কারখানা কিংবা বাসাবাড়ি—সব জায়গায় মানুষ নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ পায়। পাশাপাশি গাড়ি-মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষ যেন সহজে গ্যাস ও জ্বালানি সুবিধা পায়, সেই লক্ষ্যেও কাজ করা হচ্ছে।


চট্টগ্রাম থেকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রামের দুই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। তাই এ এলাকার উন্নয়ন কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।


তারেক রহমান বলেন, ‘আর পিছনে পড়ে থাকা যাবে না। এখন একটি লক্ষ্য, একটি উদ্দেশ্য, তা হলো জনগণের জীবনমান উন্নত করা। দেশের ভাগ্যের পরিবর্তন করা।’


তিনি বলেন, জনগণের সমর্থন থাকলে সরকারের নেওয়া কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। বিএনপির সব ক্ষমতার উৎস জনগণ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের সমর্থন নিয়েই দেশের মানুষের স্বার্থে সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।


তিনি বলেন, বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে কর্মশক্তিতে রূপান্তর করতে চায় সরকার। যাতে প্রত্যেক মানুষ দেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারেন এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের ও পরিবারের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারেন।


প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসুন আজকের এই জনসভায় আমরা সেই শপথ গ্রহণ করে প্রতিজ্ঞা করি যে বাংলাদেশের মানুষ আর বিভ্রান্ত হবে না। বাংলাদেশের মানুষ এখন সামনের দিকে যাবে, বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন করবে।’


এর আগে দিনব্যাপী সফরের শুরুতে রোববার সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে হেলিকপ্টারে করে কক্সবাজারের মহেশখালীর উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। সকাল পৌনে ১১টার দিকে তিনি মাতারবাড়ীতে পৌঁছান। সেখানে তিনি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন করেন।


মাতারবাড়ীর এসব প্রকল্প পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত হন। দেশের বন্দর, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে মাতারবাড়ীকে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে দেখা হচ্ছে।


মাতারবাড়ী ও মহেশখালীর কর্মসূচি শেষে দুপুরে হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাহারছড়া এলাকায় পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। তাঁকে একনজর দেখতে সমুদ্রপাড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন।


বাঁশখালীতে পৌঁছে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসন কর্মসূচিতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। বন্যায় ঘর হারানো ১০০টি অসচ্ছল পরিবারের জন্য নতুন ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। বাঁশখালী পৌরসভা ও উপজেলার নয়টি ইউনিয়ন থেকে ১০টি করে পরিবারকে এ পুনর্বাসন কর্মসূচির জন্য নির্বাচন করা হয়। প্রতিটি ঘরে দুটি কক্ষ ও একটি সংযুক্ত শৌচাগার রয়েছে। উপকূলীয় এলাকার দুর্যোগঝুঁকি বিবেচনায় আরসিসি পিলার, কাঠ ও টিন ব্যবহার করে ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে।


অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী একটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের হাতে নতুন বাড়ির চাবি তুলে দেন। বাড়ির আঙিনায় একটি মেহগনি গাছের চারাও রোপণ করেন তিনি। একই সঙ্গে ওই পরিবারকে চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং হাঁস-মুরগি দেওয়া হয়। এছাড়া বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত আরও ২০০ পরিবারের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণের কর্মসূচি ছিল। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ১৫ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও শিশুকে আর্থিক সহায়তার চেক দেওয়ার কথাও জানানো হয়।


বাঁশখালীর কর্মসূচি শেষে প্রধানমন্ত্রী ফটিকছড়ির আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় যান। সেখানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তিনি। রোববার বিকেল ৪টা ১২ মিনিটে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, প্রধানমন্ত্রী হেফাজত আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেন।


এ সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং সংসদ সদস্য সরোয়ার আলম ও গিয়াস কাদের চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। সাক্ষাৎ শেষে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায়ও অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।


পরে হাটহাজারীর আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের প্রয়াত আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর কবর জিয়ারত করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেন।


দিনব্যাপী এ সফরে প্রধানমন্ত্রী সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, জ্বালানি নিরাপত্তা, বন্দর ও অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে জনগণের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

সম্পর্কিত খবর

;