দৌলতপুরে আল্লারদর্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ জলমগ্ন, দুর্ভোগে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা

প্রকাশ : 09 Aug 2026
দৌলতপুরে আল্লারদর্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ জলমগ্ন, দুর্ভোগে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা

দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি : কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে আল্লারদর্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। শ্রেণিকক্ষ জলমগ্ন হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এতে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি খেলাধুলা ও শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশও বিঘ্নিত হচ্ছে। এছাড়া অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পানির কারণে পানিবাহিত রোগসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে শিক্ষার্থীদের।


গতকাল রোববার সকালে বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, আল্লারদর্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নিচতলার শ্রেণিকক্ষগুলোতে পানি প্রবেশ করে প্রায় হাঁটুপানির সৃষ্টি হয়েছে। পানিতে টইটম্বুর হয়ে রয়েছে বিদ্যালয়ের খেলার মাঠও। ফলে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি খেলাধুলা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। পানিবন্দি বিদ্যালয়ে শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ না থাকলেও শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ায় কমেছে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি।


১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত আল্লারদর্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি দৌলতপুরের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বিদ্যালয়ের চত্বরেই রয়েছে ইংলিশ মিডিয়াম টেসল স্কুল, ইউনিয়ন ভূমি অফিস, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এছাড়া আল্লারদর্গায় বেশ কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান থাকায় এলাকাটি শিল্পনগরী ও বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবেও পরিচিত।


স্থানীয়দের অভিযোগ, আল্লারদর্গা বাজার এলাকায় পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষার পানি বিদ্যালয়ের মাঠে জমে বছরের অধিকাংশ সময় মাঠটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বর্ষা মৌসুমে বিদ্যালয়ের চারপাশ পানিবন্দি হয়ে পড়ার পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষগুলোতেও পানি প্রবেশ করে। এতে শিক্ষা কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হয় এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও কমে যায়। এছাড়া অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পানির কারণে পানিবাহিত রোগসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে শিক্ষার্থীরা।


বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জানান, প্রতিবছর বর্ষা এলেই একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। শ্রেণিকক্ষে পানি প্রবেশ করায় পাঠদান ও পাঠগ্রহণে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। অনেক সময় বই-খাতা ও শিক্ষা উপকরণ পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে শিক্ষকরা পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবেশটি অত্যন্ত কষ্টকর ও অনুপযোগী হয়ে ওঠে।


নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাছকিয়া আক্তার বলেন, ‘প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে আমাদের শ্রেণিকক্ষ, কমনরুম ও শিক্ষকদের অফিসে পানি জমে যায়। বই-খাতা ও স্কুল ড্রেস ভিজে যায়। সারাদিন ভেজা অবস্থায় থাকতে হয়। এতে ঠান্ডা, সর্দি ও জ্বরসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে হয়। অনেক দূরের শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসতে চায় না। আমরা এই দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান চাই।’


ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান রিহান বলেন, ‘আমাদের ক্লাসরুমে পানি ঢুকে জলমগ্ন অবস্থায় রয়েছে। প্রতিবছরই এমন হয়। আমার কয়েকজন বন্ধু অসুস্থ হয়ে পড়েছে। অনেকে স্কুলেও আসে না। এতে আমাদের পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে।’


সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশতিয়াক আহমেদ নীরব বলেন, ‘বছরের প্রায় ছয় মাস মাঠে পানি জমে থাকে। অনেক সময় মাঠে হাঁটুপানি হয়ে যায়। পানি নেমে গেলেও কাদা, শামুক ও বিভিন্ন পোকামাকড়ের কারণে খেলাধুলা করা যায় না। খেলতে গিয়ে হাত-পা কেটে যায়। আমাদের খেলাধুলা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।’


স্থানীয় অভিভাবকদের অভিযোগ, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে বিদ্যালয়ের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কোনো উন্নয়ন হয়নি। বর্ষা এলেই উদ্বেগ নিয়ে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে হয়। অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং অনেকে স্কুলে যেতে অনীহা প্রকাশ করে। তারা দ্রুত এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানান।


বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. কামরুল হাসান বলেন, ‘প্রতিবছর আমাদের শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল অর্জন করে। কিন্তু বর্ষা মৌসুম এলেই শ্রেণিকক্ষ ও অফিস কক্ষ পানিতে তলিয়ে যায়। বছরের প্রায় ছয় মাস মাঠ ব্যবহারের অনুপযোগী থাকে। এতে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, মেধার বিকাশ ও নিয়মিত পাঠগ্রহণ ব্যাহত হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী স্কুলে আসতে চায় না এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।’


তিনি আরও বলেন, ‘এই বিদ্যালয় থেকে অনেক শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ পানি নিষ্কাশনের অভাবে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের দাবি, দ্রুত স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ করে এই দুর্ভোগের অবসান ঘটানো হোক।’


এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, ‘আমি বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ দেখেছি। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। যত দ্রুত সম্ভব এখানে কার্যকর পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে পাঠদান ও পাঠগ্রহণের স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।’


তবে স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিভাবকদের দাবি, একটি ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমন দুরবস্থা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য চরম উদ্বেগজনক। তাই জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ করে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হোক।

সম্পর্কিত খবর

;