ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারাবাজার ও বাগান ঘুরে মুগ্ধ মার্কিন রাষ্ট্রদূত

প্রকাশ : 09 Aug 2026
ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারাবাজার ও বাগান ঘুরে মুগ্ধ মার্কিন রাষ্ট্রদূত

রাহাদ সুমন, বিশেষ প্রতিনিধি: ঝালকাঠির ঐতিহ্যবাহী ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারাবাজার ও পেয়ারা বাগান পরিদর্শন করে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন। তিনি বলেছেন, ভীমরুলীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহ্যবাহী ভাসমান পেয়ারার বাজার এবং কৃষকদের কর্মচাঞ্চল্য তাঁকে মুগ্ধ করেছে।


রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং ঐতিহ্যবাহী ভাসমান পেয়ারার বাজার আমাকে মুগ্ধ করেছে। বাজারের কর্মচাঞ্চল্য, কৃষকদের পরিশ্রম এবং উৎপাদিত পেয়ারার গুণগত মানও আমাকে আকৃষ্ট করেছে।’


বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক বাজারে পেয়ারা রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি তাঁর দেশের সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করবেন।


আজ রোববার (৯ আগস্ট) সকালে স্ত্রী মিসেস ডিয়ান ডাওকে সঙ্গে নিয়ে ঝালকাঠির ভীমরুলী এলাকার ভাসমান পেয়ারাবাজার ও পেয়ারা বাগান পরিদর্শন করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। পরে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।


পরিদর্শনকালে রাষ্ট্রদূত স্থানীয় পেয়ারাচাষি, বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি পেয়ারা চাষের পদ্ধতি, উৎপাদন, সংগ্রহ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ সম্পর্কে কৃষকদের কাছ থেকে বিভিন্ন তথ্য জানেন। এ সময় নৌকায় করে পেয়ারা নিয়ে ভাসমান বাজারে আসা চাষিদের কার্যক্রমও ঘুরে দেখেন তিনি।


রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন জানান, যুক্তরাষ্ট্রের উষ্ণ ও ক্রান্তীয় অঞ্চলেও পেয়ারা চাষ হয়। ফ্লোরিডা, হাওয়াই এবং ক্যালিফোর্নিয়ার কিছু এলাকায় সীমিত পরিসরে পেয়ারা উৎপাদন করা হয়। বাংলাদেশে কীভাবে পেয়ারার উৎপাদন আরও বাড়ানো যায়, সে বিষয়টিও দেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।


তিনি বলেন, ‘কীভাবে আরও উৎপাদন বাড়ানো যায়, তা দেখার জন্য ঝালকাঠির পেয়ারা বাগান ঘুরে দেখলাম। আমাদের খুবই ভালো লেগেছে।’


তিন জেলার ৫৫ গ্রামজুড়ে পেয়ারা চাষ


ভীমরুলীর পেয়ারা অঞ্চল শুধু ঝালকাঠির একটি গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ঝালকাঠি সদর, পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি (নেছারাবাদ) ও বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় পেয়ারা চাষ ও বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বৃহৎ কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ অঞ্চলের প্রায় ৫৫টি গ্রামকে পেয়ারা উৎপাদন ও বাজারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।


প্রতিবছর আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র—এই তিন মাস পেয়ারা মৌসুমে পুরো এলাকার চিত্র পাল্টে যায়। বাগান থেকে চাষিরা নৌকায় করে পেয়ারা নিয়ে আসেন ভাসমান হাটে। বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররাও নৌকা, ট্রলার ও স্থলপথে এসে এখান থেকে পেয়ারা কিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যান।


ভীমরুলীর কয়েকটি খালের মোহনায় নৌকায় নৌকায় বসে এই ভাসমান বাজার। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত পেয়ারা বোঝাই নৌকা, চাষি, পাইকার ও শ্রমিকদের ব্যস্ততায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। পাশাপাশি বর্ষার সবুজ প্রকৃতি, খাল-বিল ও নৌকায় সাজানো পেয়ারার বাজার দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরাও ছুটে আসেন।


কৃষির পাশাপাশি পর্যটনেরও বড় সম্ভাবনা


ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারাবাজার দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় কৃষিভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বর্ষা মৌসুমে খালের পানিতে সারি সারি পেয়ারা বোঝাই নৌকা, দুই পাড়ের সবুজ বাগান এবং কৃষকদের ব্যস্ততা পর্যটকদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে।


পেয়ারার মৌসুমে ভীমরুলী ও আশপাশের এলাকায় শুধু কৃষক ও ব্যবসায়ীদের কর্মচাঞ্চল্যই বাড়ে না, পর্যটকদের আনাগোনাও বেড়ে যায়। ফলে নৌযান, খাবার, ছোট ব্যবসা ও স্থানীয় পর্যটনকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ অঞ্চলের ৫৫টি গ্রামজুড়ে পেয়ারা উৎপাদন ও বেচাকেনার সঙ্গে বিপুলসংখ্যক কৃষক ও ব্যবসায়ী যুক্ত থাকার কথা উঠে এসেছে।


এর আগে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারা হাট পরিদর্শন করেছেন। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত আবদেলোহাব সাইদানি ভীমরুলী ও আশপাশের পেয়ারা বাগান ও ভাসমান বাজার ঘুরে দেখেন এবং স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন।


নিরাপত্তায় প্রশাসন


মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সফর উপলক্ষে ভীমরুলী এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরিদর্শনকালে ঝালকাঠির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. কাওছার হোসেনসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


স্থানীয় বাগান মালিকরা বলেন, একজন বিদেশি রাষ্ট্রদূতের ভীমরুলীর পেয়ারা বাগান ও ভাসমান বাজার পরিদর্শন স্থানীয় কৃষকদের জন্য উৎসাহের বিষয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পেয়ারা রপ্তানির সম্ভাবনা নিয়ে রাষ্ট্রদূতের আগ্রহকে তাঁরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।


স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, ভীমরুলীর পেয়ারা শুধু দেশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; উন্নত সংরক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং ও আন্তর্জাতিক বাজারজাতকরণের সুযোগ তৈরি হলে এই অঞ্চলের পেয়ারা বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হবে।


ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারাবাজার তাই এখন শুধু একটি মৌসুমি ফলের হাট নয়—কৃষি, স্থানীয় অর্থনীতি, ঐতিহ্য ও পর্যটনের এক অনন্য সমন্বয়। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাম্প্রতিক সফর এ ঐতিহ্যবাহী বাজারের আন্তর্জাতিক পরিচিতি আরও বাড়াবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।


সম্পর্কিত খবর

;