সামীনা জান্নাত:
বাংলাদেশে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের মধ্যে ধর্ষণ সবচেয়ে নৃশংস ও হৃদয়বিদারক। খবরের কাগজ খুললে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই দেশের কোনো না কোনো প্রান্ত থেকে এই পাশবিকতার খবর আসে। ঘটনা প্রকাশ্যে এলে প্রতিবাদ হয়, ক্ষোভ ছড়ায়, বিচারের দাবি ওঠে। কিছুদিন পর আলোচনার জায়গা নেয় নতুন কোনো ঘটনা। ভুক্তভোগীর পরিবার তখনো বিচারের আশায় আদালতের বারান্দায় ঘোরে, আর অপরাধীরা ঘুরে বেড়ায় মুক্ত আকাশের নিচে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা আমাদের বিচারব্যবস্থার ভঙ্গুর চিত্র ও সমাজের অবক্ষয় নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। গত ১৩ মে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলে চার বছর বয়সী শিশু লামিয়া আক্তারকে ভুট্টাখেতে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। ঘটনায় জড়িত সন্দেহে নবম শ্রেণির এক ছাত্রকে গ্রেপ্তার করা হলেও বিচারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। প্রায় একই সময়ে ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়। এ ক্ষেত্রে পুলিশ মাত্র পাঁচ দিনের তদন্তে ২৪ মে অভিযোগপত্র দেয়। ৭ জুন ঢাকার শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। মাত্র ১৯ দিনে রায় হওয়া প্রমাণ করে, তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচারিক উদ্যোগ কার্যকর হলে দীর্ঘসূত্রতা কমানো সম্ভব।
কিন্তু নিম্ন আদালতের রায়েই গল্প শেষ হয় না। উচ্চ আদালতে মৃত্যুদণ্ডের অনুমোদন ও পরবর্তী আইনি ধাপ বাকি থাকে। সেসব কবে শেষ হবে, শেষ পর্যন্ত রায় কার্যকর হবে কি না, তা অনিশ্চিতই থেকে যায়। ২০২৫ সালের শিশু আছিয়ার ঘটনা এর বড় উদাহরণ।
সে বছর ৫ মার্চ মাগুরার শ্রীপুরে বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আছিয়া পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়। বোনের শ্বশুর হিটু শেখ তাকে ধর্ষণ করে শ্বাসরোধে হত্যার চেষ্টা চালায়। আট দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ১৩ মার্চ আছিয়া মারা যায়। সর্বস্তরের মানুষ তখন রাস্তায় নেমেছিল। তীব্র প্রতিবাদের মুখে মাত্র ১২ কার্যদিবসে বিচার শেষ করে ১৭ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবু মামলার আপিল হাইকোর্টে নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। আলোচনার ঝড় ঝিমিয়ে পড়েছে, বিচারও থমকে আছে।
কেবল সাম্প্রতিক ঘটনাই নয়, অতীতের বহু আলোচিত ঘটনা বছরের পর বছর পার হয়েও পরিণতিতে পৌঁছায়নি। ২০১৬ সালে কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়। দেশের অন্যতম সুরক্ষিত এলাকায় একজন সাধারণ কলেজছাত্রীকে নির্যাতন করে হত্যা করা হলেও এত বছর পরও তদন্ত ও বিচার অনিশ্চিত। সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক তৎপরতার অভাবে এসব মামলা নথির ভিড়ে চাপা পড়ে গেছে, যা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আরও গভীর করছে।
অথচ ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের দ্রুত বিচারের জন্যই বিশেষ বিধান ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল। আইনে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করার বাধ্যবাধকতাও আছে। বাস্তবতা ভিন্ন। একটি ধর্ষণ মামলা নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর, এমনকি এক দশকেরও বেশি লেগে যায়। এর পেছনে রয়েছে প্রত্যক্ষ সাক্ষীদের অনুপস্থিতি, আদালত প্রাঙ্গণে তাঁদের নিরাপত্তাহীনতা, পুলিশি তদন্তের শৈথিল্য, বিচারক-সংকট, বারবার শুনানি পেছানো এবং আধুনিক ফরেনসিক ও ডিএনএ প্রমাণের ঘাটতি। ফরেনসিক প্রতিবেদন পেতেই কখনো মাসের পর মাস লেগে যায়। এই ফাঁকফোকরের সুযোগ নিয়ে অপরাধীর পার পেয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
আরেকটি বড় বাধা ক্ষমতার দাপট ও রাজনৈতিক প্রভাব। অভিযুক্ত ব্যক্তি স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী বা কোনো রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে থাকলে তদন্ত ও বিচার বাধাগ্রস্ত হয়। ১৯৯৮-৯৯ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন এ প্রসঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণ ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। ক্যাম্পাসে যৌন সহিংসতার অভিযোগ এবং অভিযুক্তদের ক্ষমতার দাপটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে শিক্ষার্থীরা তখন আন্দোলনে নেমেছিলেন। সেই আন্দোলন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অভিযুক্তের পরিচয় বা প্রভাব যেন বিচারের পথে বাধা না হয়। রাজনৈতিক পরিচয় বা পদ-পদবি নির্বিশেষে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করাই রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থার প্রধান দায়িত্ব।
তবে শুধু আইনি প্রক্রিয়ার ওপর ভরসা করলে চলবে না, সমাজের মানসিকতাও বদলাতে হবে। ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবারকে প্রায়ই কটূক্তি ও সামাজিক লাঞ্ছনার মুখে পড়তে হয়, যা ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ নামে পরিচিত। এ কারণে অনেক পরিবার আইনি লড়াই থেকে সরে আসে। আবার অপরাধীকে সামাজিকভাবে বয়কট করার বদলে স্থানীয় পর্যায়ে ঘটনা আড়াল করার চেষ্টাও দেখা যায়। এই নীরবতা ও উদাসীনতা অপরাধীকে আরও পার পাওয়ার সুযোগ দেয়। অপরাধীর পরিচয় যা-ই হোক, তাকে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ করা এবং ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো নাগরিক হিসেবে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
ধর্ষণ কেবল একজন নারী বা শিশুর ওপর অপরাধ নয়; এটি রাষ্ট্র ও মানবতাবোধের ওপর আঘাত। যে সমাজে চার বছরের শিশু থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কেউই নিরাপদ নয়, আর অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করতে বছরের পর বছর আন্দোলন করতে হয়, সেখানে আইনের শাসন প্রশ্নের মুখে পড়ে। ট্রাইব্যুনাল বা বিশেষ আইন তখনই সার্থক হবে, যখন ক্ষমতার দাপট ও দীর্ঘসূত্রতা ছাপিয়ে দ্রুত ও দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত হবে। বিচারে দেরি মানে অপরাধীকে নতুন অপরাধের সুযোগ দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করা। তাই ক্ষণিকের ক্ষোভ বা অনলাইন প্রতিবাদে থেমে না থেকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সোচ্চার থাকতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ভুক্তভোগীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষাই একটি সভ্য, মানবিক রাষ্ট্রের প্রধান শর্ত।
-লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
খোন্দকার মাহ্ফুজুল হক: একটি পরিবার যখন দারিদ্র্য, বেকারত্ব, খাদ্যসংকট, অসুস্থতা কিংবা আকস্মিক আয়হানির মুখোমুখি হয়, তখন সংকটটি কেবল একজন ব্যক্তির থাকে না—তার প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর। তাই সামা ...
সেলিনা আক্তার:শিশুরা ভবিষ্যৎ জাতির রূপকার। একটি দেশ গড়ে তুলতে শিশুদের সুন্দর মানসিক বিকাশের জন্য গুরুত্ব প্রদান করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। তাই শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য উপযুক্ত পর ...
একটা সময় ছিল, বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থীর স্বপ্নের সঙ্গে বই, শিক্ষা, জ্ঞান, গবেষণা, খেলাধুলা কিংবা কোনো একটি পেশায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার আকাঙ্ক্ষা জড়িয়ে থাকত। এখন সেই স্বপ্নের জায়গায় ধীরে ধীরে ঢুকে প ...
সাইফুল আলম ছদরুল।।রাজনৈতিক মঞ্চের বাগাড়ম্বর, সুশীল সমাজের চটকদার বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা কিংবা শহরের ঝলমলে রেস্তোরাঁর রঙিন আলোর আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে এক নির্মম সত্য। যে শ্রমিকদের নিরলস পরিশ্রমে নামীদামি ...
সব মন্তব্য
No Comments