২০২৭ সালেই শেষ হতে পারে কিংবদন্তির ক্যারিয়ার

ফুটবলকে বিদায় জানানোর পথে রোনালদো

প্রকাশ : 17 Aug 2026
ফুটবলকে বিদায় জানানোর পথে রোনালদো

স্টাফ রিপোর্টার: দীর্ঘ ২৫ বছরের বর্ণাঢ্য পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড জানিয়েছেন, আগামী বছরই সম্ভবত পেশাদার ফুটবলে তার শেষ বছর হতে যাচ্ছে। ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন ভোগকে দেওয়া সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে রোনালদো নিজের অবসরের পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, ফুটবল থেকে বিদায় নেওয়ার আগে এমন একটি উত্তরাধিকার রেখে যেতে চান, যা দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।


রোনালদোর ভাষায়, সম্ভবত এটিই ফুটবলে তার শেষ বছর হতে যাচ্ছে এবং তিনি চান ক্যারিয়ারের শেষটা হোক স্মরণীয় ও দৃষ্টিনন্দন। তবে এটিকে অবসরের চূড়ান্ত ঘোষণা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং আগামী বছরকে সম্ভাব্য শেষ মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করছেন তিনি। কারণ আল-নাসরের সঙ্গে রোনালদোর বর্তমান চুক্তি ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত রয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে সৌদি প্রো লিগও তার চুক্তি ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছিল।


রোনালদোর অবসরের ইঙ্গিত এমন এক সময়ে এলো, যখন সদ্য শেষ হওয়া ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপও তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ হয়ে গেছে। বিশ্বকাপের আগে তিনি জানিয়েছিলেন, কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত এই আসরই হবে তার শেষ বিশ্বকাপ। শেষ পর্যন্ত স্পেনের কাছে শেষ ষোলোতে ১-০ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় পর্তুগাল। ফিফাও নিশ্চিত করেছে, এই ম্যাচের মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপে রোনালদোর দুই দশকের যাত্রার সমাপ্তি ঘটে।


বিশ্বকাপের বিদায়ী ম্যাচের আগে রোনালদো অবশ্য পরিষ্কার করেছিলেন, বিশ্বকাপ শেষ হওয়া মানেই সঙ্গে সঙ্গে ফুটবল থেকে বিদায় নেওয়া নয়। তিনি বলেছিলেন, ২০২৬ বিশ্বকাপ তার শেষ বিশ্বকাপ হলেও তিনি আশা করছেন স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচটিই যেন তার শেষ ম্যাচ না হয়। সেই ম্যাচে পর্তুগাল হেরে যাওয়ায় বিশ্বকাপে আর ফেরার সুযোগও শেষ হয়ে যায়।


বিশ্বকাপের পর এবার ক্লাব ফুটবল নিয়েও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা প্রকাশ করলেন পর্তুগিজ অধিনায়ক। ভোগকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ফুটবল-পরবর্তী জীবনের কথাও তুলে ধরেন। অবসরের পর তৈরি হতে পারে বড় একটি শূন্যতা—এমনটা উপলব্ধি করে রোনালদো জানিয়েছেন, নিজেকে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে তার। ভ্রমণ, প্যাডেল খেলা এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর মতো বিষয়গুলোকে তিনি ভবিষ্যৎ জীবনের সম্ভাব্য আনন্দ হিসেবে দেখছেন।


রোনালদোর জন্য ফুটবল ছাড়ার পরের জীবন যে সহজ হবে না, সেটি তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারই বলে দেয়। ২০০২ সালে পর্তুগালের স্পোর্টিং সিপির হয়ে সিনিয়র ফুটবলে অভিষেকের পর দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম প্রধান চরিত্র। স্পোর্টিংয়ের পর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দিয়ে আন্তর্জাতিক তারকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এরপর রিয়াল মাদ্রিদে গিয়ে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি রচনা করেন। পরে জুভেন্টাস হয়ে সৌদি আরবের আল-নাসরে যোগ দেন।


ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে রোনালদো দুটি মেয়াদে খেলেছেন। প্রথম মেয়াদে তিনি ২০০৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ক্লাবটির হয়ে খেলেন এবং ২০০৮ সালে ব্যালন ডি’অর জেতেন। ২০২১ সালে আবারও ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ফেরেন। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে তিনি আরও চারবার ব্যালন ডি’অর জেতেন। সব মিলিয়ে পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এই তারকা আধুনিক ফুটবলের ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন।


ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় চলছে সৌদি আরবের আল-নাসরে। ২০২২ সালের শেষ দিকে ক্লাবটিতে যোগ দেওয়ার পরও গোলের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন রোনালদো। সৌদি প্রো লিগের অফিসিয়াল পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ মৌসুমে ৩০ ম্যাচে ২৮ গোল করেছেন তিনি। এর আগের মৌসুমে ৩০ ম্যাচে করেছিলেন ২৫ গোল এবং ২০২৩-২৪ মৌসুমে ৩১ ম্যাচে তার গোল ছিল ৩৫টি।


আল-নাসরের হয়ে সৌদি প্রো লিগে রোনালদো ইতোমধ্যে ১০০ গোলের মাইলফলকও অতিক্রম করেছেন। সৌদি প্রো লিগ কর্তৃপক্ষ ২০২৬ সালের মে মাসে তার আল-নাসর অধ্যায়ের ১০০ লিগ গোল উদ্‌যাপন করে।


তবে ক্লাব ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে রোনালদোর সামনে এখনো একটি ব্যক্তিগত লক্ষ্য সবচেয়ে বড় হয়ে আছে—১ হাজার ক্যারিয়ার গোল। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে তার গোলসংখ্যা ৯৭৬। অর্থাৎ ঐতিহাসিক ১ হাজার গোলের মাইলফলক স্পর্শ করতে তার প্রয়োজন আরও ২৪ গোল।


এই মাইলফলকই হতে পারে ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত লক্ষ্য। ২০২৬ বিশ্বকাপে রোনালদো ৯৭৬ গোলের ঘরে পৌঁছেছেন। এখন আল-নাসরের হয়ে নতুন মৌসুমে তার সামনে ২৪ গোলের পথ পাড়ি দিয়ে ইতিহাসের প্রথম পুরুষ ফুটবলার হিসেবে ১ হাজার অফিসিয়াল ক্যারিয়ার গোলের মাইলফলকে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এই সংখ্যা ও পরিসংখ্যান বিভিন্ন পরিসংখ্যানভিত্তিক উৎসের গণনার ওপর নির্ভর করে, তাই রোনালদোর গোলসংখ্যা নিয়ে উৎসভেদে সামান্য পার্থক্য দেখা যেতে পারে।


রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারও রেকর্ডে ভরা। ফিফার ২০২৬ বিশ্বকাপের অফিসিয়াল স্কোয়াড তালিকায় তার জাতীয় দলের হয়ে ২২৮ ম্যাচে ১৪৩ গোলের তথ্য ছিল বিশ্বকাপ শুরুর আগে। বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো যোগ হওয়ার পর তার আন্তর্জাতিক গোল ও ম্যাচসংখ্যা আরও বেড়েছে।


২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। এর মাধ্যমে তিনি ২০ বছর ধরে ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার বিরল রেকর্ড গড়েন। ফিফার তথ্য অনুযায়ী, স্পেনের কাছে পর্তুগালের বিদায়ের মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপে তার অধ্যায় শেষ হয়।


বিশ্বকাপের পর জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়েও রোনালদোর অবস্থান অনেকটাই স্পষ্ট। তিনি বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছেন, তবে পর্তুগাল জাতীয় দলের হয়ে আর খেলবেন না—এমন চূড়ান্ত ঘোষণা দেননি। ফলে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে পুরোপুরি বিদায় নেওয়ার সময়ও এখনো নির্ধারিত নয়।


অন্যদিকে, ক্লাব ফুটবল থেকে বিদায়ের সম্ভাব্য সময় হিসেবে ২০২৭ সাল সামনে আসায় রোনালদোর ক্যারিয়ারের শেষ লড়াই এখন আল-নাসরকে ঘিরেই। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তিনি যদি ১ হাজার গোলের মাইলফলক স্পর্শ করতে পারেন, তাহলে সেটি হতে পারে তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সবচেয়ে প্রতীকী সমাপ্তি।


স্পোর্টিং থেকে শুরু করে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদ, জুভেন্টাস ও আল-নাসর—প্রতিটি অধ্যায়েই রোনালদো রেখে গেছেন অসংখ্য রেকর্ড ও ট্রফির ছাপ। পাঁচটি ব্যালন ডি’অর, চ্যাম্পিয়নস লিগের একাধিক শিরোপা, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপসহ জাতীয় ও ক্লাব পর্যায়ে অসংখ্য সাফল্যের পর এখন তার সামনে ক্যারিয়ারের শেষ পর্দা নামানোর সময়।


আর সেই বিদায়টা কীভাবে হবে, তার ইঙ্গিত নিজেই দিয়েছেন রোনালদো—ফুটবল ছাড়ার আগে তিনি চান এমন একটি উত্তরাধিকার রেখে যেতে, যা তার খেলোয়াড়ি জীবনের মতোই দীর্ঘদিন মানুষের মনে বেঁচে থাকবে।

সম্পর্কিত খবর

;