অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ

শান্তর ফিফটির পর তানজিদের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি

প্রকাশ : 14 Aug 2026
শান্তর ফিফটির পর তানজিদের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি

স্টাফ রিপোর্টার: অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২৩ বছর পর টেস্ট খেলতে নেমে ইতিহাস গড়ার পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। ডারউইনের মারারা ক্রিকেট গ্রাউন্ডে সিরিজের প্রথম টেস্টে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট করার পর ব্যাট হাতেও দাপট দেখাচ্ছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। হাসান মাহমুদের দুর্দান্ত ছয় উইকেটের পর এবার ব্যাট হাতে ইতিহাস লিখেছেন তানজিদ হাসান। ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি তুলে নেওয়া এই বাঁহাতি ব্যাটার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে শতক করা প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার হওয়ার কীর্তি গড়েছেন।


দ্বিতীয় দিন শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের জন্য ১ উইকেটে ৯৬ রান নিয়ে। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেওয়ার পর তানজিদ হাসান ও মুমিনুল হক মিলে প্রথম সেশনে বাংলাদেশকে বড় লিডের পথে এগিয়ে নেন। তাদের ১০২ রানের জুটি অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণের ওপর চাপ তৈরি করে। মুমিনুল ৯৫ বলে আট চারে ৪৯ রান করে জশ হ্যাজলউডের বলে অ্যালেক্স ক্যারির হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরলেও ততক্ষণে বাংলাদেশের ইনিংস শক্ত ভিত পেয়ে যায়।


মুমিনুলের বিদায়ের পর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তকে নিয়ে ইনিংস এগিয়ে নিতে থাকেন তানজিদ। ধৈর্য, শট নির্বাচন এবং অফ স্টাম্পের বাইরের বল ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ব্যাটিং ছিল প্রশংসনীয়। অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণে প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক ও জশ হ্যাজলউডের মতো বোলার থাকলেও ধীরগতির উইকেটে বাংলাদেশের ব্যাটারদের চাপে ফেলতে পারেনি স্বাগতিকরা।


এরপর আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ৬৪তম ওভারে ১৮৮ বলে আটটি চার ও একটি ছক্কার সাহায্যে ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তানজিদ হাসান। এর আগে টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর সর্বোচ্চ ইনিংস ছিল মাত্র ২৬ রান। ফলে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এই শতক তাঁর ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের তো বটেই, বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসেও বিশেষ এক অধ্যায় হয়ে থাকল।


তানজিদের শতকের ঠিক আগে নিজের ফিফটি পূর্ণ করেন শান্তও। ৭৪ বলে অর্ধশতক স্পর্শ করেন বাংলাদেশের অধিনায়ক। তানজিদের সঙ্গে তাঁর জুটি দ্রুত শতরানের দিকে এগোচ্ছিল। পরে তানজিদ ১০১ রানে থামলেও তাঁর ইনিংস বাংলাদেশকে এমন অবস্থানে নিয়ে যায়, যেখান থেকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ স্বাগতিকদের হাত থেকে অনেকটাই বেরিয়ে যায়। দিনের শেষ দিকে শান্ত অপরাজিত ছিলেন ৫৯ রানে এবং তাঁর সঙ্গে উইকেটে ছিলেন মুশফিকুর রহিম। বাংলাদেশ ২৫০ রানে পৌঁছে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৫০ রানের বেশি লিড নেয়।


তানজিদের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরির আগে বাংলাদেশের হয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে কোনো ব্যাটার শতক করতে পারেননি। ২০০৩ সালে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দুই টেস্ট খেলেছিল বাংলাদেশ। সেই সফরে ডারউইনে প্রথম টেস্টে অস্ট্রেলিয়া ইনিংস ও ১৩২ রানে এবং কেয়ার্নসে দ্বিতীয় টেস্টে ইনিংস ও ৯৮ রানে জয় পেয়েছিল। দুই ম্যাচেই বাংলাদেশের ব্যাটিং ছিল প্রবল চাপে।


২০০৩ সালের সেই ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস শেষ হয়েছিল মাত্র ৯৭ রানে। অস্ট্রেলিয়া ৪০৭ রানে ইনিংস ঘোষণা করার পর দ্বিতীয় ইনিংসেও বাংলাদেশ বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে। ম্যাচটি শেষ হয় অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস ও ১৩২ রানের জয়ে। কেয়ার্নসের দ্বিতীয় টেস্টেও একই চিত্র দেখা যায়; বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ২৯৫ রান করলেও অস্ট্রেলিয়া ৫৫৬ রানে ইনিংস ঘোষণা করে এবং শেষ পর্যন্ত ইনিংস ও ৯৮ রানে জিতে সিরিজ ২-০ ব্যবধানে শেষ করে।


সেই সময়ের বাংলাদেশ আর ২০২৬ সালের বাংলাদেশ—দুই দলের মধ্যে পার্থক্য যেন এই ডারউইনেই সবচেয়ে স্পষ্ট। ২৩ বছর পর একই মাঠে ফিরে এবার অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। স্বাগতিকদের বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার সর্বনিম্ন টেস্ট স্কোরও। প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে একাই লড়াই করেছেন স্টিভ স্মিথ; তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে ৭১ রান। কিন্তু হাসান মাহমুদের দুর্দান্ত বোলিংয়ের সামনে বাকি ব্যাটিং লাইনআপ ভেঙে পড়ে।


বাংলাদেশের পেসার হাসান মাহমুদ এই ম্যাচের প্রথম দিনেই ক্যারিয়ারসেরা বোলিং করেছেন। ৬ উইকেট নিতে তিনি খরচ করেন ৫৫ রান। তাঁর এই ৬/৫৫ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের কোনো পেসারের অন্যতম সেরা বোলিং পারফরম্যান্স এবং প্রথম ইনিংসে স্বাগতিকদের ২০০ রানের নিচে আটকে রাখার মূল কারিগর।


হাসান মাহমুদের ফাইফারের পর তানজিদের সেঞ্চুরি—একই টেস্টে বাংলাদেশের জন্য এমন জোড়া অর্জনই ম্যাচটিকে ঐতিহাসিক করে তুলেছে। প্রথম দিনে বল হাতে অস্ট্রেলিয়াকে চাপে ফেলে বাংলাদেশ, দ্বিতীয় দিনে ব্যাট হাতে সেই চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়। অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী পেস আক্রমণের বিপক্ষে বাংলাদেশের ওপেনার ও টপ অর্ডার যে ধৈর্য দেখিয়েছে, সেটিও এই সাফল্যের অন্যতম কারণ। ধীরগতির পিচে বাংলাদেশের ব্যাটাররা অযথা ঝুঁকি না নিয়ে লম্বা সময় ক্রিজে থাকার কৌশল নিয়েছেন।


এই ম্যাচের আগে অস্ট্রেলিয়া সফর নিয়ে বাংলাদেশের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত বলেছিলেন, শুধু জয় নয়, ভালো ক্রিকেট খেলে অস্ট্রেলিয়ার সম্মান অর্জন করাই তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ভালো পারফরম্যান্স করতে পারলে ভবিষ্যতে আরও বেশি টেস্ট খেলার সুযোগ তৈরি হবে—এমন প্রত্যাশাও জানিয়েছিলেন তিনি। ডারউইনে প্রথম টেস্টের দুই দিন শেষে তাঁর দল সেই লক্ষ্য পূরণের পথেই এগোচ্ছে।


বাংলাদেশের জন্য ম্যাচটির আরেকটি তাৎপর্য হলো, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এত দীর্ঘ বিরতির পর ফিরে এসেই তারা স্বাগতিকদের ওপর এমন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। ২০০৩ সালের সফরে যেখানে অস্ট্রেলিয়ার পেস ও স্পিন আক্রমণের সামনে বাংলাদেশের ব্যাটিং বারবার ভেঙে পড়েছিল, ২০২৬ সালে সেই অস্ট্রেলিয়ারই বোলিং ইউনিটকে দীর্ঘ সময় ধরে সামলেছেন তানজিদ, মুমিনুল ও শান্ত। তানজিদের ১০২ বলের ফিফটি এবং পরবর্তী সেঞ্চুরি সেই পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছে।


তানজিদের এই শতক তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারেও নতুন বাঁক তৈরি করতে পারে। ২৫ বছর বয়সী বাঁহাতি ব্যাটার এর আগে ওয়ানডেতে একটি শতকসহ এক হাজারের বেশি রান করেছেন, কিন্তু টেস্টে প্রথম সেঞ্চুরির জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নিজের দ্বিতীয় টেস্ট ইনিংসেই সেই অপেক্ষা শেষ করলেন তিনি।


সব মিলিয়ে ডারউইন টেস্টে এখন বাংলাদেশের হাতে রয়েছে ম্যাচের ছড়ি। অস্ট্রেলিয়ার ১৯৮ রানের জবাবে বাংলাদেশ এরই মধ্যে ২৫০ পেরিয়েছে। তানজিদ ১০১ রানে ফিরে গেলেও শান্ত অপরাজিত ৫৯ রানে, সঙ্গে মুশফিকুর রহিম। বাংলাদেশের সামনে এখন প্রথম ইনিংসে বড় লিড নেওয়ার সুযোগ। ২০০৩ সালের সেই দুঃস্বপ্নের ডারউইন এবার ২৩ বছর পর বাংলাদেশের জন্য ইতিহাসের মঞ্চ হয়ে দাঁড়িয়েছে—হাসান মাহমুদের ছয় উইকেটের পর তানজিদ হাসানের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি সেই ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল দুই অধ্যায়।

সম্পর্কিত খবর

;