মেসিকে বোমায় উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি, ফাঁস পুলিশ ডসিয়ারে বিশ্বকাপের ভয়ংকর তথ্য

প্রকাশ : 08 Aug 2026
মেসিকে বোমায় উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি, ফাঁস পুলিশ ডসিয়ারে বিশ্বকাপের ভয়ংকর তথ্য

ডেস্ক রিপোর্ট: মাঠে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে গোল করা যার কাছে ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার, সেই লিওনেল মেসিকেই মাঠের বাইরে ঘিরে ছিল ভয়ংকর নিরাপত্তা শঙ্কা। ২০২৬ বিশ্বকাপ চলাকালে আর্জেন্টাইন মহাতারকাকে লক্ষ্য করে একাধিক বোমা হামলা ও সশস্ত্র হামলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে ফাঁস হওয়া একটি পুলিশ ডসিয়ারে।


স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম Informacion.es-এর হাতে আসা ওই নথির তথ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে মেসিকে লক্ষ্য করে সরাসরি হত্যার হুমকি, স্টেডিয়ামে বোমা নিয়ে ঢোকার ঘোষণা এবং অস্ত্রসহ হামলার পরিকল্পনার কথাও উঠে এসেছে। একই ডসিয়ারে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং একাধিক রেফারিকে ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকির তথ্যও রয়েছে।


তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রকাশিত তথ্যগুলো হুমকি ও পুলিশের তদন্তসংক্রান্ত নথি হিসেবে সামনে এসেছে। কোনো হামলাকারী বাস্তবে মেসির কাছে পৌঁছে গিয়েছিল বা স্টেডিয়ামে বিস্ফোরক নিয়ে ঢুকেছিল—এমন প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।


‘চারটি বোমা’ নিয়ে মেসিকে হত্যার হুমকি


মেসিকে ঘিরে সবচেয়ে ভয়ংকর হুমকিগুলোর একটি আসে আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচকে কেন্দ্র করে।


প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক ব্যক্তি দাবি করেন, তিনি আটলান্টার স্টেডিয়ামে ঢুকে শরীরে বাঁধা চারটি বোমা দিয়ে মেসিকে উড়িয়ে দেবেন।


হুমকির পর নিরাপত্তা বাহিনী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। স্টেডিয়াম এলাকায় তল্লাশি ও নজরদারি বাড়ানো হয়। তবে শেষ পর্যন্ত ওই হুমকি বাস্তব হামলায় পরিণত হয়নি এবং কোনো বিস্ফোরক উদ্ধার হয়নি বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


ডালাস থেকে ফোন, ‘বোমা ও এআর-১৫ নিয়ে স্টেডিয়ামে যাচ্ছি’


এর আগে আর্জেন্টিনার আরেক ম্যাচকে ঘিরেও আসে আরও গুরুতর হুমকি।


ডসিয়ারের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ডালাস বিমানবন্দরে এক ব্যক্তি ফোন করে দাবি করেন, তিনি আরও দুজনকে নিয়ে স্টেডিয়ামে হামলা চালাতে যাচ্ছেন। তাদের কাছে ঘরে তৈরি বোমা ও এআর-১৫ রাইফেল রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।


তার কথিত লক্ষ্য ছিল পুলিশ সদস্য ও দুই দলের খেলোয়াড়রা। তবে মেসিকে বিশেষভাবে হত্যার লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।


এ ঘটনায় হুমকিদাতা সত্যিই অস্ত্র বা বিস্ফোরক নিয়ে স্টেডিয়ামের দিকে এগিয়েছিলেন কি না, কিংবা তিনি হামলার কতটা কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন—সে বিষয়ে প্রকাশ্যে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।


স্টেডিয়ামের ডাস্টবিনে তিন বোমার দাবি


মেসিকে ঘিরে নিরাপত্তা আতঙ্ক এখানেই শেষ হয়নি।


আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচ চলাকালে এক ব্যক্তি পুলিশকে ফোন করে দাবি করেন, স্টেডিয়ামের বিভিন্ন ডাস্টবিনে তিনটি বোমা রেখে এসেছেন তিনি।


এরপর নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত তল্লাশি শুরু করে। বোমা শনাক্তকারী বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষিত কুকুর এবং বিশেষ নিরাপত্তা দল দিয়ে স্টেডিয়ামের বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা করা হয়।


তবে শেষ পর্যন্ত কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। ফলে ঘটনাটি মিথ্যা হুমকি ছিল কি না, তা নিয়ে তদন্তের প্রয়োজন দেখা দেয়।


শুধু মেসি নন, রোনালদোকেও ঘিরে নিরাপত্তা আতঙ্ক


ফাঁস হওয়া বলে দাবি করা ডসিয়ারে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নামও রয়েছে।


প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক ব্যক্তি রোনালদোর বিশ্বকাপের আবাসন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন। বিষয়টি নজরে আসার পর নিরাপত্তা বাহিনী সতর্ক হয়।


আরেক ঘটনায় এক ব্যক্তি রোনালদোর হোটেলে ঢুকে তার লিফটে ওঠার চেষ্টা করেন। পুলিশ তাকে আটক করলে তিনি দাবি করেন, শুধু রোনালদোর সঙ্গে সেলফি তুলতেই চেয়েছিলেন।


তারকা ফুটবলারদের ক্ষেত্রে এ ধরনের স্টকিং বা অনুপ্রবেশের চেষ্টা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, ঘটনাটি তারই উদাহরণ।


রেফারি লেতেক্সিয়েরের ফোনে ৬ হাজারের বেশি হুমকি


শুধু খেলোয়াড়রাই নন, রেফারিরাও ছিলেন ব্যাপক হুমকির মুখে।


আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচ পরিচালনা করা ফরাসি রেফারি ফ্রঁসোয়া লেতেক্সিয়েরের ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপে ছয় হাজারের বেশি হুমকিমূলক বার্তা পাঠানো হয়েছিল বলে ডসিয়ারে দাবি করা হয়েছে।


এমনকি তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভিএআর কর্মকর্তা উইলি দেলাজোও হুমকির শিকার হন বলে একই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।


ফিফার রেফারিং বিভাগের প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনাও ম্যাচের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রেফারি ও তাঁদের পরিবারের বিরুদ্ধে হুমকি ছড়ানোর ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছিলেন।


এমবাপ্পেকেও লক্ষ্য করে হুমকি


ফ্রান্সের তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পেকেও ঘিরে ছিল নিরাপত্তা উদ্বেগ।


প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্যারাগুয়ের কাছে ফ্রান্সের হারের পর দেশটির সমর্থকদের একাংশ এমবাপ্পের নাম লেখা একটি কুশপুত্তলিকা পোড়ায়। অনলাইনেও ফরাসি তারকাকে লক্ষ্য করে বর্ণবাদী আক্রমণ ও হুমকির ঘটনা সামনে আসে।


এতে বোঝা যায়, বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ঝুঁকি শুধু সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কায় সীমাবদ্ধ ছিল না; উগ্র সমর্থক, স্টকিং এবং অনলাইন হুমকিও বড় সমস্যা হয়ে উঠেছিল।


মেসিকে কি সত্যিই হামলাকারীরা টার্গেট করেছিল?


ফাঁস হওয়া ডসিয়ারের তথ্য অনুযায়ী, মেসিকে লক্ষ্য করে একাধিক গুরুতর হুমকি তদন্ত করেছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। তবে হুমকি দেওয়া আর বাস্তবে হামলা চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া—দুটি বিষয় এক নয়।


প্রকাশিত কোনো প্রতিবেদনে এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, কোনো ব্যক্তি বিস্ফোরকসহ স্টেডিয়ামে প্রবেশ করে মেসির নিরাপত্তা বলয়ের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল।


বরং যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই জানিয়েছে, বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো ঘিরে তারা ফেডারেল, অঙ্গরাজ্য, স্থানীয়, আন্তর্জাতিক ও বেসরকারি নিরাপত্তা অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করেছে। এফবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, লেভিস স্টেডিয়ামে তাদের বিশ্বকাপ নিরাপত্তা কার্যক্রম বড় ধরনের কোনো ম্যাচ-সম্পর্কিত নিরাপত্তা ঘটনা ছাড়াই শেষ হয়।


অর্থাৎ, মেসিকে ঘিরে হুমকিগুলো ছিল গুরুতর; কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো হামলা ঘটেনি।


মাঠেও থামেনি মেসি


এত নিরাপত্তা শঙ্কার মধ্যেও বিশ্বকাপে মেসির পারফরম্যান্সে বড় কোনো ছেদ পড়েনি।


আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচে শুরুতে পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে জয় পায় আর্জেন্টিনা। ম্যাচটিতে মেসিও গোল করেন।


পুরো টুর্নামেন্টে মেসি ৩৯ বছর বয়সেও অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়ে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে নিয়ে যান।


তবে শেষ পর্যন্ত শিরোপা ধরে রাখতে পারেনি আর্জেন্টিনা।


বিশ্বকাপের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন


৪৮ দলের এই বিশ্বকাপ ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফুটবল আয়োজনগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ১৬টি শহরে অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টে কোটি কোটি মানুষের উপস্থিতি এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল তারকাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ।


টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বিশ্বকাপকে সম্ভাব্য সন্ত্রাসী ও সহিংস কর্মকাণ্ডের আকর্ষণীয় লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজও (CSIS) বিশ্বকাপকে ঘিরে সন্ত্রাসী হুমকি নিয়ে আলাদা বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছিল।


এর মধ্যে মেসির মতো বিশ্বখ্যাত একজন ফুটবলারকে লক্ষ্য করে একাধিক বোমা হামলার হুমকির তথ্য সামনে আসায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।


তবে স্বস্তির বিষয়—ভয়ংকর সব হুমকি সত্ত্বেও কোনো হামলা শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নেয়নি।


মাঠে মেসিকে থামানোর লড়াই ছিল প্রতিপক্ষের; আর মাঠের বাইরে তাঁকে নিরাপদ রাখার লড়াই ছিল নিরাপত্তা বাহিনীর। ফাঁস হওয়া এই ডসিয়ার সেই অদৃশ্য লড়াইটিকেই সামনে এনে দিয়েছে।

সম্পর্কিত খবর

;