স্টাফ রিপোর্টার: অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারত সফরে যাওয়ার বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন—এমন তথ্য জানিয়েছেন সরকারের সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে দেশের বাইরে যাওয়ার কোনো একটি সফরের সঙ্গে দিল্লি ঘুরে আসার কথা ইউনূস তাঁকে বলেছিলেন।
তবে তৌহিদ হোসেনের পরামর্শ ছিল, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ ছাড়া প্রধান উপদেষ্টার দিল্লি সফরে যাওয়া ঠিক হবে না। তাঁর যুক্তি ছিল, সে সময় ভারত সরকারের পাশাপাশি দেশটির একটি অংশের মধ্যেও বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব এবং আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন প্রবল ছিল। ফলে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ ছাড়া দিল্লি যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
সম্প্রতি প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এসব কথা বলেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
দিল্লি সফরের আগ্রহ কেন?
তৌহিদ হোসেনের বর্ণনা অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছিল। সেই প্রেক্ষাপটেই প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস ভারতের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন।
তৌহিদ হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউনূস তাঁকে বিদেশে যাওয়ার পথে দিল্লি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। কিন্তু তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান পর্যায়ের সফরের ক্ষেত্রে স্বাগতিক দেশের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ থাকা কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তাই তিনি ইউনূসকে এমন সফর থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন। শেষ পর্যন্ত প্রধান উপদেষ্টা তাঁর যুক্তি মেনে নেন বলে জানিয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।
মোদির সঙ্গে প্রথম ফোনালাপেও ঢাকার উদ্যোগ
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে দ্রুত উষ্ণতা ফেরেনি—তৌহিদ হোসেনের সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে এমন মূল্যায়নও।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অধ্যাপক ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর শুভেচ্ছা জানান। পরে ১৬ আগস্ট দুজনের মধ্যে ফোনে কথা হয়। ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ওই ফোনালাপে মোদি বাংলাদেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক অগ্রগতির প্রতি ভারতের সমর্থনের কথা জানান।
তৌহিদ হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, ইউনূসের সঙ্গে মোদির প্রথম ফোনালাপের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকেই উদ্যোগ নিতে হয়েছিল।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—ভারতের সরকারি বিবরণে ফোনালাপের উদ্যোগ কার ছিল, সে বিষয়ে তৌহিদ হোসেনের বক্তব্যের বিস্তারিত নেই। ফলে তাঁর বক্তব্যটিকে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়ন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
কেন তখন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন?
৫ আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন বাস্তবতার মুখে পড়ে। শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার পর তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবিও দুই দেশের সম্পর্কে নতুন চাপ তৈরি করে।
২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস প্রকাশ্যে জানান, বাংলাদেশ শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার বিষয়ে ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করবে। ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ভারতকে কূটনৈতিক নোট ভারবাল পাঠিয়ে শেখ হাসিনাকে বিচারিক প্রক্রিয়ার জন্য ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করে। তৎকালীন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনই বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান।
অন্যদিকে, ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান এবং তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যও ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে অস্বস্তি বাড়ায়।
দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকের চেষ্টা
সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেও দুই দেশ যোগাযোগ বন্ধ করেনি।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে তৌহিদ হোসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে ডিসেম্বর মাসে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশরি ঢাকা সফর করেন। তিনি প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেন।
সেই সময় দুই দেশই সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিল। তবে একই সঙ্গে সীমান্ত, শেখ হাসিনা, সংখ্যালঘু পরিস্থিতি, ভিসা এবং বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে মতপার্থক্যও ছিল।
‘শুরুতে সম্পর্ক ভালো করার চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছিল’
তৌহিদ হোসেনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার চেষ্টা করা হলেও তা খুব একটা সফল হচ্ছিল না।
পরবর্তীতে দ্য হিন্দু-কে দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারেও তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দুই দেশের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। তাঁর ব্যাখ্যা ছিল, ভারত ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে একটি নির্দিষ্ট ধরনের রাজনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে অভ্যস্ত ছিল; ৫ আগস্টের পর সেই বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাওয়ায় নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সময় লেগেছে।
তবে তিনি একই সাক্ষাৎকারে বলেন, ছয় মাসের মধ্যে দুই দেশের যোগাযোগ আগের তুলনায় ভালো হয়েছিল এবং সম্পর্ক এমন পর্যায়ে নেওয়া দরকার যেখানে উভয় দেশ একে অপরের সঙ্গে কাজ করতে পারে।
ইউনূস-মোদি বৈঠক নিয়ে আগ্রহ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ইউনূস ও মোদির সরাসরি বৈঠক নিয়েও নানা আলোচনা ছিল।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দুজনের দেখা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। তৌহিদ হোসেন তখন জানিয়েছিলেন, দুই নেতার নিউইয়র্কে অবস্থানের সময়সূচি একসঙ্গে না মেলায় বৈঠকের সম্ভাবনা কম।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৌহিদ হোসেন দ্য হিন্দু-কে বলেন, তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাস ছিল—দুই পক্ষেরই ইউনূস ও মোদির সাক্ষাৎ এবং খোলামেলা আলোচনা করার আগ্রহ রয়েছে।
অর্থাৎ, তৌহিদ হোসেনের সাম্প্রতিক বক্তব্যে যে দিল্লি সফরের আগ্রহের কথা উঠে এসেছে, তা সেই সময়ের বৃহত্তর কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর প্রচেষ্টার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
‘কিচেন ক্যাবিনেট’ নিয়েও মুখ খুলেছেন তৌহিদ
শুধু ভারত ইস্যু নয়, প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও কথা বলেছেন তৌহিদ হোসেন।
তিনি সরকারের ভেতরে একটি অনানুষ্ঠানিক ‘কিচেন ক্যাবিনেট’-এর অস্তিত্ব সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। এ বক্তব্য ইতোমধ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অন্য একটি সাক্ষাৎকারেও তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে সাত সদস্যের একটি গোষ্ঠীর প্রভাবের কথা বলেছিলেন বলে বিডিনিউজ২৪-এর এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া দায়িত্ব পালনের সময় একাধিকবার পদত্যাগের কথা ভেবেছিলেন বলেও তৌহিদ হোসেন জানিয়েছেন।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে তৌহিদের অবস্থান
তৌহিদ হোসেনের বক্তব্যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একই সঙ্গে বাস্তববাদী ও সতর্ক অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তিনি বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কোনো নির্দিষ্ট সরকারের সঙ্গে সীমাবদ্ধ না রেখে দুই দেশের জনগণের স্বার্থ, পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। দ্য হিন্দু-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, দুই দেশে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, সম্পর্কের ওপর তার অতিরিক্ত প্রভাব থাকা উচিত নয়।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জয়শঙ্করের একটি মন্তব্যের জবাবেও তৌহিদ হোসেন বলেছিলেন, বাংলাদেশকে যেমন ঠিক করতে হবে তারা ভারতের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক চায়, ভারতকেও ঠিক করতে হবে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক চায়।
নতুন করে কেন আলোচনায় দিল্লি প্রসঙ্গ?
তৌহিদ হোসেনের সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে ২০২৪ সালের শেষ দিকে ইউনূসের দিল্লি যাওয়ার আগ্রহের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় সেই সময়ের ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অন্দরমহলের হিসাব-নিকাশ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
একদিকে, অন্তর্বর্তী সরকার তখন ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছিল। অন্যদিকে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তাঁকে ফেরত চাওয়া, সীমান্ত ও সংখ্যালঘু ইস্যুসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ চলছিল।
এই পরিস্থিতিতে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ ছাড়া দিল্লি সফর না করার যে পরামর্শ তৌহিদ হোসেন দিয়েছিলেন, সেটি ছিল মূলত কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া একটি অবস্থান—তাঁর বক্তব্য অন্তত সেটিই ইঙ্গিত করে।
তবে ইউনূস কেন নিজে দিল্লি যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন, সম্ভাব্য সফরের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য কী ছিল কিংবা ভারতের পক্ষ থেকে তখন কোনো অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে তৌহিদ হোসেনের বক্তব্যের বাইরে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
ফলে সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টার এই মন্তব্যকে আপাতত তৎকালীন সরকারের ভেতরের কূটনৈতিক আলোচনা সম্পর্কে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তবে ২০২৪ সালের শেষ দিকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক কোন পর্যায়ে ছিল এবং দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে কী ধরনের কূটনৈতিক হিসাব কাজ করছিল, তা বোঝার ক্ষেত্রে বক্তব্যটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
স্টাফ রিপোর্টার: সম্ভাব্য বোমা হামলা ও নাশকতার আশঙ্কায় দেশের সব জেলা, পুলিশ রেঞ্জ ও মেট্রোপলিটন ইউনিটে সর্বোচ্চ সতর্কতা (হাই অ্যালার্ট) জারি করেছে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শুক্রবার ...
স্টাফ রিপোর্টার: প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে ইতালির রাজধানী রোমের লিওনার্দো দা ভিঞ্চি–ফিউমিচিনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (এফসিও) প্রায় সাত ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আটকে ছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের টরন্টো- ...
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্য ও সংবাদ সম্মেলন নিয়ে সৃষ্ট কূটনৈতিক বিতর্কের মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (এমইএ) স্পষ্ট করেছে, শেখ ...
স্টাফ রিপোর্টার: তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, গণমাধ্যম স্বীকার করছে তাদের ওপর কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ নেই। বরং একটি স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও অর্থনৈতিকভাবে টেকসই গণমাধ্যম ব্যবস্থা গড়ে ত ...
সব মন্তব্য
No Comments