ঢাবির ফজলুল হক হলে প্রাধ্যক্ষকে উদ্ধার ঘিরে সংঘর্ষ, ভিপি-জিএসসহ আহত ৬

প্রকাশ : 17 Aug 2026
ঢাবির ফজলুল হক হলে প্রাধ্যক্ষকে উদ্ধার ঘিরে সংঘর্ষ, ভিপি-জিএসসহ আহত ৬

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রাধ্যক্ষের কক্ষে এক শিক্ষার্থীকে হেনস্তা ও নির্যাতনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে হলটির পরিস্থিতি। প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীরা তার কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখার পর তাকে উদ্ধার করতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সেখানে গেলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে সংঘর্ষে হল সংসদের ভিপি খন্দকার মো. আবু নাঈম ও জিএস মো. ইমামুল হাসানসহ অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন। ঘটনাটি ঘটে রোববার (১৬ আগস্ট) দিবাগত রাত পৌনে ৩টার দিকে।


আহতদের মধ্যে হল সংসদের জিএস ইমামুল হাসানের অবস্থা গুরুতর বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। সংঘর্ষের পর আহতদের অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাৎক্ষণিকভাবে অন্য আহতদের সবার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষের সময় ইমামুল হাসান রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে যান এবং ভিপি আবু নাঈমের পোশাক ছিঁড়ে যায়।


ঘটনার সূত্রপাত হয় হলের এক শিক্ষার্থীকে প্রাধ্যক্ষের কক্ষে ডেকে নেওয়াকে কেন্দ্র করে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ওই শিক্ষার্থীকে প্রায় দেড় ঘণ্টা প্রাধ্যক্ষের কক্ষে আটকে রেখে মানসিকভাবে চাপ দেওয়া, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং জোর করে লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরে তারা প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে সন্ধ্যা থেকেই তার কার্যালয় ঘেরাও ও অবরুদ্ধ করে রাখেন।


তবে শিক্ষার্থীর ওপর নির্যাতন বা হেনস্তার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াস আল-মামুন। তার ভাষ্য, ওই শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য তাকে অফিসে ডাকা হয়। পরে শিক্ষার্থী তার ভুল স্বীকার করেন। এরপর তার মায়ের সঙ্গে কথা বলিয়ে এবং তাকে আপ্যায়ন করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন প্রাধ্যক্ষ।


পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাধ্যক্ষকে উদ্ধারে রাতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আল মোজাদ্দেদী আলফেসানী, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম, ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. ইসরাফিল প্রাং এবং কয়েকজন সহকারী প্রক্টর। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই প্রো-ভিসি, ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ও অন্য কর্মকর্তাদেরও প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ের ভেতরে অবরুদ্ধ করে রাখেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। পরে দুই প্রো-ভিসি সেখান থেকে বের হয়ে যান।


এরপর প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ের গেটের সামনে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ইসরাফিল প্রাংয়ের সঙ্গে হল সংসদের ভিপি আবু নাঈম, জিএস ইমামুল হাসানসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী অবস্থান করছিলেন। ঠিক এ সময় ছাত্রদলের একটি মিছিল শিবিরবিরোধী স্লোগান দিতে দিতে প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ের দিকে এগিয়ে আসে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।


প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মিছিলটি দেখে হল সংসদের ভিপি আবু নাঈম মন্তব্য করেন, ‘শহীদুল্লাহ হলের সন্ত্রাসীরা এখানে কী করছে?’ এরপর সেখানে থাকা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে তা ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতিতে রূপ নেয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তখন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা আবু নাঈম, ইমামুল হাসানসহ সেখানে অবস্থানরত কয়েকজনের ওপর হামলা চালান। এতে অন্তত ছয়জন আহত হন।


সংঘর্ষের সময় ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ইসরাফিল প্রাংও ধাক্কাধাক্কির মধ্যে পড়ে হলের একটি পিলারের সঙ্গে ধাক্কা খান বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। পরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাই তাকে সেখান থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেন। অন্যদিকে জিএস ইমামুল হাসানকে রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। ভিপি আবু নাঈমের পোশাকও ছিঁড়ে যায়। পরে আহতদের অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।


সংঘর্ষের পর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হল প্রাধ্যক্ষকে তার কার্যালয় থেকে বের করে নিয়ে যান। এরপর ধীরে ধীরে হলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। প্রাধ্যক্ষকে উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়।


ফজলুল হক মুসলিম হল সংসদের বর্তমান নেতৃত্বে ভিপি হিসেবে খন্দকার মো. আবু নাঈম এবং জিএস হিসেবে মো. ইমামুল হাসান দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত তথ্যেও চলতি বছরের জানুয়ারিতে হলের একটি অনুষ্ঠানে ভিপি আবু নাঈম ও জিএস ইমামুল হাসানের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।


২০২৫ সালের হল সংসদ নির্বাচনে ফজলুল হক মুসলিম হলে ভিপি পদে ৬৪১ ভোট পেয়ে খন্দকার মো. আবু নাঈম এবং জিএস পদে ৫৬৮ ভোট পেয়ে ইমামুল হাসান নির্বাচিত হন। এজিএস পদে নির্বাচিত হন মোহাম্মদ মহসিন উদ্দিন শাফি।


ফজলুল হক মুসলিম হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম পুরোনো আবাসিক হল। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪০ সালের ১ জুলাই ৩৬৩ জন শিক্ষার্থী নিয়ে হলটির কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে হলটির প্রধান ভবন ও বর্ধিত ভবন রয়েছে।


সাম্প্রতিক ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন হলের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী হল সংসদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য নিয়ে এর আগেও আলোচনা হয়েছে। কয়েক মাস আগে হলের একটি অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দলের নেতাকে বিশেষ অতিথি করা নিয়ে হল প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন হল সংসদের ভিপি আবু নাঈম। সে সময় তিনি অভিযোগ করেছিলেন, অনুষ্ঠান আয়োজনের বিষয়ে হল সংসদের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা করা হয়নি।


এদিকে, বর্তমান ঘটনায় শিক্ষার্থীদের অভিযোগের সঙ্গে প্রাধ্যক্ষের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট অমিল রয়েছে। শিক্ষার্থীরা যেখানে আটকে রেখে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও জোর করে বক্তব্য নেওয়ার অভিযোগ করছেন, সেখানে প্রাধ্যক্ষ বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে করা মন্তব্যের বিষয়ে কথা বলতেই শিক্ষার্থীকে ডাকা হয়েছিল এবং পরে তার ভুল স্বীকারের পর মায়ের সঙ্গে কথা বলিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ফলে প্রকৃতপক্ষে ওই কক্ষে কী ঘটেছিল, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


অন্যদিকে, প্রাধ্যক্ষকে উদ্ধারের নামে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ এবং হল সংসদের নেতাদের আহত হওয়ার ঘটনাও নতুন করে ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ সত্য হলে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়টি যেমন তদন্তের আওতায় আসবে, তেমনি হামলার অভিযোগও তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠতে পারে।


এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা পাওয়া যায়নি। আহতদের চিকিৎসা এবং ঘটনার পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীর অভিযোগ, প্রাধ্যক্ষের বক্তব্য এবং সংঘর্ষে জড়িতদের ভূমিকা—তিনটি বিষয়ই নিরপেক্ষভাবে তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে।

সম্পর্কিত খবর

;