ঢাবি ফজলুল হক মুসলিম হল প্রভোস্টের পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ

প্রকাশ : 17 Aug 2026
ঢাবি ফজলুল হক মুসলিম হল প্রভোস্টের পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফজলুল হক মুসলিম হলের এক শিক্ষার্থীকে প্রভোস্টের কক্ষে আটকে রেখে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও জোর করে বক্তব্য লিখিয়ে নেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াস আল-মামুনের পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন আবাসিক শিক্ষার্থীরা। রবিবার (১৬ আগস্ট) রাত ৮টার দিকে হল প্রাঙ্গণে এ বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভে হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদের নেতারাও অংশ নেন।


বিক্ষোভে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক মো. ইকবাল হায়দার এবং ফজলুল হক মুসলিম হল সংসদের ভিপি আবু নাঈম, জিএস ইমামুল হাসানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষার্থীরা প্রভোস্টের পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং শিক্ষার্থীর সঙ্গে হেনস্তামূলক আচরণের অভিযোগের তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।


অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা শিক্ষার্থী ইব্রাহিম হলের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের এবং রোবটিক্স অ্যান্ড মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী বলে জানা গেছে। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে তাকে হলের প্রভোস্টের কক্ষে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে প্রায় দেড় ঘণ্টা আটকে রেখে ভয়ভীতি দেখানো হয় এবং তার কাছ থেকে জোরপূর্বক একটি স্টেটমেন্ট নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।


ইব্রাহিমের অভিযোগ, প্রভোস্টের কক্ষে অবস্থানের সময় তিনি মানসিক চাপে ছিলেন। সেখানে তার সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, সেটিকে তিনি হেনস্তামূলক ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের শামিল বলে মনে করছেন। পরে বিষয়টি অন্য আবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে জানাজানি হলে তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। একপর্যায়ে তারা প্রভোস্টের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভে নামেন।


বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বলেন, একজন আবাসিক শিক্ষার্থী কোনো অভিযোগ বা প্রশাসনিক বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হলে তার সঙ্গে শালীন ও নিয়মতান্ত্রিক আচরণ করা উচিত। কিন্তু কোনো শিক্ষার্থীকে দীর্ঘ সময় একটি কক্ষে আটকে রাখা, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য বা স্টেটমেন্ট দিতে বাধ্য করা হলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।


তারা বলেন, ঘটনাটি শুধু একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে আচরণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও প্রশাসনের জবাবদিহিতার প্রশ্ন জড়িত। ফলে অভিযোগটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।


বিক্ষোভকারীরা আরও বলেন, আবাসিক হল শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও স্বস্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার জায়গা। হল প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা বা শিক্ষক শিক্ষার্থীর সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারেন না, যাতে ওই শিক্ষার্থী আতঙ্কিত বা অপমানিত বোধ করেন। এ ধরনের ঘটনায় প্রশাসন নীরব থাকলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তৈরি হবে।


ডাকসুর নেতারাও শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। তাদের উপস্থিতিতে বিক্ষোভ আরও জোরালো হয়। শিক্ষার্থীরা প্রভোস্টের পদত্যাগের পাশাপাশি অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করা এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার দাবি জানান।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ফজলুল হক মুসলিম হল ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত। হলটির কার্যক্রম শুরু হয় ওই বছরের ১ জুলাই। বর্তমানে হলটির প্রধান ভবন ও বর্ধিত ভবন (দক্ষিণ ভবন) রয়েছে।


অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াস আল-মামুন বর্তমানে ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রকাশিত তথ্যেও তাকে হলের প্রাধ্যক্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ফজলুল হক মুসলিম হলে অনুষ্ঠিত জাতীয় বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি সভাপতিত্ব করেন। ওই অনুষ্ঠানে ডাকসুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক মো. ইকবাল হায়দারও উপস্থিত ছিলেন।


এদিকে, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে হেনস্তা, বুলিং ও র‌্যাগিং প্রতিরোধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আগেই বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কমিটিতে ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক মো. ইলিয়াস আল-মামুনকেও সদস্য করা হয়েছিল। প্রশাসনের উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং অভিযোগকারীকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বারবার জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি না করা।


এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ফজলুল হক মুসলিম হলে তোফাজ্জল হোসেন নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ওই ঘটনার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আট শিক্ষার্থীর আবাসিক সিট বাতিল ও তাদের সাময়িক বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়। একই সময়ে তৎকালীন হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. শাহ্ মো. মাসুমকে পরিবর্তন করে অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াস আল-মামুনকে নতুন প্রভোস্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।


সাম্প্রতিক এই ঘটনার বিষয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ এখনো মূলত তাদের বক্তব্য ও বিক্ষোভের দাবির মধ্যেই রয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে হল প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা স্বাধীন তদন্তের ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ইব্রাহিমকে হেনস্তা কিংবা জোর করে স্টেটমেন্ট নেওয়ার অভিযোগকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে বিষয়টি নিয়ে হল প্রশাসনের কাছে জবাবদিহিতা ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে।


রাতের বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা স্পষ্টভাবে জানান, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত তারা বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার থাকবেন। তাদের মূল দাবি—আবাসিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোনো ধরনের ভয়ভীতি, অপমান বা হেনস্তামূলক আচরণ বন্ধ করা এবং হল প্রশাসনে শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা।

সম্পর্কিত খবর

;