ডারউইনে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়াকে হারাল ৯ উইকেটে

প্রকাশ : 16 Aug 2026
ডারউইনে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়াকে হারাল ৯ উইকেটে

ডেস্ক রিপোর্ট: অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবারের মতো টেস্ট জয়ের ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। ডারউইনের মারারা ওভালে সিরিজের প্রথম টেস্টে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংস ২৮৪ রানে গুটিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান। সেই লক্ষ্য ১৪.২ ওভারে মাত্র এক উইকেট হারিয়েই পেরিয়ে যায় বাংলাদেশ।


এই জয়ের মধ্য দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হলো। ২০০৩ সালে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে দুটি টেস্টেই হেরেছিল বাংলাদেশ। এরপর ২৩ বছর পর আবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমে সেই দলের বিপক্ষেই ইতিহাস গড়ল টাইগাররা। দুই দলের টেস্ট ইতিহাসে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় জয়। এর আগে ২০১৭ সালে মিরপুরে অস্ট্রেলিয়াকে ২০ রানে হারিয়েছিল বাংলাদেশ।


ডারউইন টেস্টে শুরু থেকেই বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ ছিল স্পষ্ট। প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট করে দেয় বাংলাদেশের বোলাররা। জবাবে ব্যাট হাতে দুর্দান্ত প্রতিরোধ গড়ে বাংলাদেশ। তরুণ ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম তুলে নেন দুর্দান্ত সেঞ্চুরি। ১০১ রানের সেই ইনিংসটি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি। মাত্র নিজের দ্বিতীয় টেস্টেই এমন কীর্তি গড়েন তানজিদ।


তানজিদের সেঞ্চুরির সঙ্গে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ রান, মেহেদী হাসান মিরাজের ৬৫ রানসহ ব্যাটারদের সম্মিলিত পারফরম্যান্সে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে সংগ্রহ করে ৪২৬ রান। ফলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের লিড দাঁড়ায় ২২৮ রান। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের অন্যতম বড় দলীয় সংগ্রহ।


অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে লড়াইটা কিছুটা জমিয়ে তুলেছিলেন ক্যামেরন গ্রিন। প্রথম ইনিংসে ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয় ইনিংসে দুর্দান্ত সেঞ্চুরি করেন তিনি। ১০৪ রানের ইনিংস খেলেও দলকে পরাজয়ের হাত থেকে বাঁচাতে পারেননি গ্রিন। বাংলাদেশের বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়ার বাকি ব্যাটাররা বড় জুটি গড়তে ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত ২৮৪ রানে থামে তাদের ইনিংস।


অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংস গুঁড়িয়ে দেওয়ার পথে বড় ভূমিকা রাখেন মেহেদী হাসান মিরাজ। দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি নেন ৫ উইকেট। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে স্টিভ স্মিথ, অ্যালেক্স ক্যারি, বিউ ওয়েবস্টার ও প্যাট কামিন্সদের ফিরিয়ে অস্ট্রেলিয়ার লোয়ার অর্ডার ভেঙে দেন এই স্পিন অলরাউন্ডার। তার সঙ্গে হাসান মাহমুদের ধারালো পেস আক্রমণ অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংকে চাপে রাখে।


ম্যাচজুড়ে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা পারফরমার ছিলেন হাসান মাহমুদ। দুই ইনিংস মিলিয়ে ৯ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতেছেন তিনি। প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট নেওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসেও গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে বারবার আঘাত করেন এই পেসার।


৫৭ রানের সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে অবশ্য শুরুতেই ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা তানজিদ হাসান কোনো রান না করেই জশ হ্যাজেলউডের বলে বোল্ড হয়ে ফিরে যান। মাত্র ৪ রানে প্রথম উইকেট হারানোর পরও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া করেনি বাংলাদেশ।


এরপর সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক মিলে দলকে নিরাপদে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন। দ্বিতীয় উইকেটে তাদের অবিচ্ছিন্ন জুটি বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করে। শেষ পর্যন্ত মুমিনুল হকের ব্যাট থেকেই আসে জয়সূচক বাউন্ডারি। বাংলাদেশ ১৪.২ ওভারে এক উইকেট হারিয়ে ৫৭ রান তুলে নেয়।


ডারউইনের এই জয় বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে অন্যতম বড় অর্জন। শুধু অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলকে তাদের ঘরের মাঠে হারানোই নয়, পুরো ম্যাচে ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং—তিন বিভাগেই আধিপত্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। চার দিনের মধ্যেই ম্যাচ শেষ করে ৯ উইকেটের জয় তুলে নিয়ে টাইগাররা বুঝিয়ে দিয়েছে, বিদেশের মাটিতেও এখন তারা বড় দলকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সামর্থ্য রাখে।


দুই ম্যাচের সিরিজে এই জয়ে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। ফলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথমবারের মতো টেস্ট সিরিজ জয়ের সম্ভাবনাও এখন তৈরি হয়েছে। ডারউইনে ইতিহাস গড়ার পর বাংলাদেশের সামনে এবার সিরিজ নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ।


বাংলাদেশের এই জয় তাই শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়; অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২৩ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের সামর্থ্যের নতুন এক বার্তা দিল লাল-সবুজের দল।

সম্পর্কিত খবর

;