৬ দশক ধরে বিনামূল্যে পাঠশালা, প্রধানমন্ত্রীর সম্মাননা পেলেন বরিশালের রমণী কান্ত

প্রকাশ : 09 Oct 2026
৬ দশক ধরে বিনামূল্যে পাঠশালা, প্রধানমন্ত্রীর সম্মাননা পেলেন বরিশালের রমণী কান্ত

রাহাদ সুমন,বরিশাল ব্যুরো: মন্দিরের আঙিনায় একটি টিনের একচালা ঘর, নেই কোনো আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, চেয়ার-টেবিল, বেঞ্চ কিংবা বেতনভুক্ত শিক্ষক। সেখানে বসেই প্রায় ৬০ বছর ধরে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের রাংতা গ্রামের রমণী কান্ত বেপারী। অবশেষে শিক্ষা ক্ষেত্রে তার এই মহতী অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার।


বিশ্ব শিক্ষক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে সোমবার ঢাকার আব্দুল গনি রোডের ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রমণী কান্ত বেপারীর গলায় পদক পরিয়ে দেন এবং নগদ দুই লাখ টাকার চেকসহ সম্মাননা সনদ তুলে দেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন তার নাতি তরুণ বেপারী। স্থানীয়দের কাছে তিনি কেবল একজন শিক্ষক নন, তিনি সবার প্রিয় ‘রমণী স্যার’। প্রত্যন্ত রাংতা গ্রামের তিন প্রজন্মের হাতেখড়ি হয়েছে তার কাছে।


জানা গেছে, রমণী কান্ত নিজে যখন স্কুলের ছাত্র তখনই এলাকার গরীব শিশুদের পড়ানো শুরু করেন। স্বাধীনতারও আগে সেই সূচনা, বয়স ৭০ পেরিয়ে গেলেও তা থামেনি। ১৯৭৩ সালে চাঁদশী ঈশ্বর চন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাস করে সরকারি গৌরনদী কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনো সম্ভব হয়নি। মেধাবী হওয়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরির সুযোগ পেলেও গ্রামের শিশুদের প্রতি মায়ায় তা গ্রহণ করেননি।


রাজিহার-চাঁদশী সড়কের পাশে রাংতা সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের আঙিনাই হয়ে উঠেছে তার পাঠশালা। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘রমণী কান্তের পাঠশালা’ নামে পরিচিত। শুক্রবার ব্যতীত সপ্তাহে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত চলে পাঠদান। বর্তমানে ২০ থেকে ২৫ জন শিশু নিয়মিত পড়ছে। এই পাঠশালায় কোনো নির্দিষ্ট মাসিক বেতন নেই। গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা যাতে অর্থের অভাবে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয় এটাই তার লক্ষ্য। পাঠশালা থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি নিজে শিক্ষার্থীদের পৌঁছে দেন পার্শ্ববর্তী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।


ব্যক্তিগত জীবনে রমণী কান্তের জীবন খুবই সাদামাটা। স্ত্রী রুম্পা বেপারীকে নিয়ে দোচালা টিনের ঘরে বসবাস করেন। একমাত্র ছেলে তাপস বেপারী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। সামান্য কৃষি জমি এবং বয়স্ক ভাতার ওপর নির্ভর করেই চলে সংসার।


সম্মাননা প্রাপ্তি প্রসঙ্গে রমণী কান্ত বেপারী বলেন, স্বাধীনতার আগে থেকেই এখানে বসে এলাকার শিশুদের পাঠদান করে আসছি। যতদিন বেঁচে আছি এভাবেই শিশুদের মাঝে শিক্ষা বিলিয়ে যেতে চাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাকে যে সম্মাননা দিয়েছেন তাতে আমার শিক্ষক জীবন সার্থক।


এ বিষয়ে আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিরুপম মজুমদার বলেন, রমণী কান্তের পাঠশালায় শিশুদের পাঠদান পদ্ধতি দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। তার মতো ভালো মানুষ সমাজে আছেন বলেই আমাদের দেশটা এত সুন্দর।


সম্পর্কিত খবর

;