ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে ফরিদপুরের কৃষক, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়

প্রকাশ : 09 Oct 2026
ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে ফরিদপুরের কৃষক, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়

অনিক রায়, ফরিদপুর অফিস: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় কৃষিকাজের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ফরিদপুরের কৃষকেরা। জমি চাষ, সেচ, ফসল কাটা, মাড়াই ও পরিবহন—কৃষির বিভিন্ন পর্যায়ে ডিজেলচালিত যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীলতা থাকায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে। অন্যদিকে, উৎপাদিত ফসলের বিক্রয়মূল্য আশানুরূপ না হওয়ায় লোকসানের আশঙ্কা করছেন প্রান্তিক ও মাঝারি পর্যায়ের চাষিরা।


শুক্রবার (৯ অক্টোবর) স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফরিদপুরের বিভিন্ন এলাকায় কৃষিকাজে শ্যালো মেশিন, পাওয়ার পাম্প, ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার ও হারভেস্টারের ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে পদ্মার চরাঞ্চলসহ সালথা, নগরকান্দা, বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সেচ ও জমি প্রস্তুতের কাজে ডিজেলচালিত যন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হয় অনেক কৃষককে। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব পড়ছে তাঁদের সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয়ে।


কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে ধান চাষের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হতে পারে। লিটারপ্রতি দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হলে এই পরিমাণ জ্বালানিতে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়ায় ৬০০ থেকে ৭০০ টাকার কাছাকাছি। এর সঙ্গে সেচের মাশুল, জমি চাষ ও ফসল পরিবহনের ভাড়া বাড়লে কৃষকের আর্থিক চাপ আরও বাড়ছে।


ফরিদপুর সদর উপজেলার অম্বিকাপুর ইউনিয়নের কৃষক মান্নান মাতুব্বর জানান, চলতি বছর তিনি আট বিঘা জমিতে আমন ধান ও পাট চাষ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর সেচপাম্পের মালিকেরা বিঘাপ্রতি সেচের খরচ ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছেন। ট্রলি ও হারভেস্টারের ভাড়াও বেশি দিতে হচ্ছে। ফলে ফসল ঘরে তোলার আগেই উৎপাদন ব্যয়ের হিসাব এলোমেলো হয়ে গেছে।


কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ধান উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রতি মণে আগে যেখানে আনুমানিক ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা ব্যয় হতো, সেখানে বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৯৫০ থেকে ১ হাজার ৫০ টাকায় পৌঁছেছে। অথচ বাজারে ধানের দাম মণপ্রতি প্রায় ৯৫০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে থাকায় অনেক কৃষকের উৎপাদন খরচ ওঠানো কঠিন হয়ে পড়ছে।


জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ফরিদপুরে চলতি মৌসুমে ৮৯ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধানের আবাদ হয়েছে। এ ছাড়া আউশ ধান চাষ হয়েছে ৪ হাজার ১৫২ হেক্টর জমিতে এবং বোরো ধানের আবাদ হয়েছে ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে। আমন ধানের বড় অংশ বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীল হলেও আউশ ও বোরো চাষের বিভিন্ন পর্যায়ে সেচের প্রয়োজন হয়।


নগরকান্দা উপজেলার কৃষক মো. শামীম হোসেন বলেন, বীজ, সার, শ্রমিকের মজুরি ও ডিজেলের খরচ মিলিয়ে এক মণ ধান উৎপাদনে ১ হাজার টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু বাজারে সেই অনুপাতে দাম পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর মতে, লাভের আশায় চাষাবাদ করলেও বর্তমানে অনেক কৃষককে টিকে থাকার জন্যই সংগ্রাম করতে হচ্ছে।


ধানের পাশাপাশি ফরিদপুরে পেঁয়াজ, পাট, সরিষা ও শীতকালীন সবজির আবাদেও বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বোয়ালমারী ও সালথা উপজেলার পেঁয়াজচাষিদের মতে, জমি প্রস্তুত ও সেচের কাজে ট্রাক্টর এবং পাওয়ার টিলার ব্যবহার করতে হয়। ডিজেলের দাম বাড়লে এসব যন্ত্রের ভাড়া বৃদ্ধি পায়, যার প্রভাব পড়ে ফসলের উৎপাদন খরচে।


সামনে বোরো মৌসুম শুরু হলে সেচের প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়বে। এ সময় ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীল কৃষকদের ব্যয় কতটা বাড়বে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে উৎপাদন খরচ ও ফসলের বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কৃষকেরা।


ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান বাংলানিউজকে জানান, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কৃষকদের সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। পানির অপচয় কমাতে কৃষকদের আধুনিক সেচপ্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রমে ধানের ন্যায্য ও সহায়ক মূল্য নিশ্চিত করা গেলে কৃষকেরা বর্তমান সংকট মোকাবিলায় উপকৃত হবেন বলে তিনি মনে করেন।

সম্পর্কিত খবর

;