শহীদ ও আহতদের পুনর্বাসন সরকারের পবিত্র দায়িত্ব : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

প্রকাশ : 04 Jul 2026
শহীদ ও আহতদের পুনর্বাসন সরকারের পবিত্র দায়িত্ব : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

স্টাফ রিপোর্টার: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের যথাযথ মূল্যায়ন ও পুনর্বাসন করা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। শহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তাদের পরিবার ও যোদ্ধাদের সর্বোচ্চ সম্মান, স্বীকৃতি ও জীবনমান নিশ্চিতকরণ, পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন ও সহায়তা প্রদানে সরকার কাজ করছে।


আজ শনিবার দুপুরে আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি ও আমরা জুলাই যোদ্ধা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যৌথ উদ্যোগে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।


জুলাই শহীদদের হত্যাকারীদের বিচার এ দেশের মাটিতেই হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র আপনাদের আত্মত্যাগকে মূল্যায়ন করবে। একই সঙ্গে আপনাদের বিরুদ্ধে যে অন্যায় হয়েছে, যেভাবে আপনার আপনজনকে হত্যা করা হয়েছে, অবশ্যই তার জন্য দায়ীদের বিচার হবে এই দেশের আইনে।


তিনি আরও বলেন, সবার উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আপনাদের মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশে শুধু আমার দলেরই নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং অরাজনৈতিক ব্যক্তি যারা ৫ আগস্টের আন্দোলন সফল করেছিলেন, তাদের সবাইকে বলতে চাই, আসুন আমাদের প্রতি স্বৈরাচার যেমন অবিচার করেছিল, বিচারের নামে কারও প্রতি যেন অবিচার না হয় সে বিষয়েও সচেতন থাকতে হবে।


নিজের পরিবারের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই অনুষ্ঠান চলাকালে আমি বারবার ভাবছিলাম, এই মুহূর্তে যদি আমি আমার মা’কে জিজ্ঞেস করতে পারতাম, আপনার ওপর যে অবিচার হয়েছে আপনি কি চান আমি এর প্রতিশোধ নিই? আমার বিশ্বাস মা বলতেন, এই মুহূর্তে তোমার কাজ সকলকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমি জানি, আমার ভাইকে জিজ্ঞেস করলেও তিনি একই উত্তর দিতেন।


তিনি বলেন, আমি জানি এখানে মা উপস্থিত আছেন। উনি দেখেছেন কীভাবে সন্তানকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এখানে ভাই উপস্থিত আছেন, সে দেখেছে কীভাবে তার ভাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আপনাদের এই কষ্টের বিপরীতে শুধু একটি কথাই বলতে চাই, আপনাদের যে কষ্ট, সেই কষ্টটি আমিও বুঝি, অনুভব করতে পারি।


প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বৈরাচারের সময় থেকে শুরু করে ৫ আগস্ট জুলাই আন্দোলনে অনেকেই শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সেই নির্যাতনের যে কষ্ট আপনাদের এখনো বয়ে বেড়াতে হচ্ছে, সেরকম শারীরিক ও মানসিক কষ্ট আমাকেও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এ কারণে আপনাদের কষ্ট আমি কিছুটা হলেও অনুভব করতে সক্ষম।


তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে যারা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, শহীদ হয়েছেন, তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন। তাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ৫ আগস্ট যে অর্জন আমরা করেছি, তা একক কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়। দেশের প্রতিটি গণতন্ত্রকামী মানুষের অর্জন। জনতার সম্মিলিত ত্যাগের ফসল।


জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ৬৫ জন শিশু শহীদ হয়েছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের কি কোনো অপরাধ ছিল? অপরাধ ছিল না। কিন্তু দেশকে স্বৈরাচার মুক্ত করতে গিয়ে যেভাবেই হোক এই শিশুগুলো জীবন দিয়েছে।


সেই উত্তাল দিনগুলোর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, জাতিসংঘের হিসাবে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন। আমার হিসাবে শুধু জুলাই আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন ২ হাজারের মতো মানুষ, ৩০ হাজারের মতো মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।


ফ্যাসিস্ট শাসনামলে দলের নেতা-কর্মীদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতনের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনজনকে আপনারা হারিয়েছেন, তারও তো লক্ষ্য ছিল এই দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন। জাতিকে এগিয়ে নিতে ত্যাগ স্বীকার করার মতো শক্তি ও সাহস বিএনপির আছে।


জাতিকে বিভক্ত করে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া যায় না উল্লেখ করে জুলাই পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনজনকে হারিয়েছেন, যে অঙ্গ হারিয়েছেন তা ঠিক হবে না। তবে সবাই মিলে আমরা যদি এ দেশকে এগিয়ে নিতে পারি, তবে একদিন গর্ব করে বলতে পারবেন আপনার আপনজনের ত্যাগের বিনিময়ে দেশের ভাগ্যের উন্নয়ন হয়েছে। এখন একমাত্র কাজ শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা।


প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য এই দেশ, এই দেশের জনগণ, এই দেশের মাটি। তাই আসুন আমরা চেষ্টা করি, যাতে আর কোনো শক্তি আমাদের এই লক্ষ্য অর্জন থেকে বিচ্যুত করতে না পারে। আজকের এই দিনে জুলাই শহীদ, জুলাই যোদ্ধা এবং বিগত ১৭ বছরের যতজন শহীদ হয়েছে তাদের প্রতি সম্পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করতে হলে, যার জন্য তারা ত্যাগ করেছেন সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হবে। এটিই হোক আজকের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের শপথ।


সম্মেলনের শুরুতে শহীদ পরিবারের হাতে জুলাই স্মৃতি স্মারক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় শহীদ মিরাজের বাবা রব মিয়া, শহীদ সেলিমের ভাই উজ্জ্বল হোসেন, জুলাই আহত আল মিরাজ ও জুলাই যোদ্ধা আমিনুল ইসলাম ঈমন প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে স্মারক গ্রহণ করেন। শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর হাতেও স্মৃতি স্মারক তুলে দেওয়া হয়।


জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, গৃহায়ন মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সংসদ সদস্য, কূটনীতিক ও সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল ও সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন পরবর্তীতে সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেশ ত্যাগ করেন। সরকারি গেজেটে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদের সংখ্যা ৮৩৪ জন। তবে জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হতে পারে।


সম্পর্কিত খবর

;