বরিশালে কাগজে ইলিশ আহরণ তিন গুণ, বাজারে সংকট ও দাম আকাশছোঁয়া

প্রকাশ : 29 Jul 2026
বরিশালে কাগজে ইলিশ আহরণ তিন গুণ, বাজারে সংকট ও দাম আকাশছোঁয়া

রাহাদ সুমন, বরিশাল ব্যুরো: ভরা মৌসুমের দেড় মাস পেরোলেও বরিশালের বাজারে ইলিশ নেই বললেই চলে। উচ্চ দামের কারণে রুপালি ইলিশ এখন মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। অথচ মৎস্য অধিদপ্তরের কাগজে হিসাব বলছে উল্টো কথা। তাদের তথ্য অনুযায়ী, মৌসুমের প্রথম মাস জুনে দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদী ও সাগরে গত বছরের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি ইলিশ আহরিত হয়েছে, যা গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।


মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত জুনে বিভাগের ছয় জেলায় মোট ৪০ হাজার ৫১৬ টন ইলিশ আহরিত হয়েছে। গত বছর একই সময়ে আহরণ ছিল ১৪ হাজার ৪৯৬ টন। অর্থাৎ এবার ২৬ হাজার ৩২০ টন বেশি দেখানো হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালে ২১ হাজার ৮২৭ টন, ২০২৩ সালে ১৫ হাজার ৪৮২ টন এবং ২০২২ সালে ৩০ হাজার ৮২০ টন আহরণ দেখানো হয়। বিভাগের মোট আহরণের অর্ধেকের বেশি দেখানো হয়েছে ভোলায়, চলতি জুনে ২৯ হাজার ৪৪৪ টন।


কিন্তু মোকাম ও হাটবাজারের চিত্র এই হিসাবকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ মৎস্য মোকাম পাথরঘাটায় গত বছর জুনে ৫৯ দশমিক ৫১ টন ইলিশ বিক্রি হলেও এ বছর বিক্রি হয়েছে ১১৪ দশমিক ৬৮ টন। মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আহরিত মাছের দুই-তৃতীয়াংশই ১০ ইঞ্চির কম আকারের জাটকা ও ছোট ইলিশ। নিষিদ্ধ ট্রলিং জাহাজ দিয়ে মোহনায় জাটকা ছেঁকে তোলা হচ্ছে, যা দণ্ডনীয় অপরাধ।


কুয়াকাটা-সংলগ্ন সাগরে ১৭ বছর ধরে মাছ ধরা জেলে ফোরকান সরদার বলেন, আগে আধা কেজি ওজনের ছোট ইলিশ পাওয়া যেত, এখন ছয়টিতে এক কেজি হয়। আগে চার থেকে সাড়ে চার ইঞ্চি ফাঁসের জাল ব্যবহার করলেও এখন তিন থেকে সাড়ে তিন ইঞ্চি ফাঁসের জাল ব্যবহার করতে হচ্ছে, ফলে প্রচুর জাটকা ধরা পড়ছে। পাথরঘাটার জেলে মতি মাঝি জানান, কাঠের ট্রলিং জাহাজে ইলিশের রেণুও নিধন হচ্ছে। পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের বিপণন ব্যবস্থাপক দেলোয়ার হোসাইন বলেন, নিষিদ্ধ ট্রলিং ট্রলারগুলো কৌশলে মাছ এনে বাজারে বিক্রি করছে, আগে যা চোরাইভাবে বিক্রি হওয়ায় হিসাবে আসত না।


চরফ্যাশনের সামরাজ মাছ ঘাটের ৪৭ বছরের আড়তদার আলাউদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, মেঘনায় ইলিশ নেই, ট্রলার সাগরে বাজার খরচও তুলতে পারছে না। মৎস্য অধিদপ্তর আমলাতান্ত্রিক হিসাব দেখাচ্ছে। এ বিষয়ে অধিদপ্তরের বরিশালের উপপরিচালক মো. মহসীন জাটকা নিধনে ইলিশ কমার কথা স্বীকার করে জনবল সংকটের কথা বলেন, তবে তিন গুণ আহরণের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।


এদিকে গত পাঁচ বছরে বরিশালে ইলিশের বার্ষিক আহরণ এক লাখ দুই হাজার টনের বেশি কমেছে। ২০২০-২১ সালে তিন লাখ ৬৯ হাজার ৩০১ টন আহরিত হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে দাঁড়ায় দুই লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ টনে। গত এক বছরেই কমেছে প্রায় ৬৮ হাজার টন।


কাগজে আহরণ বাড়লেও বাজারে দাম কমেনি, উল্টো বেড়েছে। বরিশাল পোর্ট রোড মোকামের আড়তদার নাসির উদ্দিন মিয়া জানান, গত বছরের চেয়ে প্রতি কেজিতে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি। গত ১৮ জুলাই ৩০০ গ্রামের কম ওজনের জাটকা পাইকারি ৮০০ ও খুচরা ৯০০ টাকার বেশি, ১২০০ গ্রাম আকারের ইলিশ পাইকারি দুই হাজার ৭৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। খুচরায় আরও ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাটকা নিধন বন্ধ না হলে কয়েক বছরের মধ্যে জাটকাও মিলবে না।


সম্পর্কিত খবর

;