দুই বছরেও সংস্কার হয়নি ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক, খানাখন্দে বেহাল দশা

প্রকাশ : 11 Oct 2026
দুই বছরেও সংস্কার হয়নি ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক, খানাখন্দে বেহাল দশা

রাহাদ সুমন,বরিশাল ব্যুরো: ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কের দপদপিয়া সেতুর টোল প্লাজা থেকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার অংশজুড়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মীরা ইট দিয়ে গর্ত ভরাটের চেষ্টা করছেন। এর আগেও একইভাবে ভরাট করা হলেও বৃষ্টিতে তা টেকেনি।


বরিশাল মহানগরীর দক্ষিণ পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া খরস্রোতা কীর্তনখোলা নদীর ওপর নির্মিত দপদপিয়া সেতু ঢাকা-কুয়াকাটা জাতীয় মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ সেতু। সেতুটির উত্তর প্রান্তে বরিশাল নগরী, দক্ষিণ ঢালে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। সাধারণত সেতুর ঢাল দিয়ে নামার সময় যানবাহনের গতি স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়, এমনকি ইঞ্জিন বন্ধ রাখলেও গাড়ি দ্রুত চলে। কিন্তু দপদপিয়া সেতুতে চিত্র উল্টো। ঢালে নামার সময় চালককে ব্রেক চেপে হেলেদুলে চলতে হয়। একটু অসতর্ক হলেই গর্তে পড়ে যানবাহন উল্টে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।


মহাসড়কের এমন বেহাল দশায় যাত্রীদের ক্ষোভ চরমে। কুয়াকাটাগামী একটি বাসে খানাখন্দের ছবি তোলার সময় এক যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ছবি ভালোভাবে তুলে কর্তৃপক্ষকে দেখাতে।


বরিশাল-চট্টগ্রাম রুটের সৌদিয়া পরিবহনের চালক মো. রায়হান জানান, আগে বরিশাল কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত যেতে ২ ঘণ্টা লাগত, এখন বেহাল সড়কের কারণে লাগছে প্রায় ৩ ঘণ্টা। দ্রুত যাওয়ার চেষ্টা করলে যাত্রীবাহী বাস সড়কের পাশের ডোবা-পুকুরে বা গাছের ওপর আছড়ে পড়ছে। এমন দুর্ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে বলে তিনি জানান।


বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, খানাখন্দের কারণে এ অংশে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে। গত এক মাসে অন্তত ৫টি থ্রি-হুইলার উল্টে ১০ জন আহত হয়েছেন। গত ৯ আগস্ট দপদপিয়া সেতু এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইয়াসিন আরাফাত নিহত হন। এরপর শিক্ষার্থীরা সংস্কারের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। তখন সড়ক ও জনপথ বিভাগ দ্রুত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা গত মঙ্গলবার সওজ কার্যালয়ে গিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলামের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।


শিক্ষার্থী মো. রাজীব জানান, নির্বাহী প্রকৌশলী ১০ অক্টোবরের মধ্যে প্রক্রিয়া শেষ করে ফুটপাত নির্মাণ এবং ১০ নভেম্বরের মধ্যে আরসিসি ঢালাই ও আলোর ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এ কাজ তদারকিতে সওজ কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি প্রতিনিধি দল গঠনের কথাও বলা হয়েছিল, কিন্তু এখন পর্যন্ত কাজ শুরু হয়নি।


শুধু দপদপিয়া অংশই নয়, ফরিদপুরের ভাঙ্গা মোড় থেকে মহাসড়কের দুর্ভোগ শুরু হয়। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের দক্ষিণ দিক থেকে বরিশাল-কুয়াকাটামুখী সড়কে পড়লেই ভোগান্তি শুরু। ভাঙ্গা থেকে পটুয়াখালীর পায়রা সেতু পর্যন্ত প্রায় ৯২ কিলোমিটার জুড়ে অসংখ্য খানাখন্দ। এর মধ্যে ভাঙ্গা থেকে গৌরনদী পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার অংশের অনেক জায়গা যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অথচ ২০২২ সালের জুনে পদ্মা সেতু চালুর পর এ সড়কে যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে। চাপ সামলাতে ১৮ ফুট চওড়া সড়ক ৩৪ ফুটে উন্নীত করা হলেও সংস্কারের অভাবে তা এখন চলাচলের অযোগ্য।


সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তারা বিষয়টি স্বীকার করে বলছেন, গত দুই অর্থবছরে নিয়মিত বরাদ্দ না আসায় বড় আকারে সংস্কার করা যায়নি, যার কুফল বর্ষা মৌসুমে আরও প্রকট হয়েছে।


সওজ বরিশাল জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করীম বলেন, কুয়াকাটা থেকে মাদারীপুরের ভুরঘাটা সেতু পর্যন্ত ১৬৭ কিলোমিটার তার আওতাধীন। ভুরঘাটা থেকে পায়রা সেতু পর্যন্ত সড়কটি ভাঙাচোরা অবস্থায় রয়েছে, আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে সংস্কার কাজ শুরু হবে।


অন্যদিকে সওজ গোপালগঞ্জ জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেদ শাহেদ জানান, ভাঙ্গা মোড় থেকে ভুরঘাটা পর্যন্ত ৪৮ কিলোমিটার তার আওতাধীন, যার বেশিরভাগই খারাপ অবস্থায় রয়েছে। ইতিমধ্যে সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে এবং চলতি অর্থবছরের মধ্যে ৩৫ কিলোমিটার সংস্কারের আশা করছেন তিনি।


সওজ বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলাম জানান, দপদপিয়া সেতুর টোলঘর থেকে ভোলামুখী সড়কের চরকাউয়া জিরোপয়েন্ট পর্যন্ত সাড়ে ৪ কিলোমিটার, গৌরনদী বাসস্ট্যান্ড থেকে বার্থী এবং বাসস্ট্যান্ড থেকে কাসেমাবাদ পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার করে সড়ক সংস্কারের দরপত্র গত ১৯ জুলাই সম্পন্ন হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে কাজের মান টেকসই হবে না বলে কাজ শুরু করা হয়নি। বর্ষা শেষে ঠিকাদার কাজ শুরু করবেন এবং আগামী ঈদযাত্রার আগে শেষ করার আশা করছেন। তিনি স্বীকার করেন, তার আওতাধীন ৪৮ কিলোমিটারের প্রায় অর্ধেক অংশ বর্তমানে ব্যবহারের অনুপযোগী এবং ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ না থাকায় সংস্কার করা সম্ভব হয়নি।


সম্পর্কিত খবর

;