চার সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে সফর

ঢাকায় ‘র’ প্রধান পরাগ জৈন

প্রকাশ : 10 Aug 2026
ঢাকায় ‘র’ প্রধান পরাগ জৈন

স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার মধ্যেই ঢাকায় এসেছেন ভারতের বহিঃগোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং—‘র’ বা RAW-এর প্রধান পরাগ জৈন। চার সদস্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়ে রোববার দুপুরে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি। বাংলাদেশে আসার আগে পরাগ জৈন চীন সফর করেছেন বলেও একাধিক বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।


সরকারের একটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, বাংলাদেশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণেই এই সফর হচ্ছে। প্রতিনিধি দলে পরাগ জৈনের সঙ্গে রয়েছেন অশ্বীন মুকুন্দ কোটনিস, রাহুল নেগি ও শৈবাল রায় চৌধুরী। এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইটে তারা ঢাকায় পৌঁছান এবং সফরকালে রাজধানীর একটি হোটেলে অবস্থান করবেন বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে।


তবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই সফর নিয়ে বাংলাদেশ বা ভারতের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিনিধি দলটি ঢাকায় কার কার সঙ্গে বৈঠক করবে, বৈঠকের সময়সূচি কী এবং আলোচনার নির্দিষ্ট বিষয় কী—এসব বিষয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। কূটনৈতিক সূত্রগুলো অবশ্য বলছে, দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই সফরটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।


পরাগ জৈনের ঢাকা সফরের বিশেষ তাৎপর্য তৈরি হয়েছে এর সময়কাল এবং সফরের ধারাবাহিকতার কারণে। বাংলাদেশে আসার আগে তিনি চীন সফর করেছেন। তবে চীনে তার সফরের উদ্দেশ্য, সেখানে কার সঙ্গে বৈঠক হয়েছে কিংবা কী ধরনের নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে—এ বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য প্রকাশিত হয়নি। ফলে চীন সফরের সঙ্গে ঢাকার সফরের সরাসরি কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।


ভারত-বাংলাদেশের নিরাপত্তা সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক সময়ে যোগাযোগ বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। চলতি বছরের মার্চে বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশিদ চৌধুরী নীরবে নয়াদিল্লি সফর করেন। সেখানে তিনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, সামরিক গোয়েন্দা প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আর এস রমন এবং ‘র’ প্রধান পরাগ জৈনের সঙ্গে বৈঠক করেন বলে ভারতীয় ও বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসে। ওই সফরকে দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা পুনরুজ্জীবিত করার একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছিল।


ওই সময় সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছিল, দুই দেশের ভূখণ্ড যেন পরস্পরের বিরুদ্ধে ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে ব্যবহার না হয়, সে বিষয়ে যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। দীর্ঘ সময়ের টানাপোড়েনের পর নিরাপত্তা পর্যায়ে এমন যোগাযোগকে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।


পরাগ জৈন ভারতের গোয়েন্দা ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন কর্মকর্তা। ১৯৮৯ ব্যাচের পাঞ্জাব ক্যাডারের আইপিএস কর্মকর্তা তিনি। ২০২৫ সালের ১ জুলাই তিনি ভারতের বহিঃগোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং রবি সিনহার স্থলাভিষিক্ত হন। এর আগে তিনি RAW-এর আওতাধীন এভিয়েশন রিসার্চ সেন্টারের প্রধান ছিলেন।


পরাগ জৈনের ক্যারিয়ারে জম্মু-কাশ্মীরসহ গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। মানব গোয়েন্দা তথ্যের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহারে তার দক্ষতার কথাও ভারতীয় বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর আগে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে তার ভূমিকার কথাও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়।


RAW-এর প্রধান হওয়ার কয়েক মাস পর ২০২৫ সালের নভেম্বরে পরাগ জৈনকে ভারতের মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়ের সেক্রেটারি (সিকিউরিটি) পদের অতিরিক্ত দায়িত্বও দেওয়া হয়। ভারতের সরকারি ক্যাবিনেট সেক্রেটারিয়েটের নথিতেও তাকে সেক্রেটারি (সিকিউরিটি) হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এই পদটি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় নিয়োজিত স্পেশাল প্রোটেকশন গ্রুপের প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত।


এ কারণে পরাগ জৈনের বর্তমান দায়িত্ব শুধু ভারতের বহিঃগোয়েন্দা কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ভারতের সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গেও তার সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফলে তার মতো একজন শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তার ঢাকা সফরকে সাধারণ কূটনৈতিক সফরের চেয়ে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।


বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা সহযোগিতা দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তঃদেশীয় অপরাধ, জঙ্গিবাদ, চোরাচালান, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং দুই দেশের ভূখণ্ড যেন কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার না হয়—এসব বিষয়ে দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগের প্রয়োজন রয়েছে। সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগগুলো সেই কাঠামোকে আবার সক্রিয় করার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।


এদিকে পরাগ জৈনের চীন সফর ঢাকার সফরকে আরও কৌশলগত গুরুত্ব দিয়েছে। চীন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অংশীদার এবং একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি। ফলে পরাগ জৈন চীন থেকে সরাসরি বা সফর শেষে ঢাকায় আসার বিষয়টি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত পর্যবেক্ষণের দিক থেকে আগ্রহ তৈরি করেছে। তবে চীন ও বাংলাদেশ সফরের মধ্যে কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা বা নির্দিষ্ট বার্তা রয়েছে—এমন দাবির পক্ষে এখনো প্রকাশ্য নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।


ঢাকায় পরাগ জৈনের সফরের মূল উদ্দেশ্য তাই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট নয়। তবে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ, সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা পর্যায়ে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ এবং তার চীন সফরের পর বাংলাদেশে আগমন—এই তিনটি বিষয় মিলিয়ে সফরটিকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী দিনে তার নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলের বাংলাদেশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক এবং আলোচনার বিষয়বস্তু প্রকাশ্যে এলে সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।


সব মিলিয়ে, দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের নিরাপত্তা যোগাযোগ যখন আবার সক্রিয় হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, ঠিক তখনই ভারতের বহিঃগোয়েন্দা প্রধানের চার সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে ঢাকায় আগমনকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বার্তা হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। তবে বৈঠক ও আলোচনার আনুষ্ঠানিক তথ্য না আসা পর্যন্ত সফরটির নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে অতিরিক্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো থেকে সতর্ক থাকাই হবে যুক্তিসঙ্গত।

সম্পর্কিত খবর

;