১৪ শিক্ষক, ৩ কর্মচারী; দাখিলে পাঁচ পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল

প্রকাশ : 10 Aug 2026
১৪ শিক্ষক, ৩ কর্মচারী; দাখিলে পাঁচ পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল

ময়মনসিংহ অফিস: ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার একটি দাখিল মাদরাসা থেকে ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়া পাঁচ শিক্ষার্থীর কেউই পাস করতে পারেনি। ১৪ জন শিক্ষক ও তিনজন কর্মচারী থাকা কড়ইকান্দি মফিজ উদ্দিন আকন্দ দাখিল মাদরাসার এমন ফলাফলে প্রতিষ্ঠানটির পাঠদান, একাডেমিক তদারকি ও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


সোমবার (১০ আগস্ট) দাখিল পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর নান্দাইল উপজেলার ৩৩টি মাদরাসার ফলাফল পর্যালোচনা করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। উপজেলার অন্য কোনো মাদরাসায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সব শিক্ষার্থী অকৃতকার্য না হলেও কড়ইকান্দি মফিজ উদ্দিন আকন্দ দাখিল মাদরাসার পাঁচ পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল করেছে।


জাহাঙ্গীরপুর ইউনিয়নের কড়ইকান্দি গ্রামে ১৯৯৮ সালে মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৩ সাল থেকে এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ১৪ জন শিক্ষক ও তিনজন কর্মচারী রয়েছেন। শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় ২০০ জন। তবে ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে অংশ নেয় মাত্র পাঁচজন। ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, ওই পাঁচজনের একজনও উত্তীর্ণ হতে পারেনি।


মাদরাসার সুপার আকলিমা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা এমপিওভুক্ত না হওয়ায় তাদের মনোবল ভেঙে পড়েছে। শিক্ষকদের তদারকিও তেমন ছিল না। এ কারণে শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করতে পারেনি।


তবে ১৪ জন শিক্ষক থাকার পরও মাত্র পাঁচজন পরীক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নিয়মিত পাঠদান কতটা কার্যকর ছিল, পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে শিক্ষকরা কী ধরনের ভূমিকা রেখেছেন, শিক্ষক উপস্থিতি ও একাডেমিক তদারকি কেমন ছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


নান্দাইল উপজেলার সামগ্রিক এসএসসি ফলাফলও এবার সন্তোষজনক নয়। উপজেলার ৩৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ২ হাজার ৪৬৫ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১ হাজার ১৮০ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫৯ জন। অর্থাৎ ১ হাজার ২৮৫ জন শিক্ষার্থী এবার উত্তীর্ণ হতে পারেনি।


বিদ্যালয়ভেদে ফলাফলে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। নান্দাইল পাইলট উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে ১৬৭ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে ১৩৫ জন। এ প্রতিষ্ঠান থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৫ জন শিক্ষার্থী। অন্যদিকে চর উত্তরবন্দ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে ২৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র তিনজন পাস করেছে।


দাখিল পরীক্ষাতেও উপজেলার প্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফলে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। নান্দাইলের ৩৩টি মাদরাসা থেকে এবার দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেয় ১ হাজার ১৬৫ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৬৮২ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে সাতজন।


ফলাফলের দিক থেকে কালিগঞ্জ বাবুল উলুম দাখিল মাদরাসা তুলনামূলক ভালো করেছে। প্রতিষ্ঠানটি থেকে ১০২ জন শিক্ষার্থী দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৯৯ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। বিপরীতে কড়ইকান্দি মফিজ উদ্দিন আকন্দ দাখিল মাদরাসার পাঁচ পরীক্ষার্থীর কেউই পাস করতে পারেনি।


কারিগরি শিক্ষাতেও নান্দাইলে এবার পাসের হার ৫২ দশমিক ৫৩ শতাংশ। উপজেলার ছয়টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ২৫৭ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১৩৫ জন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে আটজন।


নান্দাইল সরকারি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ১৩৮ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে ৯১ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠান থেকেই আটজন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। অন্যদিকে সিংদই কারিগরি ইনস্টিটিউট থেকে ১৪ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে মাত্র তিনজন।


কড়ইকান্দি মফিজ উদ্দিন আকন্দ দাখিল মাদরাসার ফলাফল ও প্রতিষ্ঠানটির তদারকি সম্পর্কে নান্দাইল উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মফিজুল ইসলাম বলেন, মাদরাসাটি এমপিওভুক্ত নয়। ফলে সেখানে শিক্ষকদের নিয়মিত বেতন-ভাতার ব্যবস্থা নেই। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটির ওপর তাদের তদারকিও তেমন নেই।


এসএসসি ও দাখিলের ফলাফল সম্পর্কে মফিজুল ইসলাম বলেন, অন্য বছরের তুলনায় এ বছর পরীক্ষা অনেক বেশি কড়াকড়ি হয়েছে। এর প্রভাব ফলাফলেও পড়েছে। মূলত যারা জেনুইন শিক্ষার্থী, তারাই পাস করেছে।


দাখিল মাদরাসাগুলোর ফলাফল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বছর তারা তেমন সুযোগ পায়নি। আগামী বছর থেকে ফলাফল উন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।


তবে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু পরীক্ষার কড়াকড়িকে ফল বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে দেখলে প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ শিক্ষা ব্যবস্থাপনার বিষয়টি আড়ালে থেকে যেতে পারে। বিশেষ করে যেখানে শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষক সংখ্যা বেশি, সেখানে নিয়মিত পাঠদান, বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি, দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদা সহায়তা এবং পরীক্ষার আগে নিবিড় তদারকি কতটা হয়েছে, তা পর্যালোচনা করা জরুরি।


কড়ইকান্দি মফিজ উদ্দিন আকন্দ দাখিল মাদরাসার ক্ষেত্রে পাঁচ পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল করায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ২০০ হলেও দাখিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র পাঁচজন—এমন ব্যবধানের কারণও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, প্রতিষ্ঠানটির এমপিওভুক্ত না হওয়া এবং একাডেমিক তদারকির ঘাটতি—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে আগামী দিনেও এমন ফলাফল অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

সম্পর্কিত খবর

;