পাঠক সংকটে নড়াইলের গ্রন্থাগারগুলোতে নেমেছে নীরবতার ছা্য়া

প্রকাশ : 23 Jun 2026
পাঠক সংকটে নড়াইলের গ্রন্থাগারগুলোতে নেমেছে নীরবতার ছা্য়া

সুজয় ঘোষ, নড়াইল: এক সময় জ্ঞানপিপাসু মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত নড়াইলের গ্রন্থাগারগুলো। বইয়ের তাকের সামনে দাঁড়িয়ে নতুন বই খোঁজা, পাঠকক্ষের প্রতিটি আসন ভরে ওঠা কিংবা পছন্দের বইয়ের জন্য অপেক্ষা করা ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য। সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। হাজার হাজার বইয়ের সমৃদ্ধ সংগ্রহ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জেলার সরকারি-বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলো আজ যেন পাঠকশূন্য নীরবতার সাক্ষী।


নড়াইল জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারে একসঙ্গে দুই শতাধিক পাঠকের বসে বই পড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। পাঠকদের সুবিধার্থে রয়েছে পুরুষ কর্নার, নারী কর্নার, জব কর্নার ও পত্রিকা কর্নার। সুসজ্জিত আলমারিতে থরে থরে সাজানো প্রায় ৪০ হাজার বই। সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, রাজনীতি, শিশুতোষ কিংবা জীবনী; জ্ঞানচর্চার প্রায় সব শাখার বই রয়েছে এখানে। বছরের পর বছর ধরে সংরক্ষণ করা হয়েছে বহু মূল্যবান ও দুর্লভ গ্রন্থও।


কিন্তু এত আয়োজনের বিপরীতে বাস্তবতা ভিন্ন। সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত লাইব্রেরি খোলা থাকলেও গড়ে মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ জন পাঠকের উপস্থিতি দেখা যায়। বিশাল পাঠকক্ষের অধিকাংশ আসনই দিনের বেশিরভাগ সময় ফাঁকা পড়ে থাকে। শিশু কর্নারে এখনো কিছুটা প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়। স্কুলের ফাঁকে হাতে গোনা কয়েকজন শিশু গল্পের বই পড়ে কিংবা খেলাধুলা করে সময় কাটায়। তবে মূল পাঠকক্ষে সেই প্রাণের স্পন্দন অনেকটাই অনুপস্থিত। শুধু জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার নয়, জেলার প্রায় ২০ থেকে ২২টি সরকারি ও বেসরকারি গ্রন্থাগারেই একই চিত্র চোখে পড়ে।


সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তার এবং মোবাইল ফোন, ট্যাব, কম্পিউটার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার নতুন প্রজন্মকে বই থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এক সময় লাইব্রেরিতে বসার জায়গা না পেয়ে মানুষ অপেক্ষা করত, আর এখন পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও পাঠকের দেখা মেলে না। মানুষের চোখ বইয়ের পাতার চেয়ে বেশি আটকে থাকে ডিজিটাল স্ক্রিনে। ফলে বই পড়ে জ্ঞান আহরণের যে চর্চা ছিল, তা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।


আব্দুল হাই ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মনিরুজ্জামান মল্লিক বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহার আমাদের নতুন প্রজন্মকে বইয়ের পাতা থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। এক সময় শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়াশুনা করতো, যা তাদের চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতাকে সমৃদ্ধ করত। এখন ডিজিটাল স্ক্রিন-নির্ভরতার কারণে তরুণদের গভীর মনোযোগ ও সৃজনশীলতা কমে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, গ্রন্থাগারগুলোকে শুধু বইয়ের ঘর হিসেবে রেখে দিলে চলবে না। এগুলোকে প্রাণবন্ত রাখতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে অন্তত একটি লাইব্রেরি ক্লাস বাধ্যতামূলক করা এবং তরুণদের রুচি অনুযায়ী নতুন বই সংগ্রহ বাড়ানো সময়ের দাবি।


পাঠক সংকট কাটিয়ে উঠতে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের ওপর জোর দিচ্ছেন। তাদের মতে, নিয়মিত পাঠচক্র, সেমিনার ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করতে হবে। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ‘বই পড়া উৎসব’ ও বিভিন্ন আকর্ষণীয় প্রতিযোগিতা চালু করা যেতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য গ্রন্থাগার ব্যবহারকে উৎসাহিত এবং আংশিকভাবে বাধ্যতামূলক করার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গ্রন্থাগারগুলোকে আরও আধুনিক ও আকর্ষণীয় করে তোলারও বিকল্প নেই।


জেলা প্রশাসক ড. আব্দুল ছালাম জানান, লাইব্রেরিগুলোতে পাঠক ফেরাতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও উৎসবের মাধ্যমে বইমুখী করার পরিকল্পনা রয়েছে। জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারের লাইব্রেরিয়ান মো. তাজমুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে তরুণদের আগ্রহের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নিয়মিত নতুন বই সংগ্রহ করা হচ্ছে। এছাড়া ডিজিটাল ক্যাটালগ ও ই-বুক সেকশন চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যাতে প্রযুক্তিনির্ভর পাঠকরাও লাইব্রেরিমুখী হয়।


জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে গ্রন্থাগারের ভূমিকা অপরিসীম। অথচ আজ সেই গ্রন্থাগারগুলোই পাঠকের অপেক্ষায় দিন গুনছে। তাকভর্তি অমূল্য বইগুলো যেন আবার পাঠকের হাতে পৌঁছায়, বইয়ের পাতায় ফিরে আসুক নতুন প্রজন্মের আগ্রহ — এমন প্রত্যাশাই নড়াইলের সচেতন মহলের। কারণ, একটি সমাজ যত বেশি বইয়ের কাছাকাছি থাকে, তত বেশি আলোকিত হয় তার ভবিষ্যৎ।


সম্পর্কিত খবর

;