স্টাফ রিপোর্টার: জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা না করে বাজেট বাস্তবায়নে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে, শেখ হাসিনা ফিরলে জুলাই আন্দোলনে প্রোফাইল লালকারীদের জীবন কালো করে ছাড়বে। অন্যদিকে বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান বাধা দুর্নীতি ও দলীয়করণ বলে দাবি করেছেন বিরোধী দলীয় সদস্যরা। তারা জুলাই যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষার পাশাপাশি রাজনৈতিক সুরক্ষা কী হবে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন। সেক্ষেত্রে জুলাই যোদ্ধাদের যে কোনো সুরক্ষা দিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রথমে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও পরে প্যানেল চেয়ারম্যান মো. জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে সাধারণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলের উদ্দেশে সরকারি দলের সদস্য রেহানা আক্তার রানু বলেন, এই সরকারের চার মাস। বিরোধীদল বলছে, আরেকটি আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হন, বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত হন। আমি উনাদের কাছে বলতে চাই, আপনারা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আস্থা রাখুন, প্রধানমন্ত্রীকে সহযোগিতা করুন। আপনাদের অনেকের কারণে আবারও যদি দানব হাসিনা... আল্লাহ না করুক, আল্লাহ না করুক, আল্লাহ না করুক, আবারও যদি দানব হাসিনা ফিরে আসে, যারা ফেসবুকে প্রোফাইল লাল করেছিলেন, জীবনটা কালো করে ছাড়বে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে ‘আয়নাঘরের’ বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার চেয়ারে বসানোর দাবি জানিয়ে রেহানা আক্তার রানু বলেন, অতীতে যে চেয়ারে বিরোধীদলের নেতাদের বসিয়ে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হতো, শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে সেই চেয়ারে বসিয়ে বা শুইয়ে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া উচিত। সেটি কেমন লাগে তা তার অনুভব করা দরকার। তিনি আরও বলেন, চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের শহীদদের কথা স্মরণ করে আক্ষেপ হয়। নিহতদের পরিবারগুলো এখনো সন্তান হত্যার সঠিক বিচার পাচ্ছে না, কারণ পুলিশ আসামিদের ধরছে না এবং ধরলেও আদালত জামিন দিয়ে দিচ্ছে।
এরপর জুলাই শহীদ শিশু জাবির ইব্রাহিমের মা এবং জামায়াত জোটের মনোনীত সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম তাঁর আবেগঘন বক্তব্যে বলেন, সন্তান হারানোর বেদনা যে কতটা গভীর তা একজন শহীদ মায়ের পক্ষেই কেবল পুরোপুরি উপলব্ধি করা সম্ভব। গত ৫ আগস্ট তার ছোট ছেলে জাবির ইব্রাহিম গুলিবিদ্ধ হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে শাহাদাত বরণ করে। তার ছেলের মতো অসংখ্য শহীদের রক্ত ও বীর সন্তানের অঙ্গহানির আর্তনাদে এই জাতীয় সংসদ ভাসছে। দীর্ঘ ১৭ বছর নানা জুলুম-নির্যাতনের পর এই রক্তস্নাত জাতীয় সংসদে আবারও অধিবেশন চলছে, যা জুলাই বিপ্লব না আসলে কোনোভাবেই সম্ভব হতো না।
জুলাই বিপ্লবের শহীদের হত্যার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি করেন বিরোধী দলীয় ওই সংসদ সদস্য। তিনি পিলখানা হত্যাকাণ্ড ও শাপলা চত্বরের মতো অন্যান্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডেরও দ্রুত বিচার দাবি করেন এবং বাজেটে জুলাই শহীদ পরিবারের জন্য বরাদ্দ রাখার কথা উল্লেখ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার জুলাই যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা দিলেও রাজনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করেনি।
ওই অভিযোগের প্রেক্ষিতে সংসদে ব্যাখ্যা দেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, বর্তমান বিএনপি সরকার জুলাই এবং জুলাই যোদ্ধাদের আইনি কাঠামোর আওতায় এনে সুরক্ষা দিয়েছে, যা রাজনৈতিক সুরক্ষাও বটে। তিনি বলেন, সরকারের প্রতিটি কার্যক্রমই একটি রাজনৈতিক দলিল এবং জননীতির অংশ। সরকার কেবল আইনি কাঠামোর মাধ্যমেই সুরক্ষা দিতে পারে। জুলাই চেতনায় বিশ্বাসী বর্তমান সরকার জুলাই এবং জুলাই যোদ্ধাদের সব ধরনের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে, যা একই সঙ্গে রাজনৈতিক সুরক্ষাও। যদি তিনি জুলাই যোদ্ধাদের জন্য আরও কোনো ধরনের সুরক্ষার সুপারিশ করেন, সরকার তা বিবেচনা করবে এবং সরকার প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।
এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘বিশাল ঘাটতি ও ঋণনির্ভর’ বলে আখ্যায়িত করেন বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ গোলাম রসুল। তিনি বলেন, এটি একটি বিশাল ঘাটতি বাজেট। এতে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে। বাজেটের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ৮১ শতাংশই ঋণনির্ভর। বর্তমানে দেশের প্রতিটি মানুষের কাঁধে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার টাকার ঋণের বোঝা চেপে আছে। এই বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান দুটি বাধা হবে ‘দুর্নীতি’ ও ‘দলীয়করণ’।
বাজেট বাস্তবায়নে দুর্নীতি ও দলীয়করণের চিত্র তুলে ধরে ওই সংসদ সদস্য বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে গুম-খুনের সমালোচনা আমরা করছি, কিন্তু সেই ফ্যাসিবাদী সরকারের দোসর এস আলম ব্যাংকগুলো ডাকাতি করে, এক লাখ কোটি টাকা দুর্নীতি করে খালি করে দিয়েছে। সেই ফ্যাসিবাদী দোসরদেরই আবার বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চলছে। এই অবস্থায় সংসদের ৩৫০ জন সদস্য যদি দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থেকে সৎ না হন, তাহলে এই বাজেট বাস্তবায়ন অত্যন্ত কঠিন। এ সময় দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রশাসনের সর্বক্ষেত্রে চরম দলীয়করণেরও তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।
ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ সদস্য থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা জাতীয় সংসদের সদস্য হয়েছেন বলে জানান কুষ্টিয়া-২ আসনের মোহাম্মদ আব্দুল গফুর। সংসদে সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এক আবেগঘন বক্তব্যে নিজের রাজনৈতিক জীবনের উত্থানের গল্প শুনিয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। তিনি বলেন, তিনি সবচেয়ে নিচু জায়গা থেকে রাজনীতি শুরু করেছিলেন। ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার থেকে শুরু করে এরপর চেয়ারম্যান, পরবর্তীতে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
সংসদ সদস্য মো. আলী আজগার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ঘোষিত বরাদ্দ ও উপখাতভিত্তিক ব্যয়ের মধ্যে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে। আবাসন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তবে এ বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য শামিম কায়সার বলেন, চলতি বাজেটে এমন কোনো সুযোগ নেই। পরে আলী আজগার বলেন, তিনি বাজেট নথির তথ্যের ভিত্তিতেই বক্তব্য দিয়েছেন।
জামায়াতে ইসলামীর মো. রুহুল আমিন বলেন, মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, গুম, আয়নাঘর, ফ্যাসিবাদ, জুলাই সনদ ও গণহত্যার মতো বিষয়গুলোতে সংসদ সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্য থাকা উচিত। তিনি বলেন, বাজেট শুধু উন্নয়ন ব্যয়ের হিসাব নয়; এর সঙ্গে মানুষের শান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নও জড়িত। দেশের ৫ শতাংশ মানুষের হাতে দেশের অধিকাংশ সম্পদ কেন্দ্রীভূত। এ ধরনের বৈষম্য নিয়ে একটি দেশ দীর্ঘদিন ভালোভাবে চলতে পারে না। তিনি আরও বলেন, গত অর্থবছরে রাজস্ব আহরণে ঘাটতি থাকলেও নতুন বছরে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কর-জিডিপি অনুপাতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
দুর্নীতি ও মাদককে দেশের প্রধান দুটি সমস্যা উল্লেখ করে সংসদ সদস্য আবু তালেব মণ্ডল বলেন, আমরা ৩৫০ জন সংসদ সদস্য যদি দুর্নীতিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় না দিই, তাহলে বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি দূর হতে বেশি সময় লাগবে না। মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ করতে হবে। তিনি বলেন, বাজেটের আকার যেমন বড় হয়েছে, তেমনি বেড়েছে ঘাটতিও। তবে ঘাটতি পূরণের কিছু দিকনির্দেশনা বাজেটে রয়েছে। শিক্ষা খাতের বরাদ্দের হিসাব আরও স্বচ্ছ করার আহ্বান জানান তিনি।
বাজেটকে গণমুখী, উৎপাদনমুখী ও মানবিক বলে অভিহিত করেন বিএনপির সংসদ সদস্য মো. রেজাউল করিম বাদশা। তিনি বাজেটকে ‘স্বপ্নবিলাসী’ আখ্যা দেওয়ার সমালোচনা করে বলেন, স্বপ্ন না থাকলে মানুষ বাঁচবে কী করে? জুলাই যোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা, নারী ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ধর্মীয় সেবাদানকারীদের সম্মানী ও স্বাস্থ্যসেবার কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক কমানোর উদ্যোগের প্রশংসা করেন। জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের জন্য মেট্রোরেলে ভাড়া ছাড় ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন তিনি।
স্টাফ রিপোর্টার: আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেবে আদালত, জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মঙ্গলবার ২৩ জুন তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে সাপ্তাহিক প্রেস ...
স্টাফ রিপোর্টার: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের উপর আলোচনায় অংশ নিয়ে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য রেখেছেন সরকার ও বিরোধী দলীয় সদস্যরা। সরকারি দলের সদস্যরা বলেছেন, মসজিদ আল্লাহর ঘর, সেখ ...
স্টাফ রিপোর্টার: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনুর রায় আগামী ৩০ জুন মঙ্গলবার ঘোষণা করবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।আন্তর ...
ডেস্ক রিপাের্ট: কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সেলিমা আহমাদ মেরী মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর।রবিবার ২১ জুন বাংলাদেশ সময় রা ...
সব মন্তব্য
No Comments