ঢাকা-৫ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ে নিরব বিপ্লব ঘটতে পারে জাপা

প্রকাশ : 31 Jan 2026
ঢাকা-৫ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ে নিরব বিপ্লব ঘটতে পারে জাপা

স্টাফ রিপোর্টার: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ১১ আগেই চূড়ান্ত লড়াইয়ে মেতে উঠেছেন বিএনপি-জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও জাতীয় পাটিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। তাদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠছে ঢাকা-৫ নির্বাচনী এলাকার ভোটার ও স্ব স্ব দলের কর্মী-সমর্থকরা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ  দুর্বার এই আসনের প্রার্থীরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা ও গণসংযোগে; ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে চাইছেন সমর্থন ও ভোট। তবে বিএনপি, জামায়াত আর ইসলামী আন্দোলনের ত্রিমুখী লড়াইয়ে সরগরম হয়ে উঠা ঢাকা-৫ নির্বাচনী এলাকায় নিরবে বিপ্লব ঘটাতে পারে জাতীয় পাটি এমনটি মনে করছেন সংশ্লিষ্ট্ররা। 

স্থানীয় ভোটারদের মতে, নির্বাচনের দিনক্ষন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে নির্বাচনী উত্তাপ। নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত আসনটির বাসিন্দাদের জন্য দিচ্ছেন সবকিছু করার প্রতিশ্রুতি। তবে সুষ্ঠু ভোট নিশ্চিতে নিরাপত্তার ওপর জোর দিচ্ছেন প্রার্থীরা। পোস্টার, ব্যানার, মাইকিং আর জনসমাবেশে জোরেশোরে চলছে ঢাকা-৫ আসনের প্রার্থীদের প্রচার। রাজধানীর প্রবেশদ্বার বলে খ্যাত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গুরুত্বপূর্ণ আসন ঢাকা-৫। সায়েদাবাদ বাসটার্মিনাল, যাত্রাবাড়ীর আড়ৎ,ডেমরার শিল্পাঞ্চলসহ আবাসিক এলাকা ও ঘনবসতিপূর্ণ জনপদের মিশ্রণ এলাকাটিতে। এ আসনে বিএনপি প্রার্থী নবী উল্লাহ নবীর আশ্বাস, নির্বাচিত হলে এলাকাটিতে সরকারি হাসপাতাল নির্মাণের পাশাপাশি মাদক ও সন্ত্রাস দমনে জোর দেবেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে এ আসনের আওতায় যে এলাকা আছে সেখানে কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, খেলার মাঠ, হাসপাতাল স্থাপন করা হয়নি। যদি আমি নির্বাচিত হতে পারি, তাহলে এলাকায় এগুলো স্থাপন করব। তবে ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চান জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ কামাল হোসেন। তিনি বলেন, জালিমরা পালিয়ে গেলেও সবক্ষেত্র থেকে এখনও জুলুম নির্মূল হয়নি। এখনও অনেক অন্যায় ও অবিচার চলছে। ক্ষমতায় যেতে পারলে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করব। আসনটিতে আলোচনায় থাকা ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হাজী ইব্রাহিম, এর আগেও ছিলেন দুবারের কাউন্সিলর। তাই চিরচেনা এলাকার উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চান তিনি। গত ৫ আগস্টে পর আওয়ামী লীগের নেতারা পলাতক থাকলে ও তাদের কর্মী-সমর্থকদের ভোট নিয়ে আশাবাদ প্রত্যেক প্রার্থীই। তাদের আশায় গুড়েবালি হতে পারে ১৪ দলীয় জোটের সঙ্গী জাতীয় পাটি। লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী মীর আব্দুস সবুর আসুদকে বিজয়ী করতে আওয়ামী লীগ-ওয়ার্কাস পাটিসহ ১৪ দলীয় জোটের ভোট একাট্টাভাবে লাঙ্গলে পড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনীতিক বিশ্লেষকরা।

নির্বাচনী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এ আসনে একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ভোটের মূল লড়াইটি হবে মূলত বিএনপি, জামায়াত-জাতীয় পাটি ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীদের মধ্যে। ভোটারদের মতে, মাঠের রাজনীতিতে এই চার দলের প্রার্থীই তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। বড় দলগুলোর প্রার্থী বাছাইয়ের সমীকরণ ও আঞ্চলিক জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে ঢাকা-৫ আসনে এবার চতুরমুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে। যাত্রাবাড়ী থানার অন্তর্ভুক্ত শেখদী এলাকার বাসিন্দা ফজলুর রহমান বলেন, এই আসনে ধানেরশীষ ও হাতপাখা মনোনীত প্রার্থীর প্রচারণা ও গণসংযোগ সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে। তাই মনে হচ্ছে, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই দুই প্রার্থীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে জামায়াত ইসলামীর প্রার্থীরও ভোট ব্যাংক রয়েছে। তিনি বলেন, প্রার্থীরা নির্বাচনের আগে অনেক বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু ভোটের পর সেগুলো কতটুকু বাস্তবায়ন হয়, সেটিই দেখার বিষয়। আমরা এবার প্রতিশ্রুতির চেয়ে কাজের প্রতিফলন বেশি দেখতে চাই। ঢাকা-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক নবী উল্লাহ নবী বলেন, আমি দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে স্থানীয় রাজনীতি করে আসছি। এই এলাকার সন্তান হিসাবে দীর্ঘ পথচলায় আমি সব সময়ই মানুষের পাশে ছিলাম। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আমার এলাকাতেই সর্বপ্রথম দুর্বার আন্দোলন শুরু হয়, যাতে আমার কর্মী সমর্থকরা স্বকীয় ছিলো। বর্তমানে আমি ঘরে ঘরে গিয়ে গণসংযোগ ও প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছি এবং সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, নির্বাচিত হলে আমাকে অতীতের ন্যায় ভবিষ্যতেও বৃহৎ পরিসরে কাজ করবো ইনশাআল্লাহ। নির্বাচিত হলে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, খেলার মাঠ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি গ্যাস সংকট ও জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করব ইনশাআল্লাহ।

ঢাকা-৫ আসনে বড় চমক দেখাতে চায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হাজী মো. ইব্রাহীম। তিনি ৬৭ নম্বর ওয়ার্ডের দুইবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর এবং নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে বলে জানা যায়। ১১ দলীয় নির্বাচনী সমঝোতা থেকে বেরিয়ে ইসলামী আন্দোলন সারাদেশে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিতে মাঠে নেমেছে। ৬৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আব্দুর রহমান ভুঁইয়া বলেন, ইব্রাহীম কমিশনার অত্যন্ত ভালো মানুষ। তিনি নির্বাচিত হলে এলাকায় উন্নয়ন হবে। বিগত দিনে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাই আমরা হাতপাখায় ভোট দেব। এই আসনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইসলামি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকায় ইসলামপন্থী প্রার্থী হিসেবে হাজী মো. ইব্রাহীম বাড়তি সুবিধা পাবেন বলেও মনে করছেন অনেকে। হাজী মো. ইব্রাহীম বলেন, আমি ঢাকা-০৫ আসনে প্রার্থীতা ঘোষণা করার পর থেকে এলাকার গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যে জনগণ আমাকে দুইবার কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত করেছে। আমি সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেছি কিনা জরিপ করে দেখুন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হলেও দল-মত নির্বিশেষে সকল মানুষ আমার পাশে দাঁড়িয়েছে। তাই আগামী নির্বাচনে আমি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, আমি প্রার্থী হওয়ার আগেই জনস্বার্থ রক্ষায় কাজ করে আসছি। জুলাই বিপ্লবের সময় আমাদের এই এলাকার মানুষের পাশে ছিলাম। তিনি আরও বলেন, জুলাই বিপ্লবের শহীদদের আকাঙ্ক্ষা এবং নতুন বাংলাদেশ গড়তে জনগণ এবার সৎ, যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্ব বেছে নেবে বলে আমার বিশ্বাস। পর্যাপ্ত সরকারি হাসপাতাল, কলেজ ও খেলার মাঠ নেই। নির্বাচিত হলে এসব সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি এলাকাকে চাঁদাবাজিমুক্ত করতে কঠোর ভূমিকা রাখব। নিরঙ্কুশ রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা জাতীয় পার্টি এবার ত্রয়োদশ নির্বাচনী প্রচারণায় তুলনামূলকভাবে নীরব অবস্থানে রয়েছে। তবে স্বাধীনতাবিরোধী ব্যথিত ১৪ দলীয় জোটের কর্ম-সমর্থকদের ভোট লাঙ্গল প্রতীকেই যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন জাতীয় পাটির প্রার্থীরা। তারা বলছেন ঢাকা-৫ সহ বেশ কিছু সংসদীয় আসনে ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াতের প্রার্থী থাকায় তাদের ভোট ভাগাভাগি হতে পারে। সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ-ওয়ার্কার্স পাটি,জাসদসহ ১৪ দলীয় জোটের কর্মী-সমর্থকদের ভোট লাঙ্গলেই আসবে। এতে নিরব ভোট বিপ্লব ঘটবে জাতীয় পাটিতে। বিএনপির সাবেক এমপি আলহাজ্ব সালাহউদ্দিনের সঙ্গে নবী উল্লাহ নবীর বিরোধ রয়েছে দীর্ঘদিনের। এবারও মনোনয়নযুদ্ধে ঢাকা-৫ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন সাবেক এই এমপি। তাছাড়া এই আসনটিতে উন্নয়নও শুরু হয়েছিল আলহাজ্ব সালাহ উদ্দিনের হাত ধরে। অবহেলিত ঢাকা-৫ কে তিনি উন্নয়নের নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে স্কুল-কলেজসহ অসংখ্য উন্নয়ন হয়েছিল তার হাত ধরে। ফলে এই আসনে এখন ৫০ ভাগ বিএনপির নেতাকর্মী সালাহ উদ্দিনের আর্দশের পথ অনুস্বরণ করে। 

এ বিষয়ে ঢাকা-৫ আসনে জাতীয় পাটি মনোনীত প্রার্থী মীর আব্দুস সবুর আসুদ বলেন, গত ১৬ বছরে আমি কারো ক্ষতি করিনি বরং এলাকার সন্তান হিসেবে সবাইকে ভালোবাসা দিয়েছি। যতটুকু সম্ভব হয়েছে পাশে দাঁড়িয়েছি। সুতরাং ভয় পাওয়ার কিছু নাই। নানা কারণে ভোটাররা লাঙ্গল প্রতীকে প্রকাশ্যে সমর্থন না দিলেও নির্বাচনেরদিন ভোট আমাকেই দিবে। কারণ বর্তমানে ভোটাররা যথেষ্ট সচেতন। প্রকাশ্যভাবে সমর্থন দিয়ে কোনো ধরনের ঝুঁকি তাঁরা নিতে চান না। তবে ভোটের ব্যালট বাক্সে নিজেদের মতামত দিয়ে তাঁরা লাঙ্গল প্রতীকে এবার বিপ্লব ঘটাবেন।

প্রসঙ্গত, ঢাকা-৫ সংসদীয় আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ১৯ হাজার ৯৯৬ জন। তারমধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৪ হাজার ৫৯৪ জন। আর নারী ভোটার ২ লাখ ৫ হাজার ৩৯৭ জন। এ ছাড়া তৃতীয় লিঙ্গ আছেন পাঁচ জন। এই আসনটিতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছেন বিএনপির প্রার্থী মো. নবী উল্লাহ নবী, জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ কামাল হোসেন ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাজী মো. ইবরাহীম ও জাতীয় পাটি  জেপি) মীর আব্দুস সবুর আসুদ। এছাড়াও গণঅধিকার পরিষদের সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহিম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির তোফাজ্জল হোসেন মোস্তফা,বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের মো. তাইফুর রহমান রাহী, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) শাহিনুর আক্তার সুমি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপির মো. হুমায়ূন কবির, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মো. গোলাম আযম এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. সাইফুল আলম। এ আসনে মোট ওয়ার্ড ১২টি আর থানা দুটি।

সম্পর্কিত খবর

;