জনগণ পুরানো বন্দোবস্তের সাথে বস্তাপচা রাজনীতি আর ফিরিয়ে আনতে চায় না

নতুন বাংলাদেশ আমরা দেখতে চাই: আমীরে জামায়াত

প্রকাশ : 08 Feb 2026
নতুন বাংলাদেশ আমরা দেখতে চাই: আমীরে জামায়াত

স্টাফ রিপোর্টার: সারা বাংলাদেশ জেগে উঠেছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, তরুণ যুবকেরা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি জানিয়ে দিয়েছে। পুরানো বন্দোবস্তের সাথে তারা নেই। বস্তাপচা রাজনীতি আর ফিরিয়ে আনতে চায় না। নতুন বাংলাদেশ আমরা দেখতে চাই। 


তিনি বলেন, বাংলাদেশের নতুন রাজনীতি উত্থান আমরা দেখতে চাই। এখন জনগণ আগামী ১২ তারিখ সেই রায় দেবে। জনগণ দুর্নীতিবাজদের লাল কার্ড দেখাবে, জনগণ চাঁদাবাজদেরকে লাল কার্ড দেখাবে। জনগণ দখলদারদেরকে লাল কার্ড দেখাবে, জনগণ আধিপত্যবাদের গোলামদেরকে লাল কার্ড দেখাবে। 


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে আজ রোবাবার ৮ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টায় রাজধানীর মেরুল বাড্ডার ডিআইটি মাঠে ঢাকা-১১ আসনে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আমীরে জামায়াত এসব কথা বলেন। এ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। 


আমীরে জামায়াত বলেন, আবরার ফাহাদ, আবু সাঈদ, হাদি আমরা তোমাদের কাছে এবং তোমাদের বন্ধুদের কাছে বড়ই ঋণী। আমরা কথা দিচ্ছি তোমাদের আকাঙ্ক্ষার নতুন বাংলাদেশ হলে, এ দেশ এবং জনগণের সেবার করার সুযোগ পেলে তোমরা যেমনটা চেয়েছিলে আমরা তেমনটাই যোগ্য এবং দীপ্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলবে ইনশাআল্লাহ।


 তিনি আরও বলেন, এই বাংলাদেশ আমরা যুবকদের হাতে তুলে দিতে চাই। আমরা যুবকদের হাতে বাংলাদেশের দায়িত্ব দিতে চাই। আমরা বেকার ভাতা দিতে চাই না। ২৪-এর যুবকের কোথাও বেকার ভাতা চায় নাই, বেকার ভাতার জন্য স্লোগানও দেয়নি। সেদিন যুবকেরা বলেছিলো আমাদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দাও, আমাদের কাজ দাও। বেকার ভাতার কথাই হচ্ছে যুব সমাজ অপমান করা। আমীরে জামায়াত যুবকদেরকে জিজ্ঞেস, হে যুবকেরা! আপনারা বেকার ভাতা চান? না কাজ চান? সকলেই হাত তুলে বললেন বেকার ভাতা চাই না, আমরা কাজ চাই। যেমন দশ টাকা চাউলের কেজি ছিলো ভুয়া, তেমনি এই কার্ডগুলো হবে সেরকম ভুয়া। এ রকম ভুয়া কার্ডদেরকে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জনগণ লাল কার্ড দেখাবে বলেন তিনি।  


ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ৭১ দেখেছি আর ২৪ আমরা পেয়েছি। ৪৭ যে আকাঙ্ক্ষা ছিলো হুবহু ৭১ সালেও সেই আকাঙ্ক্ষা ছিলো। ২৪  সেই আকাঙ্ক্ষার বিস্ফোড়ণ ঘটেছিলো। ৪৭-এর পরে ২৩ বছর আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। ৭১ পরে ৫২ বছর সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। এখন ৫৪ বছর অতিক্রম হয়ে গেছে। চব্বিশে আমাদের যুবক ও ছাত্রসমাজ বিশাল কোনো দাবি নিয়ে আসেনি। তাদের একটি ন্যায্য ও সাধারণ দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলো। সেটা হলো কোটা সংস্কারের আন্দোলন। কিন্তু অতীতের মতো ফ্যাসিবাদী কায়দায় যুব ও ছাত্র সমাজকে দমানোর চেষ্টা করেছিলো। 


তিনি বলেন, আপনাদের স্মরণ থাকার কথা ১৫ তারিখ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমাদের কলিজার টুকরা মেয়েদের গায়ে যখন হাত তুলেছিলো সারা বাংলাদেশের মানুষ তখন জ্বলে উঠেছিলো। তার পরের দিন ১৬ তারিখ উত্তরবঙ্গের এক সিংহ পুরুষ আমাদের গর্ব, অহংকার বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মেধাবী ছাত্র আবু সাঈদ রাস্তায় নেমে বলেছিলো হয় আমার অধিকার দে না হয় আমাকে গুলি দে।  সে ডানা পেতে বলেছিলো, ‘বুকের ভিতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’। রাস্তায় বীরের মতো দাঁড়িয়েছিলো। এক এক করে তিনটি গুলি করে খুন করা হয়েছে। একটা গুলিও সে পিঠে নেয়নি, তিনটি গুলিই সে বুকে নিয়েছিলো। আমরা তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। একই দিনে আর ৫ জন তাদের সহকর্মী শাহাদাতবরণ করেন। 


আমীরে জায়াত বলেন, আপসোস! আমরা যারা সাড়ে ১৫ বছর আওয়ামী জাহেলিয়াতের যাঁতাকলে পিষ্ঠ ছিলাম। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, আলেম-উলামা, সাংবাদিক বন্ধুগণ, সুশীল সমাজের সদস্য, কৃষক-শ্রমিক যারাই ছিলাম এর মধ্যে একটা অংশ এই মজলুম অবস্থার পরিবর্তন করে তারা রাতারাতি জালেমের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।  যে সমস্ত অপকর্ম করে আওয়ামী লীগ দীর্ঘসময় এই জাতিকে কষ্ট দিয়েছে। একই অপকর্ম একটা অংশ করা শুরু করে দিলো। আমরা বিনয়ের সাথে অনুরোধ করলাম মজলুম ছিলেন জালিম হবেন না। মজলুমের কথা তো বুঝার কথা এখন মানুষকে কষ্ট দিচ্ছেন কেন? আমরা লক্ষ্য করলাম বেপারোয়াভাবে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মামলাবাজি শুরু হয়ে গেলো। এখনও অনেক বড় বড় ব্যবসায়ীরা বলে আমরা যাবো কোথায়? আমাদেরকে জিম্মি করে আমাদের বিরুদ্ধে মার্ডার মামলা দিয়ে এখন আমাদের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা দাবি করা হচ্ছে। দাবি করছে কারা জানেন? এই সাড়ে ১৫ বছর যারা বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়ে অন্য দেশের মাটিতে নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন ফিরে এসে তারাই মামলাবাণিজ্য করে চাঁদা দাবি করছেন।


তিনি আরও বলেন, আগস্টের ৬ তারিখ থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের আজ ৮ ফেব্রুয়ারি  পর্যন্ত তাদের জ্বালায় অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ফুটপাতে বসে যে ভিক্ষুক ভিক্ষা করে তার কাছ থেকে চাঁদা আয়াদ করছে। আমাদের সন্তানদেরকে বুকে নিয়ে জুলাই মাসের এই জন্য কি লড়াই করেছিলাম? প্রশ্ন রাখেন ডা. শফিকুর রহমান।


আমীরে জামায়াত আরও বলেন, আমাদের সন্তানদের দাবি ছিলো ‘উই ওয়ান জাস্টিস’। আমরা ন্যায়বিচার দেখতে চাই এবং শান্তি থাকতে চাই। আপনারা দেখেছেন একটি দল তারা মাঝেমধ্যে বলে তারা ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতির টুটি চেপে ধরবে। এটা ভালো কথা। এই ভালো কাজটা নিজের ঘর থেকে শুরু করেন। ঋণ খেলাপি, ব্যাংক ডাকাতিদেরকে আশ্রয় দিয়ে আপনারা দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়বেন এটা আদৌ সম্ভব না। জনগণ এটা বুঝে।


তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্ট যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আমাদের সন্তানেরা, ভাইয়েরা ও বোনেরা, শিশু-বৃদ্ধ-আবাল-বনিতা রক্ত দিয়েছিলো। ঐ রক্তের ঋণ পরিশোধ করার দিন ১২ ফেব্রুয়ারি। এই রক্তের সাথে যারা বেইমানি করে ইতিহাস তাদেরকে ক্ষমা করবে না। যে দেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ মহান আল্লাহর ইচ্ছায় গড়ে উঠবে। সেই বাংলাদেশে অপকর্ম চলতে দেয়া হবে না। বিচার একেক জনের জন্য একেক রকম হবে না। সাধারণ মানুষ অপরাধ করলে ঐ নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য তার যে শাস্তি হবে দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী অপরাধ করলে তাদের তাদেরকেও ছাড় দিয়ে কথা বলবো না। একইভাবে তাদেকেও বিচারের আওতায় আনা হবে। সেদিনই ন্যায় বিচার কায়েম হবে ইনশাআল্লাহ।  


ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের টাকা লুণ্ঠন করে যারা বিদেশে পাচার করেছেন। তারা কার টাকা বিদেশে পাঠিয়েছে? এটা তাদের টাকা নয়, এটা ১৮ কোটি মানুষের টাকা। রাষ্ট্রের আয়ের খাত তিনটি- ট্যাক্স, বিদেশি অনুদান এবং বিদেশি ঋণ। এই তিনটি মিলিয়ে রাষ্ট্রের তহবিল। আমরা কথা দিচ্ছি যদি ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন বাংলাদেশ হয়, তাহলে নতুন বাংলাদেশের এই প্রাপ্য ষোলআনা আদায় করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবো ইনশাআল্লাহ।


তিনি বলেন, একটি কথা আল্লাহ তায়ালাকে সাক্ষী রেখে বলবো মানুষের জীবন, সম্পদ এবং ইজ্জত এই তিনটি পাহারাদার হবো ইনশাআল্লাহ। যারা এমপি হবে তারা প্রতি বছর তাদের পরিবারের সদস্যসহ পারিবারিক সম্পদের হিসাব জনগণের সামনে দিতে বাধ্য হবে, ইনশাআল্লাহ।  আমাদের দেশে আমাদের মা-বোনদের ইজ্জতের কোনো নিরাপত্তা নেই। ঘরেও নেই, রাস্তায়ও নেই এবং কর্মস্থলেও নেই। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে, ইনশাআল্লাহ। যে জাতি তার মায়েদের সম্মান করতে জানে সেই জাতিকে আল্লাহ তায়ালা সম্মান বাড়িয়ে দিবেন। আর যে জাতি মা-বোন এবং মেয়েদেরকে সম্মান করতে জানে না আল্লাহ তায়ালা তাদের কিভাবে তাদের সম্মানিত করবে? আমরা মা-বোন এবং মেয়েদেরকে নিরাপত্তা এবং সম্মান নিশ্চিত করার চেষ্টা করবো, ইনশাআল্লাহ। 


যুবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, যুবক বন্ধুরা তোমরা তৈরি হয়ে যাও বাংলাদেশের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য। আমরা বিশ্বাস করি যুবকরা  বাংলাদেশকে সঠিক গন্তব্যে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বাংলাদেশের উন্নয়ন কেউ ঠেকাতে পারবে না। এ দেশের মানুষ মেধাবী এবং পরিশ্রমি। অতীতের নেতৃত্বের মধ্যে সততার অভাব ছিলো। তাদের মধ্যে দুর্নীতির হাত বন্ধ রাখার শপথ ছিলো না। দেশের প্রতি দায় ছিলো না। এজন্য বাংলাদেশ আগাতে পারেনি। আমরা আশা করবো যুবকরা আমাদেরকে হতাশ করবে না। 


ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নাহিদ আপনাদের এলাকার সন্তান। আমি মায়ের কাছে মাসির কথা বলতে চাই না। আমার চাইতে নাহিদকে আপনারা ভালো চিনেন। কিন্তু এটা বলতে চাই, ইনসাফের বাংলাদেশের পক্ষে জনগণের রায়, আল্লাহর মেহেরবানীতে যদি অর্জিত হয়- তাহলে সেই সরকার অবশ্যই নাহিদ ইসলামকে আপনারা একজন মন্ত্রী হিসেবে দেখতে পাবেন। আমরা হাতে হাত ধরে একসাথে কাজ করবো। 


এই জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের আমরা মনে করি ৫টি বছরই যথেষ্ট। আমরা এমন কোন আশ্বাস আপনাদেরকে দিবো না যেটা এখানে নেই। যেটা এখানে আছে সেটারই আশ্বাস দেবো। যা বলবো ইনশাআল্লাহ জান-প্রাণ দিয়ে সেটাই করার চেষ্টা করবো। যেভাবে জুলাই এনে দিয়েছে আমাদের সহযোদ্ধারা জান-প্রাণ দিয়ে, সেভাবে আগামীর দায়িত্বও আমরা পালন করবো জান-প্রাণ দিয়ে। 


আসুন, একটা বেইনসাফমুক্ত, জুলুমবাজমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত, দখলবাজমুক্ত, মামলাবাজমুক্ত, আধিপত্যবাদমুক্ত একটা ন্যায় ইনসাফের মানবিক বাংলাদেশ গড়তে আমরা হাতে হাত, কাধে কাধ মিলিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাই- বলেন আমীরে জামায়াত। 

সম্পর্কিত খবর

;