ঈদ উৎসব: আত্মশুদ্ধি কি হলো!

প্রকাশ : 05 May 2022
No Image

।। মুক্তার হোসেন নাহিদ।।
“কেমন কাটলো ঈদ উৎসব?” আনন্দ-উচ্ছ্বাসে নাকি বিষাদের অশ্রুতে!
-ব্যক্তিগত জিজ্ঞাসায় অনেকের উত্তর ‘বেশ ভালোই কেটেছে।’ কিন্তু সামগ্রীক বাস্তবতায় যদি প্রশ্ন করা হয় এক মাসের সিয়াম সাধনার পর ঈদ উৎসবে আত্মশুদ্ধি ও মানবিকতার শিক্ষা কি অর্জিত হলো! উত্তর হলো-‘আনন্দ-বিষাদে বিদায় নিলো ঈদ-উল-ফিতর-২০২২। ফি বছরের মতো এবারো উপেক্ষিত আত্মশুদ্ধি ও মানবিকতার শিক্ষা।
করোনা মহামারীর ভয়াল থাবায় গেল চারটি ঈদে উৎসব-আনন্দ থেকে দেশবাসী বেশ খানিকটা বঞ্চিত ছিল। নানা বিধিনিষেধে প্রিয়জনের সান্নিধ্য ছাড়াই ঈদ পালন করতে হয়েছে। ফলে বিগত চার ঈদে আনন্দ ছিল অনেকটাই নিষ্প্রাণ। সেই কঠিন সময় পেরিয়ে এবারের ঈদে একটা নাড়ীর টানে বাড়ি ফিরে প্রিয়জনের সাথে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারবে-এই ভাবনায় দেশবাসীর মন ছিল উচ্ছ্বাসে ভরপুর। কিন্তু ফি বছর ঈদযাত্রায় ভোগান্তি ও মৃত্যুর মিছিলের কারণে আতঙ্কও কম ছিল না। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্ধ্বগতিতে ঈদ বাজার নিয়েও দুঃশ্চিন্তা ছিল। খেটে খাওয়া দিনমজুর থেকে মধ্যবিত্ত-সকলেই উদ্বিগ্ন ছিলেন ঈদ বাজার নিয়ে। পোশাক থেকে সেমাই-সকল পণ্যের অগ্নিমূল্যে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। তারপরেও মানুষ ঈদ বাজার করেছেন সাধ্যের মধ্যে। সব প্রস্তুতি শেষে সারাদেশ যখন ঈদ উৎসবের অপেক্ষায় তখনো হাওর, তিস্তাপাড়ের মানুষ ও পটুয়াখালির জেলে পল্লীর জেলেদের দিন কেটেছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। ঈদ আনন্দ তো দূরে থাক সংসার চলবে কেমনে-এই চিন্তায় তারা দিশেহারা। অন্যদিকে দেশজুড়ে ঈদের রাত, ঈদের জামাত এবং সড়কে নানা অপ্রীতিকর ঘটনায় আনন্দের মধ্যে বিষাদের ছাপ ছিল এবারো।
সামাজিক সংগঠন জনলোকের পক্ষ থেকে ঈদ শুভেচ্ছা পোস্টারে আমাদের শ্লোগান ছিল ‘আত্মশুদ্ধির শিক্ষায় জাগ্রত হোক মানবতা, উৎসব আনন্দে ফিরুক সাম্য-সমতা’। কিন্তু তা অর্জিত হলো না এবারো। দেশের হাওর অঞ্চলের মানুষের ঈদ আনন্দ উজানের ঢলে ভেসে গিয়েছিল আরো আগেই। ঢলের জল আর চোখের পানিতে একাকার হয়েছিল হাওর জনপদ। মাঠকে মাঠ কাঁচাপাকা ধান চোখের সামনে ডুবে যেতে দেখে কৃষকের আর্তনাদে ভারী হয়েছিল ওই জনপদের আকাশ। সকলে মিলে দিন-রাত প্রাণপণ চেষ্টা করেও তারা স্বপ্নের ফসল রক্ষা করতে পারেন নি। তাই এবারের ঈদে হাওর জনপদে আনন্দের চেয়ে বিষাদের বন্যা বইয়েছে। অন্যদিকে তিস্তায় অকালে পানি আসায় ডুবে যায় তিস্তাপাড়ের ধান, মরিচ, হলুদ, সবজি সহ নানা ফসলের খেত। ঈদের আগে এই ভয়াবহ ক্ষতিতে তারাও ঈদ আনন্দ ভালোভাবে উপভোগ করতে পারে নাই। এছাড়া মাছ ধরতে না পারা এবং দাদনের টাকার চিন্তায় ঈদ আনন্দ ম্লান হয়েছিল উপকূলের জেলে পল্লীতে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এর জন্য কি প্রাকৃতিক দুরাবস্থা দায়ি, নাকি মানুষ! বাস্তবতা বলে মানুষের কারণেই এমন বিপদ আসে বার বার। এদেরকে মানুষ বললে ভুল হবে, আসলে এরা মানুষের খোলস পরে থাকা অমানুষ।
হাওর জনপদ জলে ডুবে যাওয়ার জন্য দায়ি দুর্নীতিবাজ লুটেরা চক্র। যাদের লুটপাটের কারণে নির্মিত দুর্বল বাঁধ ভেঙে ভেসে গেছে ওই জনপদের শত শত একর জমির ধান। ডুবে গেছে হারভাঙা পরিশ্রমে অর্জিত ফসল। বছরের পর বছর এই লুটেরা চক্র লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। কৃষকের ফসল রক্ষায় ফি বছর বাঁধ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু আসলে এ বাঁধ কৃষকের ফসল রক্ষায় নয়, লুটেরা চক্রের টাকার পাহাড় গড়ার জন্যই বোধ নির্মাণ করা হয়। তা না হলে কেন টেকসই বাঁধ হয় না। তাহলে কি বলা যাবে, এরা মানুষ! এদের মধ্যে মানবতা আছে! এরা আত্মশুদ্ধির শিক্ষায় মানবিক মানুষ হচ্ছে! মোটেও না। এসব অমানুষদের কারণে হাওর জনপদের কৃষকের স্বপ্ন ভাঙছে বার বার।
অন্যদিকে তিস্তার পানি সমস্যা দীর্ঘদিনের। প্রতিবেশি দেশ ভারতকে আমরা ফেনী নদীর পানি ব্যবহারের অনুমতি দিলেও তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে পারছি না। এটা রাজনৈতিক সমস্যা। যে সমস্যার কারণে তিস্তাপাড়ের মানুষ হয় খরায় মরে, না হয় অকাল বন্যায়।
আবার পটুয়াখালীর জেলে পল্লীর জেলেরা সংসার চালানোর জন্য অনেক আগেই দাদন নেন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে। কিন্তু সময় মতো মাছ ধরতে না পারায় তারা একদিকে দাদন অন্য দিকে পরিবার নিয়ে ভয়াবহ চিন্তায় দিন পার করছেন। ঈদ সামগ্রী ও পোশাক তো দূরের কথা পেট চালানোর চিন্তাই তাদের মহাচিন্তা। এখানেও সিন্ডিকেট ও দাদন ব্যবসায়ী এবং সিস্টেমের নোংরা খেলা। যা খেলে মানুষ নামের কিছু স্বার্থলোভীরা। যাদের স্বার্থের বলি হচ্ছেন অসহায় জেলেরা।
ঈদ বাজারে পণ্যের দাম আকাশ ছোঁয়া ছিল। পোশাক ছিল অনেকটা মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। বাজারের এই অগ্নিমূল্য কি কারণে! এর জন্য দায়ি মুনাফাখোর ব্যবসায়ী। যাদের মুনাফার নেশায় অসহায় ছিলেন সাধারণ মানুষ। বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশের ব্যবসায়ীরা সারাবছর ব্যবসা করে রমজানে ছাড় দেয়। আর আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা সারা বছর রমজান-ঈদের দিকে মুনাফা লুটের জন্য তাকিয়ে তাকে। ১৫ শ’ টাকার শার্ট বিক্রি করে ২০ হাজার টাকায়। হায়রে দেশ! ব্যবসায়ীদের সাথে সংঘর্ষে প্রাণ হারালেন দুই যুবক। যারা পেটের দায়ে ঢাকায় কর্ম করতেন।
রমজান আত্মশুদ্ধির মাস। সে মাসে কেমন আত্মশুদ্ধির শিক্ষা মানুষ অর্জন করলো যে ঈদের জামাতে ঢুকে প্রকাশ্য গুলি করলো! কুমিল্লায় ঘটেছে এমন ঘটনা। শরিয়তপুরে ঈদের নামাজ পড়াকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জীবন দিতে হলো এক বৃদ্ধকে। ফরিদপুরে আদিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নিহত হলেন দুইজন। সড়কে এবারো ঈদযাত্রায় বহু প্রাণ ঝড়েছে। এসব হয়েছে মানুষের মনুষত্ব হারিয়ে ক্ষমতা ও লোভের কারণে। সড়কে অসুস্থ প্রতিযোগিতা আর অধিক আয়ের নেশায় প্রাণ ঝড়ে। মানুষের মানবিকতা লোপ পাওয়ায় ঈদের দিনেও সংঘর্ষ –গুলি হয়েছে। ঈদের দিন বজ্রপাতে সারাদেশে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। খালি চোখে এটা প্রাকৃতিক কারণ হলেও আসলে এর জন্য দায়ি মানুষ নামের অমানুষ। যারা অপরিকল্পিতভাবে বয়লার, ইটভাটা ও শিল্পকারখানা করে বায়ুমণ্ডলকে দূষিত করছে। ইউকালিপটাস গাছে বাংলাদেশ ছেয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে নির্মল বাতাস। দেশে আকাশে কার্বনডাইঅক্সাইডে ভরা। যারা ফলে প্রতিনিয়ত বজ্রপাত হচ্ছে, যাতে অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন বহু মানুষ।
ফলে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিংসা-বিদ্বেষ ও হানাহানি ভুলে মানুষ সাম্য মৈত্রী ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ থাকার প্রত্যাশা করলেও মানুষ সে পথে নেই। মূল্যবোধ ও নৈতিকতা মানুষের মধ্যে নেই। থাকলে এভাবে দেশটাকে বসবাসের অনুপোযোগী করে তুলতো না। মানুষ হয়ে মানুষকে খুন করতো না। তাই ঈদ যাবে, ঈদ আসবে। কিন্তু মানবিকতা ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা অর্জন না করলে শান্তি, সম্প্রীতি, সাম্য-সমতা আসবে না। তার পরেও আস্থা ও বিশ্বাস রাখি মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা আসবেই। পুঁজিবাদী চক্রের খপ্পর থেকে এদেশ একদিন মুক্ত হবেই। সে প্রত্যাশায় সকলকে ঈদের শুভেচ্ছা।
-লেখকঃ সদস্য, কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি, জনলোক।

সম্পর্কিত খবর

;