২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ: সবুজ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার

প্রকাশ : 22 May 2026
২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ: সবুজ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার

মোঃ খালিদ হাসান:


বাংলাদেশের সামনে জলবায়ু পরিবর্তন এখন শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, এটি অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের প্রশ্ন। তাপদাহ, বায়ুদূষণ, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, পাহাড়ধস ও বন উজাড়ের মতো বহুমাত্রিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে দেশে বৃহৎ পরিসরে সবুজায়নের দাবি দীর্ঘদিনের। এই বাস্তবতায় নির্বাচনী ইশতেহারে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের ঘোষণা দিয়েছে বর্তমান সরকার। শুধু গাছ লাগানো নয়, এই কর্মসূচিকে “সবুজ বিপ্লব”, “সবুজ কর্মসংস্থান” এবং “প্রজন্মভিত্তিক পরিবেশ আন্দোলন” হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।


দেশে বনভূমি ও বৃক্ষ আচ্ছাদনের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমছে। বন অধিদপ্তরের সর্বশেষ বন সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০১৫ সালে দেশে বন আচ্ছাদনের হার ছিল ১২ দশমিক ৭৬ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে নেমে এসেছে ১২ দশমিক ১১ শতাংশে। একই সময়ে প্রায় ১ লাখ হেক্টর বনভূমি হারিয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে দেশে বনভূমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টরে, যা এক দশক আগেও ছিল ১৮ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর।


সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থা পার্বত্য অঞ্চলে। শুধু রাঙামাটিতেই গত এক দশকে প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর বনভূমি কমেছে। উন্নয়ন প্রকল্প, অবৈধ দখল, পাহাড় কাটা ও নির্বিচারে গাছ নিধনের ফলে দেশের প্রাকৃতিক বনগুলো ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। চট্টগ্রামের চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, কক্সবাজারের মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যান ও ফাসিয়াখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের ভেতর দিয়ে রেললাইন নির্মাণের কারণে কাটা পড়েছে প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার গাছ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাতির চলাচলের করিডরও।


            রিভার অ্যান্ড ডেলটা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে দেশে প্রায় ১৩ লাখ গাছ কাটা হয়েছে। ফলে নতুন বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুধু পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ নয়; এটি বন উজাড়ের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ারও একটি প্রচেষ্টা। ২৫ কোটি গাছ রোপণের লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রায় ১৫০০ কোটি টাকার একটি বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিচ্ছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। বন অধিদপ্তর ইতোমধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মসূচির যাত্রা শুরু হবে। এই কর্মসূচি তিন ধাপে বাস্তবায়িত হবে। প্রথম ধাপে ২০২৬ সালে ১ কোটি ৫০ লাখ গাছ লাগানো হবে। দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭-২০২৮ সালে লাগানো হবে ১৩ কোটি ৫০ লাখ গাছ। তৃতীয় ধাপে ২০২৯-২০৩০ সালের মধ্যে আরও ১০ কোটি গাছ রোপণ করা হবে। সরকারের পরিকল্পনায় শুধু বৃক্ষরোপণ নয়, গাছের পরিচর্যা, বেঁচে থাকার হার এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। এজন্য চালু করা হবে ডিজিটাল “মাই ট্রি মনিটরিং” অ্যাপ, যার মাধ্যমে প্রতিটি গাছের অবস্থান, বৃদ্ধি ও পরিচর্যা পর্যবেক্ষণ করা হবে।


দেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য বিবেচনায় বৃক্ষরোপণ পরিকল্পনাকে ছয়টি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় অংশ অর্থাৎ ১০ কোটি গাছ লাগানো হবে উপকূলীয় অঞ্চলে। নতুন জেগে ওঠা চর, অবক্ষয়িত উপকূলীয় বন ও মেঘনা মোহনার দ্বীপাঞ্চলে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলাই এর লক্ষ্য। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি বাড়ায় উপকূলীয় বনায়নকে প্রতিরক্ষা দেয়াল হিসেবেও দেখা হচ্ছে। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট ও মধ্যাঞ্চলের অবক্ষয়িত শালবন পুনরুদ্ধারে লাগানো হবে ৫ কোটি গাছ। পাহাড়ি এলাকায় এই বনায়নের লক্ষ্য হবে পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি, ভূমিধস রোধ এবং জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা। নগর অঞ্চলে বায়ুদূষণ ও তাপমাত্রা কমাতে লাগানো হবে ১ কোটি ২৫ লাখ গাছ। পার্ক, ফুটপাত, খেলার মাঠ এবং সড়কের পাশে বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি ভবন নির্মাণে বাধ্যতামূলক “সবুজ পরিমাপক” মানদণ্ড ও “গ্রীণ বিল্ডিং সার্টিফিকেশন” চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এ ছাড়া রাস্তার ধারে, রেলপথের পাশে, খালের পাড়ে ও নদীতীরে কমিউনিটিভিত্তিক বনায়নে লাগানো হবে ৩ কোটি ৭৫ লাখ গাছ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস ও বসতবাড়িকেন্দ্রিক কৃষি ও সামাজিক বনায়নের আওতায় লাগানো হবে আরও ৩ কোটি ৭৫ লাখ গাছ।


প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর “ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি” কর্মসূচির আওতায় আগামী পাঁচ বছরে ৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ শিক্ষার্থী রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে প্রতি বছর প্রায় ৮০ লাখ গাছ এবং বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আরও ২০ লাখ গাছ লাগানো হবে। ফলে বছরে মোট ১ কোটি করে পাঁচ বছরে ৫ কোটি গাছ রোপণ সম্ভব হবে।





প্রতিটি শিক্ষার্থীকে একটি করে চারা দেওয়া হবে এবং গাছের পরিচর্যার জন্য বছরে ৫০০ টাকা প্রণোদনা দেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে। শুধু গাছ লাগানো নয়, বৃক্ষ পরিচর্যা ও পরিবেশ সচেতনতাকে পাঠক্রমের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শ্রেষ্ঠ সবুজ বিদ্যালয় নির্বাচন, আলোচনা সভা, প্রদর্শনী ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব প্রজন্ম গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, সরকার বৃক্ষরোপণকে কেবল পরিবেশ কর্মসূচি হিসেবে নয়, সামাজিক ও প্রজন্মভিত্তিক আন্দোলন হিসেবেও দেখতে চায়।


নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ৩ লাখ ৫০ হাজারের বেশি সবুজ কর্মসংস্থান তৈরি হবে। পাশাপাশি ১০ হাজার নতুন নার্সারি উদ্যোক্তা তৈরি করে আরও আড়াই লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নার্সারি শিল্প, ফলজ ও বনজ গাছের চারা উৎপাদন, পরিচর্যা, পরিবহন ও বনায়নভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে নারী ও তরুণদের জন্য এটি হতে পারে পরিবেশভিত্তিক বিকল্প কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র। বৃক্ষরোপণকে বিজ্ঞানভিত্তিক করতে সরকার জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম (জিআইএস) ব্যবহার করে “জমি তালিকা মানচিত্র” তৈরির পরিকল্পনা করেছে। এর মাধ্যমে কোন অঞ্চলে কোন ধরনের গাছ লাগানো উপযোগী হবে, তা নির্ধারণ করা হবে।


চরাঞ্চল ও দ্বীপ এলাকায় বিশেষায়িত ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে বীজ ছড়িয়ে দ্রুত বনায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর এই উদ্যোগ সফল হলে বাংলাদেশে আধুনিক বন ব্যবস্থাপনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। বৈশ্বিক জলবায়ু রাজনীতিতে “কার্বন ক্রেডিট” এখন একটি বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কার্বন নিঃসরণ কমাতে পারলে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত কার্বন ক্রেডিট আয় করতে পারে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকার জ্বালানি, কৃষি ও বর্জ্য খাতে “মেজারমেন্ট, রিপোর্টিং অ্যান্ড ভেরিফিকেশন (এমআরভি)” ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি গড়ে তোলা হবে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কার্বন ট্রেডিং মার্কেট।


বাংলাদেশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সবচেয়ে বড় সমস্যা সবসময়ই ছিল রক্ষণাবেক্ষণ। অনেক সময় বিপুলসংখ্যক গাছ লাগানো হলেও কয়েক মাস পর তার বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু চারা রোপণের সংখ্যা নয়, কত গাছ টিকে থাকছে—সেই বিষয়টিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো উন্নয়ন প্রকল্প ও বন সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। একদিকে নতুন গাছ লাগানো হবে, অন্যদিকে উন্নয়নের নামে যদি পুরোনো বন কাটা চলতেই থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। এই বাস্তবতায় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি শুধু একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার নয়; এটি পরিবেশ, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষার দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।


তবে এই কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করবে পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, বৈজ্ঞানিক বাস্তবায়ন এবং সবচেয়ে বড় কথা—গাছের বেঁচে থাকার ওপর। যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন সম্ভব হয়, তাহলে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ সত্যিই একটি নতুন “সবুজ অভিযাত্রা”-র পথে এগোতে পারে।


#


-লেখক: সহকারী তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর। 


পিআইডি ফিচার

সম্পর্কিত খবর

;