কোরবানির পশুর চামড়ার প্রত্যাশিত দাম না পেয়ে হতাশ মৌসুমী ব্যবসায়ীরা

প্রকাশ : 28 May 2026
কোরবানির পশুর চামড়ার প্রত্যাশিত দাম না পেয়ে হতাশ মৌসুমী ব্যবসায়ীরা

স্টাফ রিপোর্টার: যথাযোগ্য মর্যাদায় পবিত্র ঈদুল আযহা উদযাপিত হলেও কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নিয়ে চরম হতাশায় পড়েছেন রাজধানীসহ সারাদেশের মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে অনেক কম দামে চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ খুচরা সংগ্রহকারী ও পাইকারি ব্যাপারীদের। ঐতিহ্যবাহী চামড়ার আড়ত পোস্তাসহ ঢাকা ও ঢাকার বাইরের আড়তগুলোতেও বেচাকেনা প্রায় স্থবির।


বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালের জন্য কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। এ বছর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ঢাকায় ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। খাসির চামড়া ২৫-৩০ টাকা এবং বকরির চামড়া ২২-২৫ টাকা প্রতি বর্গফুট। গত বছরের তুলনায় গরুর চামড়ায় প্রতি বর্গফুটে ২ টাকা এবং খাসির চামড়ায় ৩ টাকা বাড়ানো হয়েছে। সরকারি হিসেবে মাঝারি আকারের ১৬-২০ বর্গফুটের একটি গরুর চামড়া ঢাকার ভেতরে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩৪০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৯০০ থেকে ১ হাজার ২৪০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। বড় আকারের ২১-২৫ বর্গফুট চামড়ার দাম ঢাকায় ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৬৭৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫৫০ টাকা হওয়ার কথা।


কিন্তু মাঠের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। রাজধানীর কলাবাগান, সায়েন্স ল্যাব, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, মাঝারি আকারের কাঁচা চামড়া বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫০০-৬৫০ টাকায়। বড় আকারের চামড়াও ৭০০-৮০০ টাকার বেশি দাম উঠছে না। ছাগলের চামড়া প্রতি পিস বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫-১০ টাকায়। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, একজন বিক্রেতা রাস্তায় ঘোষণা দিচ্ছেন “কোরবানির গরুর চামড়া ২০০ টাকা পিস”। ক্যাপশনে বলা হয়েছে ১৫০-২৫০ টাকায় চামড়া বিক্রি হচ্ছে।


খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, গত বছর একই মানের চামড়া ৮০০-৯০০ টাকায় বিক্রি হলেও এবার ৬৫০ টাকার ওপরে কেউ দাম বলছেন না। আট বছর ধরে মৌসুমী চামড়া ব্যবসা করেন ফারুক হোসেন। কলাবাগান থেকে ১৫ পিস চামড়া নিয়ে ল্যাবএইড হাসপাতালের সামনে এলে ব্যাপারী রুবেল প্রতি পিস ৬৫০ টাকা দাম বলেন। ফারুক ১ হাজার টাকা চাইলেও দরকষাকষিতে ৮০০ টাকায়ও বিক্রি করতে পারেননি।


পাইকারি ব্যাপারীদেরও একই দশা। রাজধানীর কলাবাগানে চামড়া কিনে ট্যানারিতে সরবরাহ করেন ফরিয়া মো. শাহজাহান। ঈদের দিন বেলা ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত তিনি ৫৫ পিস চামড়া কিনেছেন গড়ে ৬৫০ টাকা করে। তিনি জানান, লবণ ও শ্রমিকের মজুরি বাবদ প্রতি চামড়ায় গড়ে ৩৫০ টাকা খরচ হয়। সে হিসাবে ঢাকায় মাঝারি আকারের কাঁচা চামড়া ৯৫০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অর্ধেক দামও মিলছে না।


শুধু ঢাকা নয়, ঢাকার বাইরেও দাম আরও কম। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালের মৌসুমী ব্যবসায়ীরা জানান, আড়তদাররা চামড়া নিতে চাইছেন না। সরকারি দরে ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট ৫৭-৬২ টাকা হলেও মাঠে কাঁচা চামড়া ৪০০-৫০০ টাকায় নেমে এসেছে। আড়তদারদের অভিযোগ, ট্যানারি মালিকরা বলছেন তাদের কাছে গত বছরের মজুত রয়ে গেছে এবং রপ্তানি আদেশ কম। আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা কম এবং এলসি জটিলতার কারণে রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ট্যানারিগুলো কম দামে চামড়া কিনছে।


মৌসুমী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বড় আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে দাম কমে গেছে। সরকারি দর মানা হচ্ছে না। কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে লবণ ও শ্রমিক বাবদ ৩৫০ টাকা খরচ হওয়ায় আড়তদাররা ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।


চামড়া যেন নষ্ট না হয় সেজন্য সরকার এবার ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার লবণ বিনামূল্যে সরবরাহ করছে। বিসিকের মাধ্যমে জেলা-উপজেলায় লবণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া মসজিদ-মাদ্রাসা ও সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, আগামী কোরবানির ঈদে আমাদের কোনো চামড়া যেন নষ্ট না হয়, সে জন্য আমরা বদ্ধপরিকর।


তবে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু লবণ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। সরকারকে মনিটরিং জোরদার করে আড়ত ও ট্যানারি পর্যায়ে সরকারি দর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। নইলে এতিমখানা-মাদ্রাসাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কারণ কোরবানির চামড়ার টাকা তাদের আয়ের বড় উৎস। চামড়া শিল্পকে বাঁচাতে সরকারি দর কার্যকর করা এবং পাচার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

সম্পর্কিত খবর

;