স্টাফ রিপোর্টার: ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগারে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের সুযোগে পালিয়ে যাওয়া ২ হাজার ২৪৭ বন্দীর মধ্যে এখনো ৬৯০ জন পলাতক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে নরসিংদী কারাগার থেকে পালানো ১৬৬ বন্দীর পরিচয়-সংক্রান্ত কোনো তথ্য এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) পুরান ঢাকার বকশীবাজার-সংলগ্ন উমেশ দত্ত রোডে কারা অধিদপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন।
কারা মহাপরিদর্শক জানান, নরসিংদী কারাগারে হামলা ও অগ্নিসংযোগের সময় কারাগারের সার্ভার, ডাটাবেজ ও নথিপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখান থেকে পালানো ১৬৬ বন্দীর পরিচয় শনাক্ত করতে জটিলতা তৈরি হয়েছে। তাঁদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য আদালতের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়ার চেষ্টা চলছে। অন্য পলাতক বন্দীদের পরিচয় ও তথ্য পাওয়া গেছে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। পলাতকদের মধ্যে তিনজন জঙ্গি রয়েছেন বলেও জানান তিনি।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নরসিংদী কারাগার থেকে ওই সময় মোট ৮২৬ বন্দী পালিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে বড় একটি অংশকে পরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ১৬৬ জনের তথ্য-উপাত্ত না থাকায় তাঁদের শনাক্তকরণ ও গ্রেপ্তার কার্যক্রমে বাড়তি জটিলতা তৈরি হয়েছে।
কারাগারে অবৈধ মুঠোফোনের ব্যবহার নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে তথ্য দেন আইজি প্রিজন। তিনি বলেন, গত এক বছরে দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে তিন হাজারের বেশি অবৈধ মুঠোফোন জব্দ করা হয়েছে। অবৈধভাবে কারাগারে মুঠোফোন প্রবেশ করানোর সঙ্গে কোনো কারারক্ষী বা অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ সময়ে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে এক হাজারের বেশি কারারক্ষীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কারাগারে মাদক প্রবেশ ঠেকাতেও কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন তিনি। বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার বন্দী মাদকসংক্রান্ত মামলায় কারাগারে রয়েছেন। তাঁদের বড় একটি অংশ মাদকাসক্ত হওয়ায় মাদক না পেলে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, কেউ সহিংস আচরণ করছেন, আবার কেউ কারা কর্তৃপক্ষের নির্দেশনাও মানছেন না বলে জানান আইজি প্রিজন।
মাদকসংক্রান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফেনী-২ ও কিশোরগঞ্জে দুটি মাদক বিশেষ কারাগার চালু করা হয়েছে। সম্প্রতি কাশিমপুরের একটি কারাগারকেও মাদক বিশেষ কারাগার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এসব কারাগারে মাদকসংক্রান্ত মামলার বন্দীদের রেখে তাঁদের জন্য শারীরিক ব্যায়াম, কাউন্সেলিং, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলাসহ আলাদা রুটিন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
মাদক ও আর্থিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণের কথা জানিয়ে আইজি প্রিজন বলেন, গত দুই বছরে মাদকসংক্রান্ত অপরাধের কারণে ২১ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর এবং ৮২ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এ ছাড়া ৮৭০ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে এবং ছোটখাটো অপরাধের কারণে ৩০৩ জনকে বিভিন্ন বিভাগ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো কারারক্ষী মাদকসংক্রান্ত অপরাধে জড়িত হলে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
কারাগারের বিভিন্ন অভিযোগ ও অনিয়মের বিষয়ে আইজি প্রিজন বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি প্রায় ৬০টি কারাগার পরিদর্শন করেছেন। এসব সফরে জেল সুপারদের উপস্থিতির বাইরে বন্দীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার চেষ্টা করেছেন। বন্দীদের খাবার, ক্যানটিন ও অন্যান্য সুবিধা নিয়েও নিয়মিত নজরদারি করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বর্তমানে প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ হাজার বন্দী কারাগারের সরবরাহ করা খাবার গ্রহণ করছেন। আগে বাইরে থেকে রান্না করা খাবার বা বাসা থেকে খাবার কারাগারে নেওয়ার অভিযোগ থাকলেও বর্তমানে দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া তা বন্ধ রয়েছে বলে জানান আইজি প্রিজন। ক্যানটিনে অতিরিক্ত দামের অভিযোগ ঠেকাতে কেন্দ্রীয়ভাবে দাম পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং নির্ধারিত পণ্যের দাম বড় অক্ষরে টাঙানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ক্যানটিনের লেনদেনে ক্যাশলেস ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এ ব্যবস্থায় বন্দীরা আরএফআইডি ও আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে টাকা উত্তোলন ও কেনাকাটা করতে পারবেন। এতে প্রতিটি লেনদেনের রেকর্ড সংরক্ষিত থাকবে। মুন্সিগঞ্জে এরই মধ্যে ব্যবস্থা চালু হয়েছে এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারেও এটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
কারাগারে বর্তমানে বন্দীর সংখ্যাও বেড়েছে। আইজি প্রিজনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগে গড়ে প্রায় ৮০ হাজার বন্দী নিয়ে কারাগার পরিচালিত হলেও বর্তমানে বিভিন্ন কারাগারে প্রায় ৯৮ হাজার বন্দী রয়েছেন। গত সোমবার এক দিনেই ২ হাজার ৭৯৬ জন বন্দী কারাগারে প্রবেশ করেছেন এবং ৩ হাজার ৪৯ জন মুক্তি পেয়েছেন। গত ১ জুন থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ২৬ হাজারের বেশি আসামি বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে এসেছেন।
কারাগারের চিকিৎসাব্যবস্থায় জনবল সংকটের কথাও সংবাদ সম্মেলনে উঠে এসেছে। কারাগারে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ১৫১টি হলেও বর্তমানে মাত্র দুজন চিকিৎসক পদায়িত আছেন। বিভিন্ন কারাগারে সিভিল সার্জনের মাধ্যমে অস্থায়ী ভিত্তিতে ১০১ জন চিকিৎসক কাজ করছেন। চিকিৎসকের ঘাটতি পূরণে ফার্মাসিস্ট ও ডিপ্লোমা নার্সদের ওপরও নির্ভর করতে হচ্ছে। সম্প্রতি ৫৫ জন নার্সকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানান আইজি প্রিজন।
কারাগারে মৃত্যুর পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কারাগারে ১৮৬ বা ১৮৭ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ১২২ জনের মৃত্যুর তালিকা রয়েছে। বর্তমানে ১২২ জন বন্দী কারাগারের বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। গত সাত মাসে ৫৬ হাজার বন্দীকে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
আইজি প্রিজন বলেন, কোনো বন্দী অসুস্থ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। গভীর রাতে জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশ স্কোয়াড পাওয়া না গেলে কারা বিভাগের নিজস্ব স্কোয়াড দিয়েও বন্দীদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে অ্যাম্বুলেন্সের স্বল্পতার কারণে কখনো কখনো হাসপাতালে নেওয়ার পথেই বন্দীর মৃত্যু ঘটে।
কারাগারে বন্দীর মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করা হয় এবং প্রয়োজন হলে ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে তা নথিবদ্ধ করা হয় বলে জানান তিনি। হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সময় লাগার দুটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান আইজি প্রিজন।
কারা ব্যবস্থাপনায় অবকাঠামোগত সংস্কারের কথাও তুলে ধরেন তিনি। নতুন কারাগারগুলোতে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) স্থাপন নিশ্চিত করা হচ্ছে। পুরোনো কিছু কারাগারে এসটিপি থাকলেও সেগুলো সচল নয়। এসব প্ল্যান্ট পুনরায় চালু করতে স্থানীয় একটি কোম্পানি ও একটি কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ চলছে। পুরোনো অনেক কারাগার আশপাশের এলাকার তুলনায় নিচু হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির সময় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়; সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে এসব কারাগারের উচ্চতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানান তিনি।
দেশের কারা ব্যবস্থাকে সংশোধন ও পুনর্বাসনমুখী করার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন আইজি প্রিজন। গত পাঁচ বছরে প্রায় আড়াই লাখ বন্দীকে ৩৯টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের অনেকে সেলাই মেশিন, কম্পিউটার সরঞ্জাম ও অটোরিকশাসহ বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে কারাগার থেকে বের হয়েছেন, যাতে মুক্তির পর কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারেন।
কারাগারের উৎপাদনমুখী কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নারায়ণগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জে দুটি স্বয়ংসম্পূর্ণ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং লাইন রয়েছে। সেখানে কারাগারের নিজস্ব পোশাকসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরি হচ্ছে। সাবান তৈরির স্বয়ংক্রিয় কারখানাও চালু করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয় ওয়াটার বটলিং কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া গত দুই বছরে কারা ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয়ে ৩০০টির বেশি নীতিপত্র তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক। স্বাস্থ্য, পোশাক, বন্দী ব্যবস্থাপনা, টেলিফোন কল ও সংবাদপত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে এসব নীতিপত্রে করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ জেলের নাম পরিবর্তন করে ‘কাস্টডিয়াল অ্যান্ড কারেকশন সার্ভিস বাংলাদেশ’ করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
কারা মহাপরিদর্শকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ৩৭৯ জন বিদেশি বন্দী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সাজা শেষ করে নিজ দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন ১৭০ জন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস, বিভিন্ন সংস্থা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া শত শত বন্দী এখনো শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের বাইরে থাকায় বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে। বিশেষ করে নরসিংদী কারাগার থেকে পালানো ১৬৬ বন্দীর পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্য না থাকায় তাঁদের শনাক্ত করতে আদালত ও অন্যান্য উৎসের তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, পলাতকদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও গ্রেপ্তারের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ গবেষণা নীতিমালা (সংশোধিত)-২০২৬-এর গবেষণা কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।কমিটির সভাপতি সাঈদ আল নোমান এমপি স ...
স্টাফ রিপোর্টার: তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, সমাজ ও রাষ্ট্রে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা না গেলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিজ্ঞান ও ইতিহাসের শিক্ষা থেকে আমরা দেখতে পাই, সমতা ...
স্টাফ রিপোর্টার: দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে আবারও ভোটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ২০ আগস্ট অনুষ্ঠেয় ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বৈধ প্রার্থীদের কেউ মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করায় এবার সংসদে সরাস ...
স্টাফ রিপোর্টার: শিশু, নারী, যুব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন, অধিকার ও ক্ষমতায়নে কাজের মধ্য দিয়ে ৩০ বছর পূর্ণ করেছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা গুড নেইবারস বাংলাদেশ (জিএনবি)। সংস্থাটি ‘ক্ষমতায়ন, উদ্ভা ...
সব মন্তব্য
No Comments