৬ দফা দাবিতে শাহবাগে “বিক্ষোভ সমাবেশ”

প্রকাশ : 18 Aug 2026
৬ দফা দাবিতে শাহবাগে “বিক্ষোভ সমাবেশ”

স্টাফ রিপোর্টার: গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট সমাধান, রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা ও জ্বালানি খাতের বেসরকারিকরণ বন্ধ, ওষুধের সরকারি মূল্য নিয়ন্ত্রণ কার্যকর এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি বাতিলসহ ছয় দফা দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে।


মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৪টায় শাহবাগ মোড়ে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি ও বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের সমন্বয়ক সালমান সিদ্দিকীর সঞ্চালনায় এতে বক্তব্য দেন চিকিৎসক ডা. হারুন অর রশিদ, গবেষক ও শিক্ষক মাহা মির্জা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা।


সমাবেশে সংহতি জানিয়ে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, ফাহমিদুল হক, চলচ্চিত্র নির্মাতা আকরাম খান, সংগীতশিল্পী অরূপ রাহী, বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্ত, এনপিএর নেতা বাকি বিল্লাহ, অনিক রায়, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের ঢাকা মহানগর সম্পাদক ইকবাল কবীর, বাসদ (মার্কসবাদী)-এর সমন্বয়ক মাসুদ রানা, লেখক ও গবেষক মাহতাবউদ্দীন আহমেদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ছাত্র সংগঠনের নেতারা।


সমাবেশে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়িত হলে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে একটি প্রদর্শনীও করা হয়। বক্তারা অভিযোগ করেন, চুক্তিটি কার্যকর হলে কৃষি, পোলট্রি, ওষুধ, জ্বালানি ও দেশীয় শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এর আগে বিভিন্ন আলোচনাতেও অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ চুক্তিটির দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।


ডা. হারুন অর রশিদ বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ ধরনের জেনেরিক ওষুধ রয়েছে। কিন্তু ১৯৯৪ সালের একটি আদেশের কারণে সরকার মাত্র ১১৭টি ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ফলে বাকি ওষুধগুলোর দাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মতো নির্ধারণ করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।


তিনি বলেন, এর ফলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ রোগীকেই বহন করতে হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারছেন না। ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর এর চাপ আরও বাড়বে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।


মাহা মির্জা বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই আগের সরকারের বিভিন্ন নীতির ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, দেশের গ্যাস-জ্বালানি অনুসন্ধানে দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে যথাযথভাবে কাজে না লাগিয়ে বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হচ্ছে।


তিনি বলেন, গ্যাসের সংকটে দেশের বিভিন্ন স্থানে কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। একই সঙ্গে ছোট উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের জীবিকা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপের পরিবর্তে তাঁদের পুঁজি ও ব্যবসা ধ্বংস করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সরকারকে প্রশ্ন করলে আগের সরকারের সময় কী হয়েছে, সেটি সামনে আনা হচ্ছে। কিন্তু বর্তমান সংকট সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।


বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, এতে শুরুতে সরবরাহের উৎস বাড়তে পারে। কিন্তু কয়েকটি বড় কোম্পানি যদি বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে ভবিষ্যতে তারা বাজারে প্রভাব বিস্তার করে একসঙ্গে দাম বাড়ানোর সুযোগ পেতে পারে। চিনি ও এলপিজি বাজারের অভিজ্ঞতা থেকে এ ধরনের ঝুঁকি রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।


তিনি বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের প্রধান দায়িত্ব জনস্বার্থ ও দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। প্রয়োজনে এসব প্রতিষ্ঠান লোকসান দিয়েও সরবরাহ অব্যাহত রাখতে পারে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই ধরনের জনস্বার্থের দায় নিশ্চিত না করে বাজারের বড় অংশ তাদের হাতে তুলে দিলে তা সাধারণ মানুষের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।


সমাবেশের সভাপতি অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের স্বার্থ রক্ষায় যথাযথ ভূমিকা পালন করছে না। তাঁর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি জনস্বার্থবিরোধী এবং এটি বাস্তবায়িত হলে দেশের বিভিন্ন খাত সংকটে পড়তে পারে।


তিনি বলেন, পোলট্রি, কৃষি ও ওষুধ শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তিকে এর আগেও তিনি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের পরিপন্থি বলে মন্তব্য করেছেন এবং চুক্তির শর্তে বাংলাদেশের স্বাধীন বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।


জ্বালানি খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে আনু মুহাম্মদ বলেন, দেশের জ্বালানি খাত নিয়ে জনস্বার্থবিরোধী তৎপরতা আগের মতোই চলছে। একই সঙ্গে ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগেরও বিরোধিতা করেন তিনি।


তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসে জনগণের স্বার্থে অনেক কাজ করার সুযোগ ছিল। কিন্তু জনবান্ধব কাজে সরকার যথাযথ উদ্যোগ নিচ্ছে না। সরকারের দৃষ্টি মাফিয়া ও বড় ব্যবসায়ীদের স্বার্থের পরিবর্তে জনগণের দিকে ফেরানো প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।


বক্তারা বলেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প ও জ্বালানি খাতের বেসরকারিকরণ বন্ধ, ওষুধের দাম সরকারি নিয়ন্ত্রণে কার্যকরভাবে আনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি বাতিলসহ ছয় দফা দাবি বাস্তবায়নে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে জনস্বার্থবিরোধী নীতি থেকে সরে এসে দেশের শিল্প, কৃষি, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা।


সমাবেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।

সম্পর্কিত খবর

;