সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতেে সেক্রেটারি জেনারেল

‘ছয় মাসে বিএনপি সরকার ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটছে’

প্রকাশ : 18 Aug 2026
‘ছয় মাসে বিএনপি সরকার ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটছে’

স্টাফ রিপোর্টার: বিএনপি সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রমের মূল্যায়ন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ব্যর্থতার চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাঁর অভিযোগ, বিএনপি সরকারও ফ্যাসিবাদী আমলের পথেই হাঁটছে।


মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকেল ৪টায় রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে ‘বিএনপি সরকারের ৬ মাসের মূল্যায়ন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।


গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাই সনদের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু গণভোটের রায় সরকার কার্যকর না করে প্রত্যাখ্যান করেছে। এটিকে সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা দাবি করে তিনি বলেন, গণভোট নিয়ে সরকারের এমন অবস্থানে জাতি ও বিশ্ব বিস্মিত।


বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন জামায়াতের এই নেতা। তাঁর দাবি, জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে এবং প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন। সমস্যা সমাধানে বিরোধী দল সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিলেও সরকার তা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি।


শিক্ষা ও প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে গোলাম পরওয়ার বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় বিবেচনায় লোক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগের অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব না দিয়ে প্রশাসনের দায়িত্বে দলীয় লোকজনকে বসানো হচ্ছে।


সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রেও দলীয়করণের অভিযোগ করেন তিনি। গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারি চাকরিতে যোগ্যতা, মেধা, পরীক্ষা ও ভাইভার চেয়ে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততাই যেন যোগ্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি অফিসগুলো বিএনপির নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।


শিক্ষাঙ্গনের পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি বলেন, ক্যাম্পাসগুলোতে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যদের বিরুদ্ধে ছাত্রদলকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি দাবি করেন, এর ফলে শিক্ষাঙ্গনে নৈরাজ্য ও সহিংসতা বাড়ছে।


অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক তুলে ধরে গোলাম পরওয়ার বলেন, গত ছয় মাসে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট ও খেলাপি ঋণ, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, রাজস্ব ঘাটতি এবং ব্যাংকনির্ভর ঋণ গ্রহণের মতো সংকট অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ডলারের বিনিময় হার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পণ্যের দামের অস্থিরতার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।


বিদেশি বিনিয়োগ ও রপ্তানি কমছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তলানিতে নেমেছে বলেও দাবি করেন গোলাম পরওয়ার। তাঁর অভিযোগ, চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্যের দাম কমছে না।


তিনি বলেন, দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতাও কমেছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।


এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখার উদ্যোগেরও সমালোচনা করেন গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, চাকরিবিধি মেনে রাজনীতি করা প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনীতি করতে না দেওয়ার কোনো আইন বা বিধি করা হলে তা সংবিধানবিরোধী হবে।


বিরোধীদলের সংসদ সদস্যদের এলাকায় সরকারদলীয় সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিদের তদারকির দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। তাঁর দাবি, জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিরোধীদলের এমপিদের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। তাঁদের নির্বাচনী এলাকায় অন্য এমপিদের হস্তক্ষেপ সংবিধানবিরোধী এবং নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের অধিকারে হস্তক্ষেপের শামিল।


জনপ্রশাসনে দলীয় বৈষম্যের অভিযোগ তুলে গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের মতাদর্শের অনুসারী নন—এমন সৎ কর্মকর্তাদের ওএসডি করা, পদোন্নতি না দেওয়া ও অহেতুক বদলি করা হচ্ছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগপন্থী কর্মকর্তাদের সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পদায়ন ও পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।


সরকারের ইতিবাচক দিক হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করলেও এর কৃতিত্ব সরকারকে দিতে নারাজ গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে মূল অবদান প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের। প্রবাসীরা রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন বলেই রিজার্ভে স্থিতিশীলতা এসেছে বলে দাবি করেন তিনি।


তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী সরকারকে ব্যর্থ দেখতে চায় না। জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিরোধী দল সংসদে ও রাজপথে সোচ্চার থাকবে। তবে তাঁরা হরতাল, জ্বালাও-পোড়াওয়ের মতো কর্মসূচির পথে হাঁটছেন না এবং সংসদ ও সংসদের বাইরে দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে চান।


গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করার জন্য সরকারকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন গোলাম পরওয়ার। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি অভিযোগ করেন, কিছু গণমাধ্যম তোষণনীতির মধ্যে রয়েছে এবং স্বাধীনভাবে সত্য তুলে ধরতে পারছে না। তাঁর প্রত্যাশা, গণমাধ্যম জনগণের সামনে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরবে।


বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগ তুলে জামায়াতের এই নেতা বলেন, সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর তাঁদের ছয়জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। এমপিদের ওপরও সরকারি দলের নেতাকর্মীরা হামলা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। হেলমেট পরে হামলার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী কায়দা অনুসরণ করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।


গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াতে ইসলামী কোনো ধরনের রাজনৈতিক সংঘাত চায় না। তাঁরা দেশকে শান্তির দিকে নিতে চান। এ কারণে নেতাকর্মীদের ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, আবদুর রব, অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপিসহ দলটির কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সম্পর্কিত খবর

;