ভালো আইন আনার কথা বলে সরকার উল্টো পথে হাঁটছে

প্রকাশ : 18 Aug 2026
ভালো আইন আনার কথা বলে সরকার উল্টো পথে হাঁটছে

স্টাফ রিপোর্টার: জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধের নতুন খসড়া আইনে স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা সীমিত করার অভিযোগ তুলে সরকারের সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। তিনি বলেছেন, ভালো আইন আনার কথা বলে সরকার এখন উল্টো পথে পা বাড়িয়েছে।


মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৩টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির আয়োজনে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ খসড়া আইন, ২০২৬: আইনি পর্যালোচনা ও করণীয় নির্ধারণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।


আখতার হোসেন বলেন, বর্তমান খসড়া আইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কমিশনের স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে। গুমের ঘটনায় তদন্তের দায়িত্ব এমন বাহিনীর হাতে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধেই গুমের অভিযোগ থাকতে পারে। তাঁর মতে, এতে অতীতের দায়মুক্তির সংস্কৃতি ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।


তিনি আরও বলেন, গুমের ঘটনায় অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে ভুক্তভোগীর পরিবারকে পাঁচ বছরের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এতে গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করতে ভয় পেতে পারেন। জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে আইন প্রণয়নের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, একটি ন্যায়সংগত ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।


আলোকচিত্রী, লেখক ও মানবাধিকার কর্মী শহীদুল আলম বলেন, নতুন বাংলাদেশে দায়িত্বশীল রাজনীতি নিশ্চিত করা জরুরি। মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন তদন্ত ক্ষমতা, কমিশনার বাছাই প্রক্রিয়ার স্বাধীনতা এবং গুম আইনের দুর্বলতা সংশোধনের দাবি জানান তিনি।


রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীন ও কার্যকর না হলে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে আনা সম্ভব নয়। মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ ও পুলিশ কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল বা দলীয়করণ করা হলে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করা সম্ভব হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।


এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ছাড়া শুধু নতুন দল বা নেতৃত্ব দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা, ক্ষমতার কাঠামোয় ভারসাম্য আনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।


বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধের মতো প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনা। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। পুরোনো আইন বাতিলের আগে আরও ভালো আইন করার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বর্তমান খসড়া দেখে তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।


সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ব্যারিস্টার তানিম হোসেন শাওন বলেন, গুমের অভিযোগ তদন্তের জন্য স্বাধীন কমিশনের পরিবর্তে পুলিশকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, বর্তমান খসড়ায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বাধীন মানবাধিকার কমিশনের বৈশিষ্ট্যও যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি।


এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির উপ-প্রধান সারোয়ার তুষার বলেন, গুমের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে দেওয়া হলে নিরপেক্ষ তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন থাকবে। মিথ্যা অভিযোগের জন্য ভুক্তভোগীর পরিবারকে শাস্তির বিধান রাখারও সমালোচনা করেন তিনি।


গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নয় সদস্যের বাছাই কমিটির অধিকাংশ সদস্য সরকারসংশ্লিষ্ট হওয়ায় কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। কমিশনার নিয়োগে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।


বৈঠকে শিক্ষাবিদ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক আইনি পরিবর্তনে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা খর্ব করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কর্মকর্তাদের সুরক্ষার প্রয়োজন থাকলেও স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা বাতিল না করে বিশেষ নিরাপত্তা ও আলাদা আইনি কাঠামো তৈরির পরামর্শ দেন তিনি।


বৈঠকে মানবাধিকার কর্মী রুবি আমাতুল্লাহসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা আইন দুটি সংসদে পাসের আগে নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামত নেওয়া এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

সম্পর্কিত খবর

;