নতুন করে দারিদ্র্যে ২১ লাখ মানুষ, রাজস্ব আহরণ বিশ্বের সর্বনিম্নে বাংলাদেশ: বিশ্বব্যাংক

প্রকাশ : 06 Oct 2026
নতুন করে দারিদ্র্যে ২১ লাখ মানুষ, রাজস্ব আহরণ বিশ্বের সর্বনিম্নে বাংলাদেশ: বিশ্বব্যাংক

স্টাফ রিপোর্টার: চলতি অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। মঙ্গলবার ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬ বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’।


বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ অর্থবছরে দারিদ্র্য ও বৈষম্য উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য সীমা দিনে ৩ ডলারের হিসাবে দারিদ্র্যের হার ১ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় ২১ লাখ নতুন দরিদ্র মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। একই সঙ্গে বৈষম্য ০ দশমিক ৯ জিনি পয়েন্ট বেড়েছে, কারণ দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর ভোগ ব্যয় বেশি কমেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যত থমকে গেছে এবং বিশেষ করে নারীরা চাকরি হারিয়েছেন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।


রাজস্ব আহরণের দুর্বলতাকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন। রাজস্ব ঘাটতি বেড়ে জিডিপির ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে, আগের অর্থবছরে যা ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার কারণে সরকারি বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।


ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালের জুনে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, অন্য হিসেবে জুনে এই হার ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত ২০২৬ সালের মার্চে মাইনাস ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, এই দুর্বলতা ঋণ প্রবাহ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।


প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও বড় ধরনের কাটছাঁট করেছে বিশ্বব্যাংক। ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে থাকতে পারে, যা এপ্রিলের পূর্বাভাস থেকে ১ দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট কম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় আফগানিস্তানের পর সর্বনিম্ন। এই প্রবৃদ্ধি কোভিডের সময় ২০২০ অর্থবছরের ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশের চেয়েও কম। তবে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি এবং সংস্কার গতি পেলে ২০২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি ৮ দশমিক ৬ শতাংশে উঁচু থাকবে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন। তিনি বলেন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা এবং নতুন ও ভালো কর্মসংস্থান তৈরির জন্য এসব সংস্কার জরুরি এবং এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার উপযুক্ত সময়।


সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করছে, তবে দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেকই কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই। সীমিত সরকারি সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে সুবিধাভোগী নির্বাচনের পদ্ধতি উন্নত করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। সরকারের ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। একাধিক খাদ্যভিত্তিক ভর্তুকি কর্মসূচিকে একীভূত করা এবং ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচির ভালো সমন্বয় করা গেলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।


সব প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের বৈদেশিক খাত কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতির কারণে বহিঃখাত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে রপ্তানি, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নে দুর্বল চাহিদার কারণে তৈরি পোশাক রপ্তানি ধীর থাকবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।


সম্পর্কিত খবর

;