নড়াইলে বিলের পানিতে অস্থায়ী হাঁসের খামার করে বেকার তরুণদের দিনবদল

প্রকাশ : 26 Aug 2026
নড়াইলে বিলের পানিতে অস্থায়ী হাঁসের খামার করে বেকার তরুণদের দিনবদল

সুজয় ঘোষ, নড়াইল: বর্ষা এলেই নড়াইল জেলার বিভিন্ন বিলে দেখা মেলে ঝাঁকে ঝাঁকে হাঁসের মেলা। শুধুমাত্র মাছ শিকার ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিলের জমি এখন অনেক বেকার তরুণের আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে। বর্ষা মৌসুমে বিলের পানিতে বেরিকেড দিয়ে অস্থায়ীভাবে হাঁসের খামার করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন নড়াইলের শত শত তরুণ ও কৃষক।


মাত্র ছয়-সাত মাস হাঁস পালন করেই অনেক খামারি বছরে দুই থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। প্রাকৃতিক পরিবেশে হাঁস পালন করায় খাবার ও অন্যান্য ব্যয় তুলনামূলক কম। ফলে কম পুঁজি বিনিয়োগে লাভজনক হওয়ায় দিন দিন এ পেশার প্রতি স্থানীয়দের আগ্রহ বাড়ছে।


জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বর্ষা মৌসুমে নড়াইল সদর, লোহাগড়া ও কালিয়া উপজেলার বিভিন্ন বিল এলাকায় অস্থায়ী খামার গড়ে হাঁস পালন করছেন কৃষক ও তরুণ উদ্যোক্তারা। জেলার বিভিন্ন বিল থেকে উৎপাদিত হাঁসের ডিমের বাজারমূল্য প্রায় ২২ কোটি টাকা। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি এসব হাঁস ও ডিম সরবরাহ করা হচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়।


জেলার প্রধান জীবিকা কৃষি হলেও কৃষিকাজে আয় কমে যাওয়ায় অনেক তরুণ বিকল্প কর্মসংস্থানের পথ খুঁজছেন। কয়েক বছর ধরে নিজ উদ্যোগে তিন শতাধিক যুবক ও তরুণ বর্ষা মৌসুমে অস্থায়ী খামার গড়ে হাঁস পালন করছেন। বিলের পানিতে হাঁস ছেড়ে দিয়ে দিনের বেশির ভাগ সময় প্রাকৃতিক খাবার সংগ্রহের সুযোগ থাকায় খামারিদের ব্যয়ও কমে আসে।


লোহাগড়া উপজেলার সরশুনা গ্রামের খামারি তুহিন শেখ পাঁচ বছর আগে মাত্র ১৫০টি হাঁস নিয়ে খামার শুরু করেন। প্রথম বছরেই লাভ হয় লক্ষাধিক টাকা। এরপর প্রতিবছর খামারের পরিধি বাড়িয়েছেন তিনি। বর্তমানে তার খামারে হাঁসের সংখ্যা চার শতাধিক।


তুহিন শেখ বলেন, হাঁস পালনে প্রথম দিকে কিছুটা পরিশ্রম করতে হলেও লাভ পাওয়ায় এখন আর পেছনে তাকাতে হয় না। চলতি মৌসুমে তার অন্তত তিন লাখ টাকা লাভ হবে বলে আশা করছেন তিনি।


একই এলাকার খামারি আলিম মোল্যার গল্পও অনেকটা একই। একসময় কৃষিকাজ করেই সংসার চালাতেন তিনি। কৃষিকাজে আশানুরূপ লাভ না হওয়ায় প্রতিবেশীর পরামর্শে তিন বছর আগে বর্ষা মৌসুমে হাঁস পালন শুরু করেন।


প্রথম বছর ২০০টি হাঁস দিয়ে শুরু করলেও লাভ ভালো হওয়ায় প্রতিবছর হাঁসের সংখ্যা বাড়িয়েছেন। বর্তমানে তার খামারে প্রায় সাড়ে তিনশ হাঁস রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৩০০টি ডিম উৎপাদিত হচ্ছে। চলতি মৌসুমে অন্তত তিন লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তিনি।


লোহাগড়া, কালিয়া ও সদর উপজেলার ইছামতি, শোলপুর, কলোড়া, কুমড়ির বিল, পাটেশ্বরী, সরশুনাসহ ১৫-১৬টি বিলের আশপাশের গ্রামে এ ধরনের অস্থায়ী হাঁসের খামার গড়ে উঠেছে। এসব খামারে কৃষকের পাশাপাশি বেকার যুবকরাও যুক্ত হয়েছেন।


খামারি শাহীন বলেন, হাঁসগুলো একটানা ছয় মাসেরও বেশি সময় ডিম দেয়। প্রতিদিন সকালে খামার থেকে ডিম সংগ্রহ করে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। বর্তমানে প্রতিটি ডিম গড়ে ১৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। হাঁস পালন করে অনেক খামারি ও তাদের পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা এসেছে।


জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. রাশেদুল ইসলাম বলেন, হাঁস পালন একটি লাভজনক ব্যবসা। হাঁসের মাংস ও ডিম উৎপাদন বাড়াতে খামারিদের প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহযোগিতা ও ভ্যাকসিনসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে জেলায় ৩ লাখ ৫১ হাজার ৩৭টি হাঁস রয়েছে। প্রতিবছরই এ জনপদে হাঁসের খামারের সংখ্যা বাড়ছে।


নড়াইলের বিস্তীর্ণ বিলাঞ্চলে বর্ষার পানিকে কাজে লাগিয়ে হাঁস পালন অনেক পরিবারের স্বচ্ছলতার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বেকার তরুণদের জন্য স্বল্প পুঁজিতে আত্মকর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে এ উদ্যোগ। বিলের পানিতে ভাসমান অস্থায়ীভাবে হাঁস পালনের এই উদ্যোগকে আরও পরিকল্পিতভাবে সম্প্রসারণ করা গেলে নড়াইলে হাঁসের ডিম ও মাংস উৎপাদনের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে।


সম্পর্কিত খবর

;