শেষ হচ্ছে নির্বাচনী প্রচারণা

শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় ভোটারের দ্বারে প্রার্থী-স্বজনরা, প্রতিশ্রুতির ‘ফুলঝুরি’

প্রকাশ : 09 Feb 2026
শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় ভোটারের দ্বারে প্রার্থী-স্বজনরা, প্রতিশ্রুতির ‘ফুলঝুরি’

স্টাফ রিপোর্টার: টানা ১৯দিন পর আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টায় শেষ হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও দেশব্যাপী গণভোটের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা। বিরাজ করছে শঙ্কার মধ্যে উৎসবের আমেজ। দলীয় থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী, সবাই নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের নিয়ে ছুটছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। শেষ সময়ে গভীর রাত পর্যন্ত ভোট প্রার্থণা করেছেন প্রার্থী-স্বজন ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা। দিচ্ছেন প্রতিশ্রুতির ‘ফুলঝুরি’ও। গতকাল সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এমন প্রচারণার দৃশ্য দেখা গেছে সর্বত্র।

মঙ্গলবার সকালের পর থেকে প্রার্থীদের প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নির্বাচনী এলাকায় এক ধরনের নীরবতা ও চূড়ান্ত প্রস্তুতির পরিবেশ বিরাজ করবে বলে আশা করছে কমিশন। মূলত ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের চূড়ান্ত অপেক্ষায় এখন গোটা দেশ। তবে শেষ মুহুর্তে সারা দেশে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা এখন তুঙ্গে। শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম সবখানেই উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আছে গুজব আর নানা শঙ্কাও।

শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় ভোটারের দ্বারে প্রার্থীরা, প্রতিশ্রুতির ‘ফুলঝুরি’: শেষ মুহূর্তের নির্বাচনি প্রচারণায় জমজমাট রাজনৈতিক মাঠ। প্রচারের শেষ সময়ে রাজধানীতে দিন-রাত বিরামহীন প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন প্রার্থীরা। নগরীর নানা সমস্যা সমাধানে দিচ্ছেন প্রতিশ্রুতি-আশ্বাস। শেষ সপ্তাহে রাজধানীতে নির্বাচনি প্রচারণা, গণসংযোগ, ইশতেহার নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে। উৎসবের আমেজে চলছে শেষ সময়ের প্রচার। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়েছেন তাদের প্রত্যাশার কথা শুনছেন প্রার্থীরা, দিচ্ছেন নানা আশ্বাস।

ঢাকা-১১ আসনে নির্বাচনি গণসংযোগ চালান মির্জা আব্বাস। প্রচারে নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে ফল পরিবর্তনের শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। একই আসনে প্রচারণা চালান ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী। অভিযোগ করেন, বেশিরভাগ আসনে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের মনোনয়ন দিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন বিএনপি।

বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাস বলেন, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ফলাফল পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে। কারণ এ সরকারের বিশেষ বিশেষ জায়গায় বিশেষ বিশেষ লোকগুলো বসে আছে।

১১ দলীয় জোটের প্রার্থী নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, সন্ত্রাস থাকাকালীন কোনো কম্প্রোমাইজ হবে না। এটা শুধু মির্জা আব্বাস না, ৩০০ আসনেই তারেক রহমান এসব গডফাদারদের দিয়েছেন। ঢাকা-৬ আসনে প্রচার চালান জামায়াত প্রার্থী সৈয়দ জয়নুল আবেদিন। তিনি বলেন, তার দলই নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে। ঢাকা-৯ আসনে প্রচারে বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, দিন বদলে যারা কাজ করবে তাদেরই দেশের নেতৃত্বে আনবেন ভোটাররা।

ঢাকা-৯ আসনে বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, আমরা যারা প্রার্থী হয়েছি আমরা সবাই সেবা দিতে এসেছি। দায়িত্বপালন করতে এসেছি। আমরা কোনো অসুস্থ রাজনীতির অংশ না। জামায়াত প্রার্থী সৈয়দ জয়নুল আবেদিন বলেন, আমাদের বোনেরা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে বা ১১ দলীয় জোটকে বেশি ভোট দিবে ইনশাআল্লাহ। তবে, ভোটাররা বলছেন, এবারের নির্বাচনে দল বা প্রতীক নয়, যোগ্যতা দেখেই ভোট দেবেন তারা।

মোটরসাইকেল শোডাউনে জাতীয় পাটির প্রার্থীর প্রচারণা: প্রচারনার শেষদিনে দুই শতাধিক মোটরসাইকেল নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন ঢাকা-৫ আসনের জাতীয় পাটির প্রার্থী মীর আব্দুস সবুর আসুদ। গতকাল সোমবার বেলা সাড়ে ১১টায় মাতুয়াইল মেডিক্যালের সামনে থেকে শুরু করে ঢাকা-৫ নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিন করেন। এদিন সাইনবোর্ড-সানারপাড়,সারুলিয়া,গলাকাঁটা,শুকুরসী, ডেমরা বাজার, বড়ভাঙ্গা, হাজীনগর-স্টাফ কোয়াটার, কোনাপাড়া,মাতুয়াইল,মৃর্ধাবাড়ি,কাজলা,যাত্রাবাড়ি,সায়েদাবাদ হয়ে মাতুয়াইল হাসেমরোড এসে সমাপ্ত হয়। ঢাকা-৫ আসনের জাতীয় পাটির প্রার্থী মীর আব্দুস সবুর আসুদ বলেন, আমাদের ২ শত মোটরসাইকেল ও ১২ টির মত গাড়ি ছিল বহরে। স্থানীয় ভোটার ও দলীয় নেতা-কর্মীদের নিজস্ব গাড়ি নিয়ে এই শোডাউন দেয়া হয়েছে। প্রত্যেকেই নিজ খরচে এসেছেন। এর বাইরে গেঞ্জি, মাইক, পিকআপ, ব্যানার বাবদ সামান্য কিছু খরচ হয়েছে। সেগুলো এখনও হিসেব সম্পন্ন করা হয়নি। আমরা সুশৃঙ্খলভাবে শোডাউন করেছি। কোনো বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি। এমনকি আমাদের শোডাউনের কারণে কোথাও যানজটও হয়নি। তিনি আরও বলেন, সুষ্ঠু একটি নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করে বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হবে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও হানাহানি বাদ দিয়ে সকলে মিলে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলব। এটাই জাতীয় পাটির মূল লক্ষ ও উদ্দেশ্য। আমরা আশা করছি নির্বাচন কমিশন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশবাসির সেই কাঙ্খিত সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে সক্ষম হবে। নির্বাচনে কোথাও যদি কোনো রকম অঘটন ঘটে কিংবা বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়,এর দায়ভার নির্বাচন কশিশনকে বহন করতে হবে।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিধিনিষেধ অনুযায়ী, ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার পূর্ববর্তী ৪৮ ঘণ্টা আগে সব ধরনের নির্বাচনি প্রচারণা সমাপ্ত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। গত ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ তিন সপ্তাহের এই প্রচারযুদ্ধ মঙ্গলবার সকালেই থেমে যাবে, যার মধ্য দিয়ে শেষ হবে প্রার্থীদের মাঠ পর্যায়ের দৌড়ঝাঁপ। এরপর শুরু হবে ভোটের চূড়ান্ত ক্ষণগণনা। নির্বাচন কমিশনের রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা ২০২৫-এর ১৮ ধারা মোতাবেক, কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কিংবা স্বতন্ত্র প্রার্থী ভোটগ্রহণের নির্ধারিত দিনের তিন সপ্তাহ সময়ের আগে প্রচারণা শুরু করতে পারেন না। একইভাবে ভোটগ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে থেকে সব ধরণের জনসভা, মিছিল ও মাইকিং বন্ধ রাখতে হয়। ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, আজ ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টার পর কোনো প্রার্থী বা দল আর কোনো প্রকার নির্বাচনি কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন না। এই নির্দেশনা অমান্য করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দিয়েছে কমিশন। এবারের নির্বাচনে দেশের মোট ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে একযোগে ভোটগ্রহণ ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। জামায়াতে ইসলামীর এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এবারের নির্বাচনি ময়দানে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে এবং ২ হাজার ৩৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৯১ জন প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৮ জন, জামায়াতে ইসলামীর ২২৯ জন এবং জাতীয় পার্টির ১৯৮ জন প্রার্থী নির্বাচনি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন ২৭৫ জন, যাদের মধ্যে অনেকের পছন্দের প্রতীক হিসেবে ‘ফুটবল’ জয়গা করে নিয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপারের মাধ্যমে এই ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া চলবে। ভোটারদের সুবিধার্থে এবং সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যে দেশজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। প্রচারণার শেষ পর্যায়ে এসে প্রার্থীরা এখন শেষ মুহূর্তের ভোট প্রার্থনায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। ভোটারদের মন জয় করতে জনসভা ও পথসভার পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি গিয়ে দোয়া ও ভোট চাইছেন প্রার্থীরা। তবে আজ মঙ্গলবার সকালের পর থেকে প্রার্থীদের প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নির্বাচনী এলাকায় এক ধরনের নীরবতা ও চূড়ান্ত প্রস্তুতির পরিবেশ বিরাজ করবে বলে আশা করছে কমিশন। মূলত ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের চূড়ান্ত অপেক্ষায় এখন গোটা দেশ।

সম্পর্কিত খবর

;