ঠাকুরগাঁওয়ে মিড ডে মিলেই বিপত্তি! প্যাকেটজাত দুধ পানে অসুস্থ ৩৪ শিশু।

প্রকাশ : 22 Sep 2026
ঠাকুরগাঁওয়ে মিড ডে মিলেই বিপত্তি! প্যাকেটজাত দুধ পানে অসুস্থ ৩৪ শিশু।

মোঃ মহশীন আলী, রংপুর অফিস: ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় মিড ডে মিলের আওতায় সরবরাহ করা প্যাকেটজাত দুধ পান করে অসুস্থ হয়ে পড়েছে ৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৪ জন শিক্ষার্থী। 


পেটে ব্যথা, পেটের পীড়া ও বমিসহ বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে তাদেরকে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও অভিভাবকদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।


সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে উপজেলার মধুপুর (১) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম এ ঘটনা ঘটে। পরে মধ্য গোয়ালকারী ও তুলশীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও একইভাবে অসুস্থ হতে থাকে।


হাসপাতাল ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার দুপুরে মধুপুর (১) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেওয়া ইউএইচটি প্যাকেটজাত দুধ খাওয়ার পরপরই শিক্ষার্থীরা অসুস্থ বোধ করতে থাকে। এ বিদ্যালয়ের ৩০ জন শিক্ষার্থীকে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।


পরবর্তীতে মধ্য গোয়ালকারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩ জন এবং তুলশীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১ জন শিক্ষার্থী হাসপাতালে ভর্তি হয়। বিকেল পর্যন্ত মোট ৩৪ জন শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে ভর্তি করার খবর পাওয়া গেছে।

অসুস্থ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দুধ সরবরাহ করার পর তারা বুঝতে পারে তা নষ্ট ও স্বাদ তিতা। মধুপুর (১) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানিয়া আক্তার বলে, "মিড ডে মিলের দুধ খাওয়ার পর সবার পেটে ব্যথা শুরু হয়। অনেকেই স্কুলেই বমি করেছে। প্যাকেটজাত দুধ তিতা ও নষ্ট ছিল। আমরা স্যার ও ম্যামকে জানালে তাঁরা আমাদের খেয়ে নিতে বলেন।" চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী শামীম হাসান জানায়, দুধ পান করার পর থেকেই তার প্রচণ্ড পেটে ব্যথা ও বমি বমি ভাব হচ্ছে।


ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা অভিযোগ করে জানান, দুধের গুণগত মান ভালো আছে কিনা তা পরীক্ষা না করেই শিশুদের পান করতে দেওয়া হয়েছে। মধ্য গোয়ালকারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মনিকা দেবনাথের বাবা মানিক দেবনাথ বলেন, "মেয়ের পেটে ব্যথা শুরু হলে বাড়িতে নিয়ে যাই। পরে ব্যথা না কমায় হাসপাতালে এনেছি। নষ্ট দুধ খেয়ে বাচ্চাগুলো খুব কষ্ট পাচ্ছে।"


অভিভাবকরা জানান, শিক্ষকদের চরম অবহেলার কারণেই এ ঘটনা ঘটেছে। কোমলমতি কোনো শিক্ষার্থীর গুরুতর ক্ষতি হলে দায়ী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দেন তাঁরা।


শিক্ষকদের অবহেলার বিষয়ে জানতে চাইলে মধুপুর (১) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল্লাহিল সাফি জানান, তিনি ছুটিতে ছিলেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক ফেরদৌসী বেগম বিষয়টি দেখাশোনা করছিলেন। দুধগুলো প্যাকেটজাত থাকায় তা নষ্ট কিনা আগে থেকে বোঝা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।


উপজেলার বিদ্যালয়গুলোতে এই প্যাকেটজাত দুধ সরবরাহ করে 'রংপুর ডেইরি ফুড অ্যান্ড প্রাইভেট লিমিটেড' (আরডি)। প্রতিষ্ঠানটির ইউএইচটি মিল্ক সরবরাহের দায়িত্বে থাকা আবু রিয়াল জানান, রবিবারে সরবরাহ করা দুধ সোমবার শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয়। অন্যান্য বিদ্যালয়ে কোনো সমস্যা না হলেও এই তিনটি বিদ্যালয়ে কেন এমন ঘটনা ঘটল, তা তাদের বোধগম্য নয়।


ঘটনার খবর পেয়ে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অসুস্থ শিক্ষার্থীদের দেখতে যান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অঞ্জন কুমার দাস, বালিয়াডাঙ্গী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বুলবুল ইসলাম ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা অতুল চন্দ্র রায়।


উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা অতুল চন্দ্র রায় বলেন, "বাচ্চারা বর্তমানে ভালো আছে। কোন খাদ্যে সমস্যা ছিল এবং আসলে কী ঘটেছিল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আমরা সবাই হাসপাতালে অবস্থান করছি।"


উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অঞ্জন কুমার দাস জানান, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে মিড ডে মিলের অবশিষ্ট সকল খাবার জব্দ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নমুনাগুলো ল্যাবে পরীক্ষার মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা হবে।


বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. মো. আহাদুজ্জামান জানান, ভর্তি হওয়া ৩৪ জন শিক্ষার্থীকে সার্বক্ষণিক চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে চিকিৎসাধীন শিশুদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরেই অসুস্থতার সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

উল্লেখ্য, ঠাকুরগাঁও জেলার একমাত্র বালিয়াডাঙ্গী উপজেলাতেই মিড ডে মিল সরকারিভাবে চালু রয়েছে। 

সম্পর্কিত খবর

;