রেমিট্যান্সে নতুন গতি, ১১ দিনে এলো ১৩৯ কোটি ডলার

প্রকাশ : 13 Aug 2026
রেমিট্যান্সে নতুন গতি, ১১ দিনে এলো ১৩৯ কোটি ডলার

স্টাফ রিপোর্টার: বড় ধরনের ধাক্কা কাটিয়ে দেশের প্রবাসী আয়ে আবারও গতি ফিরেছে। চলতি আগস্ট মাসের প্রথম ১১ দিনেই প্রবাসীরা বৈধ পথে দেশে পাঠিয়েছেন ১৩৮ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৬ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা। প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে এ অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৬ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার রেমিট্যান্স বেড়েছে ৪৫ দশমিক ৬ শতাংশ।


বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বুধবার (১২ আগস্ট) এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত দেশে এসেছে ১৩৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১ থেকে ১১ আগস্ট দেশে এসেছিল ৯৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে ৪৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার বেশি এসেছে এবার।


শুধু ১১ আগস্ট একদিনেই প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ আগস্টের প্রথম ১১ দিনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২ কোটি ৬৩ লাখ ডলার করে দেশে এসেছে। মাসের বাকি দিনগুলোতেও একই ধারা অব্যাহত থাকলে আগস্টে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।


চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্সের প্রবাহে ইতিবাচক ধারা দেখা যাচ্ছে। ১ জুলাই থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত দেশে মোট ৪২৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার এসেছে। প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ৫১ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে দেশে এসেছিল ৩৪৩ কোটি ২০ লাখ ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে অর্থবছরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্স বেড়েছে ৮১ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ।


এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল শক্তিশালী। বিভিন্ন সময়ে মাসভিত্তিক প্রবাহে ওঠানামা থাকলেও অর্থবছরের শেষ দিকে প্রবাসী আয়ের গতি আরও বাড়ে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মার্চে দেশে ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল, যা এক মাসে রেমিট্যান্স আসার ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড তৈরি করে। এর আগে একই অর্থবছরের ডিসেম্বরে ৩২২ কোটি ৬৭ লাখ ডলার এসেছিল, যা তখন পর্যন্ত অর্থবছরের সর্বোচ্চ মাসিক প্রবাহ ছিল।


অন্যদিকে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসীরা দেশে মোট ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৩২ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার পাঠিয়েছিলেন। এটি কোনো একক অর্থবছরে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহের রেকর্ড।


ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর সুযোগ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হার এবং প্রবাসীদের আস্থা ফেরার কারণে রেমিট্যান্সের প্রবাহে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রতিযোগিতামূলক হার, আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বাজারের বিনিময় হারের ব্যবধান কমে যাওয়া এবং হুন্ডির ব্যবহার কমে আসা রেমিট্যান্স বাড়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।


রেমিট্যান্স বাড়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে প্রভাব। প্রবাসী আয় দেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রার উৎস। ফলে ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের সরবরাহ বাড়লে আমদানি দায় মেটানো, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং ডলারের বাজারে চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকও রেমিট্যান্সকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচনা করে।


দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব শুধু বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশির পাঠানো অর্থ সরাসরি তাদের পরিবারের হাতে পৌঁছে। এ অর্থ দিয়ে পরিবারগুলো দৈনন্দিন ব্যয়, শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন, কৃষি ও ছোট ব্যবসায় বিনিয়োগসহ বিভিন্ন প্রয়োজন মেটায়। ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লে দেশের অভ্যন্তরীণ ভোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।


বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের শুরুতেই রেমিট্যান্স প্রবাহে যে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হয়েছে, আগস্টের প্রথম ১১ দিনের তথ্য সেটিকে আরও স্পষ্ট করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং অর্থবছরের শুরু থেকে প্রায় ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি—দুই সূচকই প্রবাসী আয়ের শক্তিশালী অবস্থান নির্দেশ করছে।


তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্সের এই ইতিবাচক প্রবণতা ধরে রাখতে হলে বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানো আরও সহজ ও সাশ্রয়ী করতে হবে। প্রবাসীদের জন্য ব্যাংকিং সেবার গতি বাড়ানো, লেনদেনের খরচ কমানো, দ্রুত অর্থ পৌঁছানো এবং অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের আস্থা ধরে রাখা জরুরি।


এদিকে, প্রবাসী আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের পরিমাণ, প্রবাসীদের আয় ও গন্তব্য দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়াতে দক্ষ কর্মী পাঠানো, নতুন শ্রমবাজার তৈরি এবং বিদ্যমান শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের সুযোগ সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।


সব মিলিয়ে আগস্টের প্রথম ১১ দিনের ১৩৮ কোটি ৯০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এবং অর্থবছরের শুরু থেকে ৪২৪ কোটি ৭০ লাখ ডলারের প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। এখন মাসের বাকি সময়ে এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা কতটা অব্যাহত থাকে, সেটিই হবে রেমিট্যান্স প্রবাহের পরবর্তী বড় সূচক।

সম্পর্কিত খবর

;