চার আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা করল বাংলাদেশ ব্যাংক

প্রকাশ : 10 Aug 2026
চার আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা করল বাংলাদেশ ব্যাংক

স্টাফ রিপোর্টার: আর্থিক খাতে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারের স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর আওতায় এনে প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে রেজল্যুশন কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। রোববার (৯ আগস্ট) রাতে এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।


অকার্যকর ঘোষণা করা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—আভিভা ফাইন্যান্স লিমিটেড, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড। এগুলো ব্যাংক নয়, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা এনবিএফআই। বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনায় প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা সন্তোষজনক না হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।


বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বড় অঙ্কের মূলধন ঘাটতি, উচ্চমাত্রার শ্রেণিকৃত ঋণ ও বিনিয়োগ, প্রয়োজনীয় তারল্য সংরক্ষণে ব্যর্থতা, আয়ক্ষমতার অবনতি এবং আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারের দায় পরিশোধে অক্ষমতা—এসব গুরুতর আর্থিক দুর্বলতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর ঘোষণার অন্যতম কারণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনায় তাদের পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা সীমিত।


অকার্যকর ঘোষণার পর প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহীদের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। রেজল্যুশন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের প্রশাসক ও সহকারী প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশাসকরা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসন, ব্যবস্থাপনা এবং পরবর্তী রেজল্যুশন প্রক্রিয়া তদারকি করবেন।


বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানিয়েছেন, চার প্রতিষ্ঠানকে রেজল্যুশনের আওতায় নেওয়ার পর প্রথমে প্রশাসকরা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনা করবেন। এরপর প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য পরিস্থিতি অনুযায়ী আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠানে নতুন তহবিল দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে, আবার কোনো প্রতিষ্ঠানকে অবসায়নের সুপারিশ করা হতে পারে।


অর্থাৎ, অকার্যকর ঘোষণা করা মানেই চার প্রতিষ্ঠানকে তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ বা অবসায়ন করা হয়েছে—এমন নয়। রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আগে প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ, দায়, ঋণ, বিনিয়োগ ও পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে কোনো প্রতিষ্ঠান অবসায়নে যাবে, নাকি অন্য কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে পুনর্গঠনের সুযোগ পাবে। অবসায়নের সিদ্ধান্ত হলে আইন অনুযায়ী উচ্চ আদালতের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।


চারটি প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণার সিদ্ধান্তটি আর্থিক খাতে দীর্ঘদিনের দুর্বলতা মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক কঠোর পদক্ষেপের অংশ। এর আগে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্বলতার কারণে ছয়টি এনবিএফআই—এফএএস ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং—অবসায়নের সিদ্ধান্তের আলোচনায় আসে। তবে রোববারের সিদ্ধান্তে ওই ছয়টির মধ্যে চারটিকে অকার্যকর ঘোষণা করা হয়েছে। পিপলস লিজিং ও প্রিমিয়ার লিজিং আপাতত এ সিদ্ধান্তের বাইরে রয়েছে।


বাংলাদেশ ব্যাংক গত জানুয়ারিতে ওই ছয় এনবিএফআইয়ের বিষয়ে অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। একই সময়ে জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানিকে (বিআইএফসি) কার্যক্রম সচল রাখার জন্য সময় দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে কিছু প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা থেকে বাঁচতে অতিরিক্ত সময়ও দেওয়া হয়।


চার প্রতিষ্ঠানকে রেজল্যুশনের আওতায় নেওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমস্যাগ্রস্ত এনবিএফআইগুলোর আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে। সংশ্লিষ্ট পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানে মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ১৬ হাজার ৭৬ কোটি টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যক্তিগত আমানতকারীদের অর্থ প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। যোগ্য ব্যক্তিগত আমানতকারীরা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাওয়ার অগ্রাধিকার পাবেন বলে জানানো হয়েছে।


সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণও অত্যন্ত বেশি। সংশ্লিষ্ট পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ৯৩ শতাংশ থেকে প্রায় ১০০ শতাংশের কাছাকাছি বলে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও তারল্য সংকটই প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাকে দুর্বল করেছে।


বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং আমানতকারীসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর স্বার্থ সংরক্ষণের চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে এ ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে আর্থিক খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।


চার প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণার মধ্য দিয়ে আর্থিক খাতের দুর্বল এনবিএফআইগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ আরও কঠোর হলো। এখন প্রশাসকদের পর্যালোচনা এবং রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার পর প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।

সম্পর্কিত খবর

;