ডেস্ক রিপোর্ট:
বিশ্ব আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত কেবল পরিবেশগত নয়, বরং অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া এবং জীববৈচিত্র্যের দ্রুত ক্ষয় - এসব কোনো দূর ভবিষ্যতের ভয় নয়, বরং আজকের বাস্তবতা। এই সংকটে যখন বিশ্ব নীতিনির্ধারকরা বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও কার্যকর পদক্ষেপে পিছিয়ে পড়ছেন, তখন কনফারেন্স অব পার্টিজ (COP-৩০) হয়ে উঠছে এক নতুন আশার বাতিঘর।
জলবায়ু পরিবর্তন: সংকটের প্রেক্ষাপট
সাম্প্রতিক দশকে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে, যা ১৮৫০-১৯০০ সালের তুলনায় অনেক বেশি। যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে শতকের শেষে এই উষ্ণতা ৩ ডিগ্রির বেশি বেড়ে যাবে, যা পৃথিবীকে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই অভিঘাত সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে উন্নয়নশীল ও জলবায়ু-সংবেদনশীল দেশগুলোতে-যেমন বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, নেপাল বা সাব-সাহারান আফ্রিকার অনেক দেশ।
বাংলাদেশের জন্য এই সংকট আরও তীব্র। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে, কৃষিজ উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে, নদীভাঙনে বাসস্থান হারাচ্ছে হাজারো পরিবার। বিশ্বে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের অন্যতম বৃহৎ অংশ এই বাংলাদেশ থেকেই উঠে আসছে।
কপ-৩০: সম্মেলনের তাৎপর্য
২০২৫ সালের নভেম্বরে ব্রাজিলের অ্যামাজন অঞ্চলের শহর বেলেমে অনুষ্ঠিতব্য কপ-৩০ জলবায়ু সম্মেলন বিশ্ব রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে। প্রথমবারের মতো অ্যামাজনের মত একটি প্রাকৃতিক বনাঞ্চলকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই বৈঠক। প্রতীকীভাবে এটি দেখায় যে, প্রকৃতির সুরক্ষা শুধু আলাপের বিষয় নয়-এখন তা হচ্ছে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার চূড়ান্ত সময়।
মূল আলোচনার ক্ষেত্রসমূহ:
লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড: উন্নত দেশগুলোর দায়মুক্তি নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তার বাস্তব কাঠামো প্রতিষ্ঠা।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর: জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার সীমিত করে সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুৎ শক্তির প্রসার।
জলবায়ু অর্থায়নের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা: যে তহবিলের কথা বলা হয়, তার কতটা প্রকৃতপক্ষে সরবরাহ করা হয়েছে এবং কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
স্বল্পোন্নত দেশ ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর বিশেষ অধিকার: তাদের জন্য আলাদা সুরক্ষা ও অভিযোজন কৌশল।
বাংলাদেশের জন্য কপ-৩০ এর গুরুত্ব
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বেশ কিছু অগ্রণী পদক্ষেপ নিয়েছে—যেমন জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (NAP), বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (BCCTF), এবং কমিউনিটি ভিত্তিক দুর্যোগ প্রস্তুতি। তবে আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়া এগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন। কপ-৩০-তে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে তুলে ধরা উচিত:
• আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে সহজ শর্তে এবং জরুরি ভিত্তিতে অর্থপ্রাপ্তির দাবি,
• জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য আলাদা আইনগত স্বীকৃতি,
• উন্নত বিশ্বের প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবি,
• সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসনের আন্তর্জাতিক সহায়তা
আন্তর্জাতিক দায় ও দায়িত্ব
জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ-বিশ্বব্যাপী কার্বন নির্গমনের বড় অংশ-এসেছে উন্নত দেশগুলো থেকে। অথচ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এমন দেশগুলো যারা এই নির্গমনের জন্য দায়ী নয়। এই বৈষম্য শুধরে নেওয়া এখন নৈতিক দায়িত্ব। কপ-৩০ এ উন্নত দেশগুলোর উচিত:
• ১০০ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক জলবায়ু অর্থায়ন তহবিল বাস্তবায়ন,
• জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি বন্ধ করে নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি,
• কার্বন নির্গমন হ্রাসে বাধ্যতামূলক সময়সীমা নির্ধারণ
প্রতিটি কপ সম্মেলন আমাদের আশাবাদী করে তোলে। কিন্তু গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা বলছে-কথার চেয়ে কাজ জরুরি। কপ-৩০ শুধুই আরেকটি আন্তর্জাতিক বৈঠক হয়ে উঠলে চলবে না; এটি হতে হবে একটি পদক্ষেপমুখী, ন্যায়বিচারভিত্তিক বৈশ্বিক ঐক্যের প্ল্যাটফর্ম।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব যেন কেবল উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে তাদের কণ্ঠস্বর শোনা যায়-এটা নিশ্চিত করতেই হবে।
আমরা আশা করি, কপ-৩০ হবে ভবিষ্যতের জন্য একটি কার্যকর রোডম্যাপ তৈরির স্থান-যেখানে শুধুমাত্র প্রতিশ্রুতি নয়, থাকবে জবাবদিহিতা, বাস্তবায়ন, এবং একটি বাসযোগ্য পৃথিবীর জন্য সম্মিলিত প্রয়াস।
মো. মামুন হাসান:
ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এটি শুধু আমাদের নদী ও সাগরের সম্পদই নয়, বরং দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়ি ...
ইমদাদ ইসলাম:
বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে দেশের মানুষ। প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমেই প্রতিদিনই দেশের বায়ু মান গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়।গত ৪ মার্চ বুধবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানী ঢা ...
মানিক লাল ঘোষ: ইতিহাসের পাতায় কোনো কোনো দিন আসে যা কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির ভাগ্যবদল ও আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত দলিল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ছিল তেমনই এক মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদি ...
আতিকুল ইসলাম টিটু:
বাংলাদেশকে নয়া উপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বোঝার জন্য কেবল রাষ্ট্র গঠনের পরবর্তী সময় নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তর শ্রেণি সংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদ ...
সব মন্তব্য
No Comments